১
ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড
লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৬৫
ইরান
ইরান বিশ্বের অত্যন্ত প্রাচীন একটি সম্ভ্রান্ত দেশ বলে গণ্য হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে এদেশে মাহ্ আবাদী ধর্ম প্রচলিত ছিল। ঐ প্রাচীন ধর্মটির অনেক সংস্কারকও সেদেশে জন্মগ্রহণ করে তাদের ধর্মের সংস্কারকার্যে ব্রতী হন। এর প্রথম পর্যায় শেষ না হতেই যরথুস্ত্র নতুনভাবে অগ্নি উপাসনার ধর্ম চালু করেন। এ ধর্মটিকে ‘মাহ্ আবাদী’ ধর্মেরই নতুন সংস্কারকৃত রূপ বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। যরথুস্ত্র সত্য ধর্মের প্রচারক বলে নিজের পরিচয় ব্যক্ত করেন। স্বল্পকালের মধ্যেই এ ধর্মটি ইরানী জনসাধারণ ও রাজ-রাজড়ার ধর্মে পরিণত হয়। সম্ভবত ইরানীরাই পৃথিবীতে সর্বাধিক উন্নতি লাভ করে। তাদের চরম উন্নতির যুগে তাদের রাজ্য ভূমধ্যসাগর এবং মিসর থেকে শুরু করে চীন ও মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত এবং হিমালয় পর্বত ও পারস্য উপসাগর থেকে খাযর হ্রদ ও আলতাই পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। সমগ্র এশিয়া মহাদেশে তাদের সংস্কৃতির জয়-জয়কার ছিলো। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও নৈতিকতা এশিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্র ও জাতির কাছে অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু ইসলামের অভ্যুদয়কাল পর্যন্ত তাদের অবস্থা এতই শোচনীয় হয়ে পড়েছিলো যে, শিরকে লিপ্ত হওয়ার দরুন তারা একে একে তাদের সৌন্দর্য ও সকল সৌকর্য হারিয়ে বসেছিলো। যরথুস্ত্র খোদায়ী গুণসমূহে গুণান্বিত ধরে নিয়ে তারা তাকেও তাদের বাতিল উপাস্যদের তালিকায় শামিল করে নিয়েছিলো। মঙ্গল ও অমঙ্গলের দেবতারূপে তারা ইযদান ও আহরিমন নামে দুইজন দেবতার পূজা করতো। প্রকাশ্যে এবং অত্যন্ত জোরেশোরে আগুনের পূজা হতো। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো। দেশব্যাপী চুরি-রাহাজানিরও বেশ প্রকোপ ছিলো। ব্যভিচার এতই চরমে উঠেছিলো যে, মুযদাক নাহিনজার প্রকাশ্য রাজদরবারে ইরান সম্রাটকে তার রাজমহিষীর সাথে সঙ্গম করার পরামর্শ দেয়, অথচ ইরান অধিপতি তার অসঙ্গত ও নির্লজ্জ প্রস্তাবের বিরুদ্ধাচরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। পারস্পরিক অনৈক্য ও হিংস্রতা, হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতারণা, সবলদের দুর্বলদেরকে পশুর চাইতে অধম জ্ঞান করার মত সামাজিক অনাচারগুলো তাদেরকে দুর্ভাগ্য ও পতনের দিকে এমনিভাবে ধাবিত করছিল যেমনটি বন্যার পানি নিচের দিকে ধাবিত হয়ে থাকে। ইরান যেনো তখন সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি শূন্য হয়ে পড়েছিলো। ফলে যে দেশটি একদা সভ্যতা-সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, তাই যেন তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। সে সময় দেশে কেবল যে নক্ষত্রপূজা ও অগ্নিপূজাই হতো তাই নয় বরং বাদশাহ, মন্ত্রীবর্গ, সিপাহসালার এবং আমীর-উমারারা পর্যন্ত নিরীহ প্রজাসাধারণ থেকে পূজা আদায় করে নিত। এ লাঞ্ছনা, বিড়ম্বনা ও তমসারাশি থেকে ইরানী রাষ্ট্র ও জাতি নিষ্কৃতি পেল তখনই যখন মুসলমানরা বিজয়ীর বেশে ইরান সীমায় প্রবেশ করলো।