hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬১

কুসংস্কার

জিন-পরী, দৈত্য-দানবেও জাহিলিয়াতের আরবরা বিশ্বাস করতো। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, পরীরা পুরুষ লোকের প্রেমে পড়ে এবং জিন্‌রা নারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। জিনদেরকে তারা অদৃশ্য জীবন বলে বিশ্বাস করতো। আবার সাথে সাথে এটাও বিশ্বাস করতো যে, অশরীরী আত্মার সাথে মানুষের জড়দেহের মিলনেও সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে পারে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, জুরহাম মানুষ ও ফেরেশতার মিলনের ফসল ছিল। অনুরূপ ধারণা তারা সাবার রানী বিলকীস সম্পর্কেও পোষণ করতো। আমর ইব্‌ন ইয়ারবু’ সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে, মানুষ ও প্রান্তরের ভূতের মিলনে তার জন্ম হয়েছিল। যে উষ্ট্রীর পাঁচটি শাবক হতো এবং তার পঞ্চমটি নর হতো তারা তার কান ছিদ্র করে দিয়ে তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিতো। সে উষ্ট্রী যদৃচ্ছা ঘুরে বেড়াতে এবং যা ইচ্ছা খেতে পারতো, কেউ তাকে বাধা দিতো না। এমন উষ্ট্রীকে তারা ‘বহীরা’ বলে অভিহিত করতো। ভেড়ার নর শাবক হলে তারা তা’ দেবতার নামে বলি দিত। পক্ষান্তরে মাদী হলে তারা তা নিজেদের জন্যে রেখে দিতো। যদি ভেড়ার দুটো শাবক নর ও মাদী এক সাথে জন্মগ্রহণ করতো তবে এগুলো তারা কুরবানী দিতো না। তারা একে وصليه নামে অভিহিত করতো। যে উষ্ট্রের সহবাসে দশটি উষ্টছানার জন্ম হতো, তারা সেটাকে খুবই সম্ভ্রমের চোখে দেখতো। তারা তাতে মাল বোঝাই করতো না বা নিজেরা তাতে আরোহণ করতো না এবং ষাঁড়ের মতো স্বাধীন ছেড়ে দিতো। তারা এর নামকরণ করতে ‘হাম’ ( حام ) বলে। তারা মূর্তির সম্মুখে বা মূর্তিশালার দেউড়ীতে তিনটি তীর রেখে দিতো। তার একটাতে ‘না’ ও একটাতে ‘হাঁ’ লেখা থাকতো। এ তীরগুলো একটা তূণে থাকতো। যখন কোন বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিত; তখন তারা তূণ থেকে একটা তীর উঠিয়ে দেখতো তাতে কি লেখা আছে। যদি তাতে ‘না’ লিখিত তীর উঠতো তবে তারা সে কাজ থেকে বিরত রইতো। আর ‘হাঁ’ লিখিত তীর উঠলে তাতে দেবতার সম্মতি আছে।

বলে তারা ধরে নিত। যদি তৃতীয় তীরটি উঠতো-যাতে কিছু লিখিত থাকতো না, তাহলে তারা পুনরায় তীর উঠাতো এবং যতক্ষণ ‘হাঁ’ লিখিত তীরের দ্বারা এভাবে দেবতার ইচ্ছা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারতো ততক্ষণ পর্যন্ত এর পুনরাবৃত্তি করে যেতো।

কখনো কার্যব্যাপদেশে বাইরে যেতে হলে তারা ‘রতম’ নামক একটি বৃক্ষের ছোট্ট শাখায় একটা গাঁট দিয়ে যেতো এবং ফিরে এসে দেখতে যে, সে গাঁটটা ঠিক আছে, নাকি খুলে গেছে। ঘটনাক্রমে সে গাঁটটি কোন ভাবে খুলে গেলেই তারা ধরে নিত যে, নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী কারো সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। গাঁটটি পূর্ববৎ থাকলেই কেবল স্ত্রীর সতীত্ব বহাল আছে বলে তারা বিশ্বাস করতো।

কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে তারা তার কবরে তার উষ্ট্রীকে চোখ বন্ধ করে বেঁধে রাখতো এবং উষ্ট্রীটির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই তাকে বেঁধে রাখতো। অথবা ঐ উষ্ট্রীর মাথা পিছনের দিকে টেনে তার বুকের সাথে বেঁধে দিত এবং এভাবেই উষ্ট্রীর মৃত্যু হতো। তাদের ধারণা ছিল যে, তাতে পরকালে যখন ঐ মৃত ব্যক্তি কবর থেকে উত্থিত হবে তখন সে এ উষ্ট্রীটিতে আরোহণ করেই উঠতে পারবে। তাদের বিশ্বাস ছিল, যদি কোন ব্যক্তি কোন জনপদে গিয়ে সেখানকার মহামারী সম্পর্কে ভীত হয় আর সে ব্যক্তি সেই জনপদের দ্বারপথে দাঁড়িয়ে গাধার সুরে চিৎকার করে, তাহলে সে মহামারীর কবল থেকে রক্ষা পাবে। যখন কোন ব্যক্তির উটের সংখ্যা এক হাজার অতিক্রম করতো তাহলে পালের মোটা ষাড়টার দু’টি চোখ উপড়ে ফেলা হতো। তাদের ধারণা ছিল যে, এতে উটের পাল বদনযর থেকে রক্ষা পাবে। যখন কোন উটের খোস-পাঁচড়া হতো তখন সেই অসুস্থ উটের পরিবর্তে তারা সুস্থ উটের গায়ে দাগ দিতো এবং তাদের ধারণা ছিল যে, এভাবে অসুস্থ উটটির রোগ সেরে উঠবে। এ ব্যাপারে কবি নাবেগার উক্তিটি স্মরণ করা যেতে পারে :

حملت على ذنبه وتركته

كذا العز بكوى عيره وهو رائع

তার দোষের বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে তুমি তাকে ছেড়ে দিলে—যেমনটি পাঁচড়া রোগাক্রান্ত উটকে ছেড়ে দিয়ে চারণক্ষেত্রে বিচরণরত সুস্থ উটকে দাগ দেয়া হয়ে থাকে।

অনুরূপভাবে যখন কোন গাভী পানি পান না করতো তখন তারা ষাঁড়কে ধরে বেদম পিটাতো। তাদের ধারণা ছিল, ষাড়ের উপর জিন সওয়ার হয়ে গাভীকে পানি পানে বাধা দিয়ে থাকে। তাদের ধারণা ছিল যে, কোন নিহত ব্যক্তির রক্তের বদলা না নিলে তার মাথার খুপড়ী থেকে একটি পাখি বের হয়ে অস্থিরভাবে চীৎকার করতে থাকে এবং বলতে থাকে আমাকে পানি পান করাও, আমাকে পানি পান করাও এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তার রক্তের শোধ নেয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হয় না। তারা উক্ত কল্পিত পাখির নাম ঠাউরিয়েছিল ‘হামা’। তাদের ধারণা ছিল, প্রতিটি মানুষের পেটে একটি করে সাপ থাকে। যখন সে সাপটি ক্ষুধার্ত হয় তখন পাঁজরের হাড় থেকে সে গোশত খুলে খুলে যায়। তাদের ধারণা ছিল যে, যদি কোন মহিলার গর্ভজাত সন্তান মারা যায়, তাহলে সে মহিলা যদি কোন সম্ভ্রান্তধর্মী ব্যক্তির লাশকে উত্তমরূপে পদদলিত করে, তবে তার সন্তান বাঁচতে শুরু করবে। তাদের ধারণা ছিল যে, জিন-ভূতেরা খরগোশকে ভীষণ ভয় করে। তাই জিন-ভূতের কুপ্রভাব থেকে শিশুদেরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তারা খরগোশের হাড্ডি শিশুদের গলায় তাবীযস্বরূপ ঝুলিয়ে দিত।