১
ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড
লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২২৭
খিলাফতের অধিকার
কুরআনুল করীম অধ্যয়ন করলে একথাও দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পৃথিবীতে রাজত্ব ও সালতানাত তথা খিলাফত প্রদান করা কিংবা রাজত্ব ও সালতানাত কারো কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া আল্লাহ তা‘আলারই বিশেষ কাজ। যদিও প্রত্যেক কাজের প্রকৃত কর্মকর্তা হচ্ছেন আল্লাহ তা‘আলা, কিন্তু তিনি খিলাফত ও সালতানাত প্রদানকারীরূপে সর্বত্র নিজকে নিজেই জাহির করেছেন। এ কার্যকে রূপকভাবেও অন্য কারো সাথে সম্পৃক্ত করা হয় নি। এক স্থানে পরিষ্কারভাবে বলেছেন:
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ .
বলো, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করো এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে লও (৩ : ২৬)।
এখন লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা কোন লোককে খিলাফত বা রাজত্ব দান করেন। অর্থাৎ যারা খিলাফত লাভ করেন, তাদের স্বতন্ত্র নিদর্শন ও বৈশিষ্ট্য কি? আদম বা বনী আদম যে পৃথিবীবাসীর উপর রাজত্ব লাভ করেছে, তার কারণ কুরআনুল করীম অধ্যয়ন করলে যা জানা যায় তা হচ্ছে, ইলম বা জ্ঞান। وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন (২:৩১)। ফেরেশতারা রক্তপাত ও ফাসাদ সৃষ্টিকে আল্লাহর খিলাফত লাভের পরিপন্থী ভেবেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলার গুণকীর্তন করাকে খিলাফতের অধিকার ও নিদর্শন সাব্যস্ত করেছেন। আমরা স্বচক্ষে অবলোকন করছি, মানব জাতি নিছক প্রশস্ত জ্ঞানের দরুনই অন্যসব সৃষ্ট বস্তুর উপর রাজত্ব লাভ করেছে। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর চেয়ে মানুষ যদি অধিক জ্ঞানী না হয়, তবে বাতাসের একটু ধাক্কা, পানির একটি ঢেউ, গাছের একটি পাতা ও জড় পদার্থের একটি অণুও মানুষকে কাবু করতে পারে এবং তাকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের বদৌলতে বাঘ, হাতি, নদী, পাহাড়, বাতাস, আগুন, বিদ্যুৎ প্রভৃতি সবকিছুকেই মানুষের সেবা, আনুগত্য ও আরামদানের জন্য প্রস্তুত ও গোলামের মতো অনুগত দৃষ্ট হচ্ছে। কুরআনুল করীমের উপর চিন্তা করলে দেখা যায় তালুতের রাজত্বের উপর যখন লোকেরা আপত্তি তুললো, তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নবীর মাধ্যমে আপত্তিকারীদের জবাব দিলেন যে,
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ ۖ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ .
আল্লাহই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় কর্তৃত্ব দান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। (২:২৪৭)
হযরত দাউদ (আ)-কে রাজত্ব ও খিলাফত দান করে আল্লাহ তা‘আলা আদেশ করলেন যে, فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার করো এবং খেয়ালখুশীর অনুকরণ করো না। (৩৮ : ২৬)
আবার অন্যত্র বলেছেন :
وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا ۙ وَجَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ وَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ ﴿١٣﴾ ثُمَّ جَعَلْنَاكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ مِنْ بَعْدِهِمْ لِنَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ ﴿١٤﴾
তোমাদের পূর্বে বহু মানব গোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি যখন তারা সীমা অতিক্রম করেছিল। স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ তাদের নিকট তাদের রাসূল এসেছিল, কিন্তু তারা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এইভাবে অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি। অতঃপর আমি তাদের পর পৃথিবীতে তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেছি, তোমরা কি প্রকার আচরণ করো, তা দেখার জন্য। (১০ : ১৩-১৪)
কুরআনুল করীমে এই ধরনের হাজারো আয়াতের সন্ধান পাওয়া যায় যাতে খলীফা অর্থ শাসক এবং খিলাফত অর্থ রাজত্ব। আর রাজত্ব ও রাজ্য শাসনের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে জ্ঞান, সুবিচার, শক্তি, সংস্কার ও জনকল্যাণ, রাজা-বাদশাহ ও খলীফাদের জন্য যা সব সময় আবশ্যক ছিল এবং এসব শর্ত ও গুণ ছাড়া কোন বাদশাহ বা কোন সুলতান তার রাজত্ব ও সালতানাত টিকিয়ে রাখতে পারেন না। এই উত্তম গুণাবলী পয়গাম্বর ও রাসূলদের শিক্ষা থেকেই লাভ করা যেতে পারে। কিন্তু এটা জরুরী নয় যে, প্রত্যেক রাসূল ও প্রত্যেক পয়গাম্বর অবশ্যই রাজা-বাদশাহও হবেন। খিলাফতের জন্য যদি নিছক ইবাদত ও আল্লাহ তা‘আলার গুণ-কীর্তন করাই জরুরী হতো, তবে কেবল পয়গাম্বর বা ফেরেশতাকেই পৃথিবীতে শাসকরূপে দেখা যেতো এবং তাদের ছাড়া অন্য কেউ সালাতানাত বা রাজত্ব লাভ করতে পারতো না। কিন্তু পর্যবেক্ষণ তা সমর্থন করে না। অতএব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই ফল বেরিয়ে আসলো যে, খিলাফত মূলত রাজত্ব ও সালতানাত ধৈর্য ছাড়া আর কিছু নয়। খলীফা বা রাজা-বাদশাহ আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা বানান এবং যখন কোন শাসক জাতি জাতিগতভাবে জুলুম-অত্যাচারে নেমে আসে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিকট থেকে রাজত্ব বা খিলাফত ছিনিয়ে নেন এবং অন্য যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ .
বলো, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করো এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে লও (৩ : ২৬)।
এখন লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা কোন লোককে খিলাফত বা রাজত্ব দান করেন। অর্থাৎ যারা খিলাফত লাভ করেন, তাদের স্বতন্ত্র নিদর্শন ও বৈশিষ্ট্য কি? আদম বা বনী আদম যে পৃথিবীবাসীর উপর রাজত্ব লাভ করেছে, তার কারণ কুরআনুল করীম অধ্যয়ন করলে যা জানা যায় তা হচ্ছে, ইলম বা জ্ঞান। وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন (২:৩১)। ফেরেশতারা রক্তপাত ও ফাসাদ সৃষ্টিকে আল্লাহর খিলাফত লাভের পরিপন্থী ভেবেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলার গুণকীর্তন করাকে খিলাফতের অধিকার ও নিদর্শন সাব্যস্ত করেছেন। আমরা স্বচক্ষে অবলোকন করছি, মানব জাতি নিছক প্রশস্ত জ্ঞানের দরুনই অন্যসব সৃষ্ট বস্তুর উপর রাজত্ব লাভ করেছে। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর চেয়ে মানুষ যদি অধিক জ্ঞানী না হয়, তবে বাতাসের একটু ধাক্কা, পানির একটি ঢেউ, গাছের একটি পাতা ও জড় পদার্থের একটি অণুও মানুষকে কাবু করতে পারে এবং তাকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের বদৌলতে বাঘ, হাতি, নদী, পাহাড়, বাতাস, আগুন, বিদ্যুৎ প্রভৃতি সবকিছুকেই মানুষের সেবা, আনুগত্য ও আরামদানের জন্য প্রস্তুত ও গোলামের মতো অনুগত দৃষ্ট হচ্ছে। কুরআনুল করীমের উপর চিন্তা করলে দেখা যায় তালুতের রাজত্বের উপর যখন লোকেরা আপত্তি তুললো, তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নবীর মাধ্যমে আপত্তিকারীদের জবাব দিলেন যে,
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ ۖ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ .
আল্লাহই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় কর্তৃত্ব দান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। (২:২৪৭)
হযরত দাউদ (আ)-কে রাজত্ব ও খিলাফত দান করে আল্লাহ তা‘আলা আদেশ করলেন যে, فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার করো এবং খেয়ালখুশীর অনুকরণ করো না। (৩৮ : ২৬)
আবার অন্যত্র বলেছেন :
وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا ۙ وَجَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ وَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ ﴿١٣﴾ ثُمَّ جَعَلْنَاكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ مِنْ بَعْدِهِمْ لِنَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ ﴿١٤﴾
তোমাদের পূর্বে বহু মানব গোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি যখন তারা সীমা অতিক্রম করেছিল। স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ তাদের নিকট তাদের রাসূল এসেছিল, কিন্তু তারা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এইভাবে অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি। অতঃপর আমি তাদের পর পৃথিবীতে তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেছি, তোমরা কি প্রকার আচরণ করো, তা দেখার জন্য। (১০ : ১৩-১৪)
কুরআনুল করীমে এই ধরনের হাজারো আয়াতের সন্ধান পাওয়া যায় যাতে খলীফা অর্থ শাসক এবং খিলাফত অর্থ রাজত্ব। আর রাজত্ব ও রাজ্য শাসনের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে জ্ঞান, সুবিচার, শক্তি, সংস্কার ও জনকল্যাণ, রাজা-বাদশাহ ও খলীফাদের জন্য যা সব সময় আবশ্যক ছিল এবং এসব শর্ত ও গুণ ছাড়া কোন বাদশাহ বা কোন সুলতান তার রাজত্ব ও সালতানাত টিকিয়ে রাখতে পারেন না। এই উত্তম গুণাবলী পয়গাম্বর ও রাসূলদের শিক্ষা থেকেই লাভ করা যেতে পারে। কিন্তু এটা জরুরী নয় যে, প্রত্যেক রাসূল ও প্রত্যেক পয়গাম্বর অবশ্যই রাজা-বাদশাহও হবেন। খিলাফতের জন্য যদি নিছক ইবাদত ও আল্লাহ তা‘আলার গুণ-কীর্তন করাই জরুরী হতো, তবে কেবল পয়গাম্বর বা ফেরেশতাকেই পৃথিবীতে শাসকরূপে দেখা যেতো এবং তাদের ছাড়া অন্য কেউ সালাতানাত বা রাজত্ব লাভ করতে পারতো না। কিন্তু পর্যবেক্ষণ তা সমর্থন করে না। অতএব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই ফল বেরিয়ে আসলো যে, খিলাফত মূলত রাজত্ব ও সালতানাত ধৈর্য ছাড়া আর কিছু নয়। খলীফা বা রাজা-বাদশাহ আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা বানান এবং যখন কোন শাসক জাতি জাতিগতভাবে জুলুম-অত্যাচারে নেমে আসে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিকট থেকে রাজত্ব বা খিলাফত ছিনিয়ে নেন এবং অন্য যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।