hadith book logo

জিজ্ঞাসা ও জবাব (১ম খণ্ড)

লেখকঃ ড. খোন্দকার আব্দুলাহ জাহাঙ্গীর (রাহিমাহুল্লাহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪০৭

প্রশ্ন-৪১১: শাইখ আনোয়ার আওলাকির জিহাদের পুনর্জাগরণকে খারাপ চোখে দেখি কেন?

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের খতীব শাইখ আনোয়ার আওলাকি রচিত ‘আল্লাহ আমাদের বিজয়ের জন্য প্রস্তুত করেছেন’ নামক বইতে তিনি জিহাদের পুনর্জাগরণকে মুসলিমদের বিজয়ের পূর্বাভাস বলে উল্লেখ করেছেন। যার পক্ষে অনেক যুক্তি উপস্থিত করেছেন। প্রশ্ন হল, তাহলে কেন আমরা জিহাদের এই পুনর্জাগরণকে খারাপ চোখে দেখি?

উত্তর: শাইখ আনোয়ার আওলাকি উনি আলেম ছিলেন না। যতটুকু জানি, উনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আমেরিকার ভালো খতীব ছিলেন। আমেরিকান সরকার অন্যায়ভাবে তাকে জেলে দেয়। জেলে থেকে তিনি আল কায়দা হয়ে যান। এরপরে উনি ইয়ামানে চলে আসেন। সেখানেই তিনি নিহত হন। আল্লাহ তার শাহাদাত নসিব করেন। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু জেলের আগের আওলাকি আর পরের আওলাকির ভেতর আকাশ পাতাল তফাত। আগে বলতেন অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যাবে না। যেমন ফিলিস্তিনের ইহুদিদের কারণে আমেরিকার ইহুদিদের মারা যাবে না। কিন্তু তিনি জেল থেকে বেরিয়ে বলছেন, আমেরিকান যেখানে আছে- ধরো, মারো। তো জিহাদের পুনর্জাগরণকে তো কেউ খারাপ চোখে দেখছে। জিহাদ আল্লাহর একটা ফরয ইবাদত। কথা হল, জিহাদ বলতে তুমি কী বোঝাচ্ছা? জিহাদটা কী জিনিস? আমি তো জিহাদ বুঝলাম না। জিহাদ অবশ্যই করতে হবে কিন্তু আনোয়ার আওলাকি যে জিহাদ করেছেন বা যে জিহাদ করতে চাচ্ছেন, এ তো জিহাদ না। জিহাদের জন্য একটা রাষ্ট্র লাগবে। সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বে জিহাদের ঘোষণা হবে। অন্যান্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদ চলবে। এটা হল জিহাদ। রাষ্ট্র ছাড়া জিহাদ হয় না। আফগানিস্তানের জিহাদকে আমরা শরীআহ সম্মত জিহাদ মেনেছি। কিন্তু ফলাফল আমরা পাই নি। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রাহ.এর চিন্তা ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাইয়িদ আহমাদ বেরেলভি রহ, জিহাদ করেছেন। শরীআতসম্মত জিহাদ। তিনি একটা রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে গেছেন। যেটাকে বলে দারুল হারব। তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার রাষ্ট্রের আয়তন এক বিঘাত হোক। তারপর তিনি জিহাদের ঘোষণা দিয়েছেন। জিহাদ করেছেন। কিন্তু সেই জিহাদের বড় রকমের সুফল আমরা পাই নি। তোমরা মনে কর জিহাদ হলে সব হয়ে যাবে, জিহাদ হলেই সব মিটে যায় না। তুমি কী জিহাদ করছ, কার বিরুদ্ধে করছ, কার নেতৃত্বে করছ, এটা ঠিক করতে