hadith book logo

জিজ্ঞাসা ও জবাব (১ম খণ্ড)

লেখকঃ ড. খোন্দকার আব্দুলাহ জাহাঙ্গীর (রাহিমাহুল্লাহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩২৮

প্রশ্ন-৩২৯: এক সাথে অনেক মানুষ জিকির করা যাবে কি না? জিকির নীরবে করা উত্তম নাকি শব্দ করে করা উত্তম?

এক সাথে অনেক মানুষ জিকির করা যাবে কি না? জিকির নীরবে করা উত্তম নাকি শব্দ করে করা উত্তম? আমাদের হজুর বলেছে, ফজরের নামাযের পর হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করলে সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ করে। হাদীসটি সহীহ কি না জানতে চাই।

উত্তর: একসাথে তিনটা প্রশ্ন করেছেন। প্রথম হল, জিকির একসাথে করা যাবে কি না। উত্তরে যাওয়ার আগে একাট জিনিস বোঝেন। মনে করেন, আপনাদের মসজিদে প্রতিদিন রাত দুটোর সময় আযান দিয়ে তাহাজ্জুদের নামায জামাআতের সাথে পড়া হয়। এটাকে আপনারা কেউ ভালো বলবেন না। সব আলেম আপত্তি করবে। এখন মনে করেন, আমি এসে আপত্তি করলাম এভাবে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে না। নাজায়েয। আপনারা তখন হইচই শুরু করে দিলেন- হুজুর তাহাজ্জুদ নামাযের বিরোধী। অথচ আমি তাহাজ্জুদের বিরোধী না। মসজিদের তাহাজ্জুদের বিরোধী না। প্রতিদিন আয়োজন করে আযান দিয়ে জামাআতের সাথে তাহাজ্জুদের বিরোধী আমি। এর মানে এই না যে আমি, তাহাজ্জুদের বিরোধী। ঠিক তেমনি, আমি যদি জোরে জিকিরের বিরোধিতা করি আপনারা হইচই শুরু করে দেবেন, হুজুর জিকিরের বিরোধী। আসল ব্যাপার কিন্তু তা না। জিকিরের ক্ষেত্রে উত্তম হল, নীরবে অথবা মৃদু স্বরে জিকির করা। এটা জিকিরের সুন্নাত নিয়ম। কারণ, আমরা ডাকছি আল্লাহকে। আল্লাহকে কব, তবে নিজের কথা নিজের কানে শোনাতে কোনো দোষ নেই। আল্লাহ কুরআনে বলে দিয়েছেন:

وانگر ربك في نفسك تضرعا وخيفة ودوت الجهر من القول ده

বেশি জোরে না, স্বাভাবিক জোরে। আপনারা এক হাজার মানুষ প্রত্যেকে যার যার মতো সুবহানাল্লাহ' জিকির করতে পারেন। (সূরা আরাফ, আয়াত-২০৫)

কোনো অসুবিধা নেই। আপনারা যার যার ইবাদত সে সে করছেন। যার যার ওযীফা সে সে করছেন। এই দুটো পর্যায় কিন্তু সুন্নাহ বিরোধীও নয়, নাজায়েযও নয়। তৃতীয় পর্যায় হল, আপনি সাউন্ডটা বাড়িয়ে দিলেন। চিঙ্কারের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। এটা আপত্তিকর। সীমালঙ্ঘন। কুরআনেও দুআর ক্ষেত্রে, জিকিরের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করা হয়েছে। চতুর্থ পর্যায় হল, সবাই সমস্বরে, কোরাসে, একতালে জিকির করছেন। এটা সুন্নাতে পাওয়া যায়। এ জন্য সুন্নাত হল, জিকিরটা আমরা করব মনেমনে অথবা মৃদুস্বরে। জিকির হল নফল ইবাদত। নফল ইবাদতে জামাআত হয় না। যেমন আমরা জামাআতের সালাম ফেরানোর পরে প্রায় সবাই তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ’র আমল করি। এটা আমরা কোরাসে পড়ি না। যার যার মতো পড়ি। এখন এক মসজিদে জামাআত করে দেয়া হল- সালাম ফিরিয়ে সবাই জামাআত ধরে, কোরাসে সুবহানাল্লাহ'র জিকির করছে। নতুন কেউ এসে দেখলেই কিন্তু আপত্তি করবে। কিন্তু আপনি দলিল দেবেন, রাসূলুল্লাহর (ﷺ) এই জিকিরের কথা বলেছেন, ফযীলতের বর্ণনা দিয়েছেন, তেত্রিশ বার পড়তে হবে, সহীহ হাদীস, একশটা হাদীস আছে। কেন পড়ব না, এটা তো ভালো কাজ, একা একা পড়লে অনেকে পড়ে না, একসাথে পড়লে সবাই পড়ে? এমন অনেক যুক্তি দেয়া যায়। যতই যুক্তি দেন, কাজটা কিন্তু সুন্নাত হল না। ঠিক তেমনি হাশরের শেষ তিন আয়াত যদি কোরাসে জামাআতবদ্ধ হয়ে পড়েন, এটাও কিন্তু সুন্নাত হবে না। হাশরের শেষ তিন আয়াত, শুধু ফজরে না, ফজর এবং মাগরিব, দুই ওয়াক্ত নামাযের পরে পড়ার কথা আছে। হুজুররা কিন্তু অন্যায় করেন। মাগরিবের কথা বলেন না। হাদীসে ফজর এবং মাগরিবের কথা আছে। ফজর এবং মাগরিবের পরে পড়লে সত্তর হাজার ফেরেশতা দুআ করবে- এটা হাদীসে আছে। হাদীসটার সনদ নিয়ে কথা আছে। মুহাদ্দিসগণ যয়ীফ (দুর্বল) বলেছেন। আমি সত্তর হাজারের আরেকটা সহীহ হাদীস বলি। যদি কেউ সকালে একজন অসুস্থ মানুষকে দেখতে যায়, সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ করতে থাকে। আর যদি কেউ সন্ধ্যায় বা বিকেলে কোনো রোগীকে দেখতে যায়, তাহলে সত্তর হাজার ফেরেশতা সুবহে সাদিক পন্ত তার জন্য দুআ করতে থাকে। এটা সহীহ হাদীস। এটার ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। যাই হোক, এই যে সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত, এটাও আয়াতুল কুরসি, সূরা নাস, সূরা ফালাক বা তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহর জিকিরের মতো একা পড়তে হবে। যদি আমরা নামাযের পর আয়াতুল কুরসি জামাআতের সাথে দলবদ্ধ হয়ে পড়ি, কেমন লাগবে? তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহর জিকির যদি জামাআতের সাথে পড়ি, কেমন লাগবে? মোটেও ঠিক হবে না। আমরা সবাই এটা নিয়ে আপত্তি করব। ঠিক তেমনি, সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত দলবদ্ধ হয়ে পড়- এটা ঠিক না। সুন্নাতবিরোধী। মাঝে মধ্যে ইমাম যদি শেবানোনার উদ্দেশ্যে পড়ান, তাহলে সুন্নাতের খেলাফ, জায়েয থাকবে। কিন্তু এটাকেই রেওয়াজ বানিয়ে নিলে বিদআত হয়ে যাবে। এ জন্য আমাদের সবারই সুন্নাতের ভেতরে থাকার চেষ্টা করা উচিত।