hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৬১

ইসলাম ত্যাগের পূর্ণ মূলোচ্ছেদ

মোটকথা, এগার হিজরীর সমাপ্তি এবং বারো হিজরী আরম্ভ হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) আরব দেশের মুরতাদ সমস্যার উপর পূর্ণ বিজয় লাভ করেন। এগার হিজরীর মুহাররম মাসে আরব উপদ্বীপ মুশরিক ও মুরতাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হয়েছিল এবং উপদ্বীপের কোন অঞ্চল ও অংশের উপর শিরক ও মুরতাদ হওয়ার কোন কালিমা অবশিষ্ট ছিল না। একদিকে কয়েক মাস পূর্বেকার এই অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করুন যে, মদীনা, মক্কা ও তায়িফ ছাড়া গোটা দেশের দিকচক্রবাল ছিল ধূলিতে আচ্ছন্ন। আর এই ধূলিমেঘ থেকে তলোয়ার-নেযা ও তীর-ধনুকের ঝড় বইতে দেখা যাচ্ছিল। অবস্থা এরূপ ছিল যে, প্রস্তর মোমের মতো গলে যেতে পারতো এবং ইস্পাতের তার কাঁচা সুতার মতো ছিঁড়ে যেতে পারতো। পর্বতের চেয়েও অধিক হিম্মত নদীর পানির মতো বয়ে যেতে পারতো এবং আকাশের মতো উচ্চ ও উন্মুক্ত উদ্দীপনা সংকীর্ণ ও অবনত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠের অতল গহীনে হারিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু মুহাম্মদী পাঠশালায় শিক্ষাপ্রাপ্ত সিদ্দীকে আকবর (রা)-এর হিম্মত ও সাহসের পরিমাপ করুন! তিনি একাকী এইসব ঝড়-ঝঞ্ঝার মুকাবিলার জন্য যে পরাক্রম ও বীরত্বের সাথে ময়দানে আত্মপ্রকাশ করেন আমরা তার দৃষ্টান্ত স্বরূপ না ব্যাঘ্র ও কুম্ভীরের নাম উল্লেখ করতে পারি, না রুস্তম ও ইসফানদিয়ার (পারস্য সম্রাট)-এর নাম উচ্চারণ করতে পারি। বন্য-ব্যাঘ্র ও পারস্য বীর রুস্তম-হৃদয়ে যদি সিদ্দীকে আকবর (রা)-এর হৃদয়শক্তির এক-শতাংশও বিদ্যমান থাকতো, তাহলে আমাদের কোন দৃষ্টান্ত অন্বেষণে হয়রান হতে হতো না। কিন্তু এখন আমরা এ ছাড়া আর কিছুই বলতে পারি না যে, খায়রুল-বাশার (মানবোত্তম) নবী (সাঃ)-এর কর্তব্যপরায়ণ শিষ্য, খাতামুন-নাবিয়্যীনের প্রথম খলীফা যথার্থই তার মর্যাদা মাফিক সাহস ও দৃঢ়তা এবং ঐশী শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যে কাজ গ্রীক-সম্রাট আলেকজাণ্ডার, রোম-সম্রাট জুলিয়াস সিজার ও পারস্য-সম্রাট কায়খসরু একত্রিত হয়েও সম্পন্ন করার সাহস করতেন না হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা) তা কয়েক মাসের মধ্যে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করে দেখিয়েছেন।

নিঃসন্দেহে সিদ্দীকী বাহিনীতে খালিদ (রা), ইকরামা (রা), শুরাহবিল (রা), হুযায়ফা (রা) প্রমুখের ন্যায় অতুলনীয় বীরগণ বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু এটাও ভেবে দেখুন যে, সিদ্দীকে আকবর (রা) কিভাবে মদীনা মুনাওয়ারায় বসে থেকে দেশের প্রতিটি অংশ ও প্রতিটি অঞ্চলের পরিস্থিতি অবহিত ছিলেন এবং কিভাবে সেনাদলের কাছে তাঁর নির্দেশাবলী পৌঁছে যেতো। চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে, প্রতিটি সেনাদল ও প্রতিটি সেনাপতি ছিলেন আরব শতরঞ্জীর উপর এক একটি দাবার গুটির মতো এবং সিদ্দীকে আকবর (রা)-এর দক্ষ অঙ্গুলি যে গুটিটি যে-স্থানে চালা উপযোগী হতো, সেখানেই চালতো। বাহ্যত মনে হচ্ছে, ঐ এগারটি ইসলামী সেনাদল সর্বত্র অভিযান চালিয়ে আরবদেশ থেকে মুরতাদ সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সত্য কথা এই যে, রাসূলের খলীফা মদীনায় বসে বসে সিরিয়া ও নজ্‌দ হতে মাসকাত ও হাদরামাউত পর্যন্ত এবং পারস্যোপসাগর হতেই ইয়ামন ও আদন (এডেন) পর্যন্ত গোটা সাম্রাজ্যটিকে একা তার কৌশল ও বুদ্ধি দ্বারা কয়েক মাসের মধ্যে যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ও জঞ্জালমুক্ত করেন। এই ফিতনার প্রারম্ভে সিদ্দীকে আকবর (রা) ছাড়া এমন কোন ব্যক্তি ছিল না, যে তার পরিসমাপ্তি দেখতে পারতো এবং কেবলমাত্র সিদ্দীকে আকবরই সেই তেজোদীপ্ত ঈমানের অধিকারী ছিলেন, যার বলে তিনি না উসামা বাহিনী প্রেরণ মুলতবি করা সমীচীন ভাবেন, না মসজিদে নববীতে হযরত উমর ফারুক (রা)-এর হাত-পা অবশকারী উক্তিতে প্রভাবিত হন, না যাকাত অস্বীকারকারীদের দাবী-দাওয়াকে তিনি তৃণতুল্যও মূল্য দেন। এখন আপনি চিন্তা করুন ও ভাবুন, হযরত নবী করীম (সাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত ও নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের শাহানশাহ সিদ্দীকে আকবর (রা) ছাড়া আর কে হতে পারতেন?