১
ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড
লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৯৬
হযরত আবূ উবায়দ ইব্ন মাসঊদ (রা)-এর প্রথম কীর্তি
উপরে উল্লিখিত হয়েছে যে, হযরত ফারূকে আযম (রা) তাঁর খিলাফতের প্রথম সপ্তাহে হযরত মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা), সা‘দ ইব্ন উবায়দ (রা), হযরত সালীহ ইব্ন কায়স (রা) এবং হযরত আবূ ইব্ন মাসঊদ (রা)-কে ইরাকের দিকে প্রেরণ করেন। হযরত মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা) উল্লিখিত সেনাপতিদের সাথে একই সময়ে মদীনা শরীফ থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন বটে, তবে যেহেতু হযরত আবূ উবায়দ ইব্ন মাসঊদ (রা) (যাকে ইরাকে মোতায়েন সমগ্র মুসলিম বাহিনীর প্রথম সেনাপতি নিয়োগ করা হয়েছিল) পথিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে আরবের বিভিন্ন গোত্র থেকে মুসলিম বাহিনীতে লোক নিয়োগ করে যাচ্ছিলেন, তাই তিনি মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা)-এর এক মাস পর ইরাকে গিয়ে পৌঁছেন। হযরত মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা) হীরায় উপনীত হয়ে লক্ষ্য করেন যে, ইরানীরা ইরাকের সকল নেতৃস্থানীয় লোককে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে ফেলেছে। তাছাড়া খুরাসানের গভর্নর রুস্তম ইরানের রাজধানী মাদায়েনে এসে মজবুত হয়ে বসেছেন। তিনি সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি সুদৃঢ় করা ছাড়াও বিভিন্ন অমুসলিম গোত্রকে মুসলমানগণের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছেন। সাওয়াদ ও হীরার প্রতিপত্তিশালী লোকগণ যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে বসেছিলেন। হযরত মুছান্না ইব্ন হারিছা ইরাকে উপনীত হতেই রুস্তম এক দুর্ধর্ষ বাহিনী তার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন এবং অপর এক বিরাট বাহিনী নারসী নামক রাজ-পরিবারের একজন অভিজ্ঞ বীর সেনানীর সেনাপতিত্বে কসকরের দিকে পাঠান। তিনি তৃতীয় আর এক বিরাট বাহিনী জাবান নামক একজন দলনেতার অধীনে ফুরাতের নিম্নভূমির দিকে প্রেরণ করেন। তারা নামারিক নামক স্থানে গিয়ে তাঁবু ফেলে। হযরত মুছান্না (রা) হীরা থেকে বের হয়ে ‘খাফান’ নামক স্থানে অবস্থান নেন। ইতিমধ্যে হযরত আবূ উবায়দ ইব্ন মাসঊদ (রা) সেখানে গিয়ে পৌঁছেন এবং সম্মিলিত বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেন। তিনি মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা)-এর অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করে খাফানেই মোতায়েন করেন এবং নিজে নামারিক পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে জাবানের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। ফলে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। শেষ পর্যন্ত হযরত আবূ উবায়দ (রা) নিজেই ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে ইরানী বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সারির পর সারি ছিন্ন ভিন্ন করে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হন। ইসলামী বাহিনীও তাদের নেতাকে অনুসরণ করে ইরানী বাহিনীর উপর বীরোচিত হামলা চালায়। ইরানীরা টিকতে না পেরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে। মাতার ইব্ন ফায়যা রাবীঈ নামক ইসলামী বাহিনীর জনৈক বীর সেনানী ‘সেনাপতি জাবান’ বন্দী করে ফেলেন। ইনিই যে ‘সেনাপতি জাবান’ তা তার জানা ছিল না। জাবান তাকে বললেন, তুমি আমাকে বন্দী করে রেখে কি করবে? আমি তোমাকে অত্যন্ত দামী, দু’টি ক্রীতদাস দেব, সেগুলোর বিনিময়ে তুমি আমাকে নিরাপত্তা প্রদান কর। মাতার তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং মুক্ত করে দেন। যখন সে ছাড়া পেয়ে চলে যাচ্ছিলো তখন অপর একজন মুজাহিদ তার সঠিক পরিচয় জানতে পারেন এবং তাকে পুনরায় বন্দী করে হযরত আবূ উবায়দ ইব্ন মাসঊদ (রা)-এর কাছে নিয়ে যান এবং বলেন, সে ইরানী সেনাপতি। সে ধোঁকা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা আদায় করে নিয়েছে। হযরত আবূ উবায়দ (রা) মাতার ইব্ন ফায়যাকে ডেকে পাঠিয়ে যখন এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি বলেন ‘হাঁ, আমি তাকে নিরাপত্তা দান করেছি। হযরত আবূ উবায়দা (রা) তখন বলেন, যখন একজন মুসলমান তাকে নিরাপত্তা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তখন সে প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধাচরণ করা কোন মুসলমানের জন্যই বৈধ হবে না। তিনি জাবানকে নিরাপত্তা সহকারে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিদায় দেন। জাবান সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে পলায়নপর বাহিনীসহ কসকর নামক স্থানে গিয়ে সেনাপতি নারসীর সাথে মিলিত হন।