hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

ইতিহাসবেত্তা

একজন যথার্থ ধার্মিক এবং সঠিক চিন্তাধারার লোকই একজন সত্যিকারের ইতিহাসবেত্তা হতে পারেন। তিনি শুধু তা-ই লিখবেন যা সত্যি সত্যি ঘটেছে। তিনি কোন কিছু গোপনও করবেন না বা নিজের পক্ষ থেকে কিছু বাড়িয়েও লিখবেন না। যেসব ক্ষেত্রে স্বল্পবুদ্ধির লোকদের হোঁচট খাওয়ার আশংকা থাকে বা ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় সেসব ক্ষেত্রে তিনি তার নিজের পক্ষ থেকে এর একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই দেবেন বরং এটা ঐতিহাসিকের একটা দায়িত্বও বটে। ইতিহাসবেত্তা কারো অহেতুক তোষামোদও করবে না। আবার বিদ্বেষুবশত কারো বিরুদ্ধেও তিনি কিছু লিখবেন না। ইতিহাসবেত্তার ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি হবে একান্তই সাদাসিধে, অনাড়ম্বর, সহজবোধ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত। ছান্দসিক ভাষা প্রয়োগ ও ভাষার অলংকরণের প্রচেষ্টার মধ্যে অনেক সময় ইতিহাসের আসল বক্তব্যই হারিয়ে যায়। আর এজন্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ছন্দোবদ্ধ ভাষায় বিরচিত ইতিহাসগুলো নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত বলে প্রতিপন্ন হয়নি। ইতিহাসবেত্তার জন্যে বিশ্বস্ততা হচ্ছে অপরিহার্য গুণ। সত্য ভাষণ ও সদাচারে তাকে অবশ্যই অন্য দশজনের তুলনায় অনন্য হতে হবে। মিথ্যাচার ও বাচালতা থেকে তাকে অবশ্যই মুক্ত থাকতে হবে। ইতিহাসের বিন্যাসে একজন ঐতিহাসিককে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করতে হয়। তারপরও সঠিক তত্ত্ব হস্তগত হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

জ্যোতির্বিদ্যা, ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্তর সংক্রান্ত বিদ্যা, সমাজবিদ্যা এবং পৃথিবীর নানা ধর্ম সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন ছাড়াও ইতিহাসবেত্তাকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণধী ও ন্যায়নিষ্ঠ এবং যুগপৎভাবে কথাশিল্পীও হতে হয় যাতে আপন বক্তব্য তিনি অনায়াসে গুছিয়ে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। এতসব সত্তেও এমন কিছু সমস্যা রয়েই যায় যেগুলোর সমাধান প্রায় অসম্ভব মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ ধরুন, কোন ব্যক্তির থিয়েটারে যাওয়ার কথা একজন রাবী বা বর্ণনাকারী রিওয়ায়াত করলেন। এ রিওয়ায়াতটির দ্বারা বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, অথচ নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল যে এগুলোর কোন একটিও যথার্থ বা অযথার্থ। হতে পারে :

১. যে লোকটি থিয়েটারে গিয়েছিল, সে গানের বড় অনুরাগী।

২. গানের অনুরাগী ঠিক সে নয়, তবে সৌন্দর্য অনুরাগী।

৩. আসলে সে সৌন্দর্য অনুরাগীও নয়, ঘটনাচক্রে জনৈকা অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ে গিয়েছে।

৪. আসলে কারো প্রেমিক সে হয়নি, কোন এক বন্ধুর সাথে সাক্ষাতের মানসেই সে থিয়েটারে গিয়েছিল।

৫. থিয়েটার সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ রচনার প্রয়োজন ছিল বিধায় সে থিয়েটার দেখতে গিয়েছিল।

৬. থিয়েটারের বিরুদ্ধে কোথাও লোকটির একটি বক্তৃতা করার কথা ছিল, তাই স্বচক্ষে তার ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলো অবলোকন করার জন্যেই গিয়েছিল।

৭. লোকটির চাকরি ছিল গোয়েন্দা পুলিশের। অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের জন্যেই সে সেখানে গিয়েছিল।

৮. আসলে সে নিজে থিয়েটার দেখা পছন্দ করে না, বন্ধু-বান্ধবের চাপে পড়েই গিয়েছিল।

৯. লোকটি আসলে একজন ধার্মিক আল্লাহওয়ালা লোক ছিল। লোকজনের ভক্তি বিশ্বাসের দৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষার জন্যেই সে এমনটি করেছে।

১০. কেবল পকেটমারার সুবিধার জন্যেই সে থিয়েটারে গিয়েছিল।

মোটকথা, এরূপ একটি রিওয়ায়াত থেকে শত শত সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসতে পারে। তারপর একটি সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণের জন্যে অন্যান্য উপাদান থেকে সাহায্য ও সমর্থন নিতে হয়। সে সহায়ক উপাদানের মধ্যেও আবার নানারূপ সংশয় সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। ইতিহাস লেখক যদি নিরপেক্ষমনা না হন এবং পূর্ব থেকেই কোন এক নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি তার দুর্বলতা থেকে থাকে তাহলে তার বিরোধী সব দলীল-প্রমাণকে সে অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে উপেক্ষা করে যাবে এবং তার স্বপক্ষের দলীল-প্রমাণ খুঁজে খুঁজে বের করতে থাকবে। এভাবে নিজেও বিভ্রান্ত হয়ে এবং অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত করবে।