hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০৩

হযরত আমীর হামযা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

মক্কার কুরায়শরা নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি বিদ্বেষে পাগল হয়ে উঠেছিলো। একদিন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সাফা পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা এর পাদদেশে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় সেখানে আবূ জাহেল এসে উপস্থিত। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে দেখতে পেয়েই সে প্রথমে তো ভীষণ কর্কশ ও অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ করলো। তিনি এ সবের জবাব মাত্র না দিয়ে নির্বিকার রইলেন। তখন সে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে একটি প্রস্তর নিক্ষেপ করলো। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাতে আহত হলেন এবং তার পবিত্র দেহ থেকে লহু মুবারক নির্গত হতে লাগলো। তিনি চুপচাপ বাড়িতে চলে আসলেন। আবূ জাহেল কা‘বা প্রাঙ্গণে আলাপরত লোকদের সাথে এসে বসে তাদের সাথে আলাপে মেতে উঠলো।

হযরত আমীর হামযা (রা) ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আপন চাচা। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে তিনি অত্যন্ত ভালবাসতেন। কিন্তু তিনি তখনও মুশরিকদের দলভুক্ত। তিনি প্রতিদিন ভোরে তীর-ধনুক নিয়ে শিকারে বের হতেন এবং সারাদিন শিকারের সন্ধানে ঘোরাফিরা করে শিকার করে সন্ধ্যায় ফিরতেন। ফিরেই সর্বপ্রথম তিনি কা‘বায় গিয়ে তাওয়াফ করতেন। তারপর ঘরে ফিরতেন। ঐ দিনও শিকার করে আপন অভ্যাস মতো তিনি ফিরছিলেন। পথেই আবূ জাহেলের বাঁদীর সাথে তার দেখা হয়ে গেলো। বাঁদী তাঁকে বলল, আবূ জাহেল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে গালাগালি দেয় এবং পাথর মেরে জখম করে কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) ধৈর্য ধারণ করে চুপ থাকে।

হযরত হামযা (রা) শুধু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর চাচাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তার দুধ-ভাইও। রক্ত ও দুধের সম্পর্ক তাঁকে অধীর করে তুললো। তিনি প্রথমে খানায়ে কা‘বায় গেলেন। তাওয়াফ শেষ করেই তিনি সোজা ঐ মজলিসের দিকে রওনা হলেন যেখানে বসে আবূ জাহেল আলাপ-আলোচনায় মত্ত ছিলো। হযরত হামযা (রা) ছিলেন বীর পাহলোয়ান। তিনি একজন যোদ্ধা ও বীর পুরুষ বলে গণ্য হতেন। তিনি সেখানে পৌঁছেই ধনুক দিয়ে আবূ জাহেলের মাথায় এমনি জোরে আঘাত করলেন যে, তার মাথা ফেটে দর দর করে রক্ত প্রবাহিত হলো। তারপর মুখে বললেন : আজ থেকে আমিও মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্মের অনুসারী এবং তিনি যা বলে থাকেন আমিও তাই বলি। বলো দেখি হতভাগা তোর কি বলার আছে? আবূ জাহেলের লোকজন তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে তার স্বপক্ষে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু আবূ জাহেল হামযাকে তার বীরত্বের জন্য ভয় করতো। তাই সে নিজেই তাদেরকে সংযত করলো এবং বললো, “আসলেও আমার পক্ষ থেকে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিলো। হামযা যদি তার ভাতিজার অপমানের প্রতিশোধ না নিতেন তাহলে এটা তার আত্মমর্যাদার পরিপন্থী হতো।” সম্ভবত হযরত হামযার কথা শুনেই আবূ জাহেলের মনে আশংকা সৃষ্টি হয়েছিলো যে, পাছে এর রাগ ও জেদের বশে তিনি মুসলমানই না হয়ে যান। আর এজন্যেই সে হযরত হামযা (রা)-কে শুনিয়েই কথাগুলো বলছিলো যেন ব্যাপারটির এখানেই ইতি ঘটে আর তিনি ইসলামের দিকে ঝুঁকে না পড়েন।

আবু জাহেলের সাথে বোঝাপড়া করে হযরত হামযা (রা) হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কাছে এলেন এবং তাকে লক্ষ্য করে বললেন : ভাতিজা, তুমি শুনে আনন্দিত হবে যে, আবূ জাহেলের নিকট থেকে আমি তোমার প্রতিশোধ এরই মধ্যে নিয়ে নিয়েছি।

জবাবে হযরত নবী (সাঃ) বললেন : “চাচা! এ জাতীয় ব্যাপার আমাকে আনন্দ দেয় না। হ্যাঁ, যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তা আমাকে অপার আনন্দ দেবে।” এ কথা শুনে হযরত হামযা (রা) তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন। হযরত হামযা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণে বিপর্যস্ত মুসলমানদের শক্তি ও মনোবল অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠলো। এটা ছিলো নবুওয়াতের ষষ্ঠ পর্যায়ের কথা। সে সময় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হযরত আরকাম (রা)-এর বাড়ীতে অবস্থান করতেন। মক্কার কুরায়শরা তাঁর সাথে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শুরু করে দিয়েছিলো। হযরত হামযা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণে তারা অনেকটা সংযত হলো এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শানে গোস্তাখী করার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়ে গেলো।