হবে। আমরা মনে করি, সব অন্যায় মিটিয়ে আমরা পৃথিবী ভালো করে ফেলব। আরে দুনিয়া আল্লাহ বানিয়েছেন ন্যায় আর অন্যায় দিয়ে। এ জন্য শরীআতসম্মত জিহাদ অবশ্যই থাকবে। সেই জিহাদে শাহাদাতের তামান্না মুমিনের থাকবে। কিন্তু সমস্যা হল, জিহাদের সাথে বান্দার হক জড়িত। একটা মানুষের রক্তপাত করা দুনিয়ার সবচে’ নিকৃষ্ট হারাম। ষোলোআনা বৈধ হলেই তুমি জিহাদ করতে পার। আন্দাজে কারো ক্ষতি করা, সম্পদ নষ্ট করা ভয়ঙ্করতম হারাম। লক্ষ রাখতে হবে, একটা ইবাদতের নামে আমি যেন হারামে নিপতিত না হই। আমার জানা মতে বর্তমানে শরীআতসম্মত জিহাদ হচ্ছে ফিলিস্তিনে। অধিকাংশ ফকীহ আলেম সিরিয়ার জিহাদকে শরীআতসম্মত জিহাদ বলছেন। যেহেতু তারা সরকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সরকারের নেতৃত্বে জিহাদ করছেন। সেখানে আরব দেশের অনেক মুজাহিদ যাচ্ছেন। তোমার শখ হলে তুমি চলে যেতে পার। এটা ইসলামের কোনো সমাধান না। প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব নিজ নিজ এলাকায় কাজ করা। তোমার দায়িত্ব হল, নিজে দীন শেখো। মানুষকে দাওয়াত দিয়ে আল্লাহর পথে নিয়ে এসো। আমাদের সবসময় একই আক্ষেপ- সমাজ ভালো না হলে কিছু ভালো হবে না। কদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। আমার অনেক সিনিয়র এক স্যার বলছেন, এই রোযায় তাকওয়া হবে না। যতক্ষণ না ইসলামি রাষ্ট্র-সমাজ হবে, ততক্ষণ রোযার মাধ্যমে তাকওয়া হবে না। অবশ্যই আমরা ইসলামি রাষ্ট্র সমাজ চাই। যে চায় না সে তো মুমিনই না। তাহলে বক্তব্য এই দাঁড়াল যে, ইসলামি রাষ্ট্র-সমাজ না হওয়া পর্যন্ত নামায রোযার দরকার নেই। আমাদের সমাজের শতকরা পাঁচজন মানুষ ব্যক্তি জীবনে পুরো মুসলিম। নামায পড়ি আমরা শতকরা পনেরো বিশজন। এই পনেরো বিশজনের ভেতর অনেকেই সুদ খায়, ঘুষ খায়, পর্দা করে না। তাহলে ব্যক্তি জীবনে আমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি এমন মুসলিম পাঁচজন। এখন এই পাঁচজনও নামায রোযা বাদ দিই। যেহেতু ইসলামি সমাজ-রাষ্ট্র নেই, তাহলে নামায রোযা করার দরকার কী! তো ইসলাম কায়েম তো করা লাগবে, দাওয়াত তো দেব না, এখন মারধোর করে, অথবা অন্য কোনোভাবে কিংবা নিজেরাও শেষ হয়ে যাই। ফলে এই পাঁচজনও শেষ হয়ে যাই। তাহলে লাভটা হল কী! সবসময় মনে রাখতে হবে সমাজ একটা নৌকার মতো। আমি কয়দিন আছি, এক সময় চলে যাব, কিন্তু সমাজ চলতে থাকবে। আমার ফরয হল ব্যক্তি জীবনে দীন প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদেরকে দাওয়াত দেয়া। আল্লাহ যদি দাওয়াতে সফলতা দেন, জিহাদের পরিবেশ আসে, তাহলে ইনশাআল্লাহ জিহাদ হবে। কত নবী চলে গেছেন, জিহাদ তো দূরের কথা, উম্মতই পান নি। এ জন্য জিহাদ আল্লাহর দীনের বড় ইবাদত এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জিহাদের শর্ত পূরণ হতে হবে।