hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৩২

সন্ধিপত্র

আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমের মুআবিয়া (রা)-এর সীলমোহর লাগানো ও স্বাক্ষরযুক্ত কাগজটি নিয়ে এলেন এবং এতে যে কোন শর্ত লিপিবদ্ধ করার কথা বললেন, তখন ইমাম হাসান (রা) বলেন, আমি কখনো এই শর্ত পছন্দ করি না যে, আমীরে মুআবিয়ার পর আমাকে খলীফা মনোনীত করা হোক। কেননা আমি যদি খিলাফতের একান্ত প্রত্যাশীই হতাম তাহলে এখন তা ছেড়ে দিতাম না। এরপর তিনি কাতিবকে ডেকে সন্ধিপত্র লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সন্ধিপত্রের ভাষা ছিল নিম্নরূপ :

এই সন্ধিপত্রটি হাসান ইব্‌ন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব এবং মুআবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফিয়ানের মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। তারা উভয়ে নিম্নলিখিত বিষয়ে একমত হয়েছেন। খিলাফতের দায়িত্ব মুআবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফিয়ানের হাতে সোপর্দ করা গেল। তার পরে মুসলমানরা সময়ের দাবি অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা খলীফা নির্বাচন করবে। মুআবিয়ার হাত ও জিহবা (কথা) থেকে সব মুসলমান নিরাপদ থাকবে। তিনি সকলের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। আলী (রা)-এর সাথে সম্পর্কিত এবং তার পক্ষাবলম্বনকারী অনুরূপভাবে হাসান, হুসায়ন এবং তাঁদের সম্পর্কিতদেরকে আমীরে মুআবিয়া কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবেন না। ইমাম হাসান ও হুসায়ন (রা) এবং তাদের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা যে শহরে বা যে বসতিতে ইচ্ছা বসবাস করতে পারে। মুআবিয়া, তার কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের এই অধিকার থাকবে না যে, তারা ওদেরকে নিজেদের অধীনস্থ মনে করে নিজেদের কোন ব্যক্তিগত নির্দেশ পালনে বাধ্য করবেন। মুআবিয়া (রা) সব সময় আসওয়া প্রদেশ থেকে আদায়কৃত খারাজ হাসান (রা)-কে প্রদান করতে থাকবেন। কূফার বায়তুলমালে বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ মজুদ আছে, হাসান (রা)-কে তার মালিক বলে স্বীকার করে নেওয়া হবে। তিনি এই অর্থ যেভাবে ইচ্ছা খরচ করতে পারবেন। উপহার-উপঢৌকন প্রদানের ব্যাপারে আমীরে মুআবিয়া (রা) বনু হাশিমকে অন্যদের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করবেন।

এই চুক্তিপত্রের উপর সাক্ষী ও যামিন হিসাবে আবদুল্লাহ ইব্‌ন হারিছ ইব্‌ন নাওফাল, উমর ইব্‌ন আবী সালামা প্রমুখ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এই চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়ে আনবারে মুআবিয়া (রা)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। তিনি সেখান থেকে অবরোধ উঠিয়ে নেন এবং কায়স ইব্‌ন সা‘দ (রা)-কে মুক্ত করে দিয়ে কূফা অভিমুখে রওয়ানা হন। কায়স (রা)-ঐ দিন সন্ধ্যায় আপন সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে কূফায় গিয়ে পৌঁছেন। মুআবিয়া (রা) কুফার জামে মসজিদে পৌঁছে ইমাম হাসান (রা) ও কূফাবাসীদের কাছ থেকে বায়‘আত নেন। কায়স ইব্‌ন সা‘দ বায়‘আত করতে স্বীকৃত হননি এবং মসজিদেও আসেন নি। মুআবিয়া (রা) তাঁর কাছেও আপন স্বাক্ষর ও মোহর সংযুক্ত একটি সাদা কাগজ পাঠিয়ে দিয়ে বলেন, তোমার যে শর্ত ইচ্ছা, এর উপর লিখে দাও, আমি তা মেনে নেব। তখন কায়স ইব্‌ন সা‘দ তাঁর কাছে নিজের ও নিজের সঙ্গীদের প্রাণের নিরাপত্তা চান। তিনি কোন ধনসম্পদ তার কাছে চাননি। মুআবিয়া (রা) সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই শর্তগুলো মেনে নেন। এরপর কায়স ও তাঁর সঙ্গীরা মুআবিয়া (রা)-এর হাতে বায়‘আত করেন।

ইমাম হুসায়ন (রা)-ও বায়‘আত করতে অস্বীকার করেন। এজন্য মুআবিয়া (রা)-এর পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হলে হাসান (রা) তাকে বলেন, আপনি ওর উপর চাপ দিবেন না। কেননা আপনার হাতে বায়‘আত করার চাইতে তার কাছে তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ অধিক প্রিয়। একথা শুনে মুআবিয়া (রা) নীরব হয়ে যান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইমাম হুসায়ন (রা)-ও আমীর মুআবিয়ার হাতে বায়‘আত করেন। ঐ সফরে আমীর মুআবিয়ার সাথে আমর ইবনুল ‘আস (রা)-ও ছিলেন। তিনি আমীরে মুআবিয়াকে বলেন, “এখন আপনি হাসান (রা)-কে বলুন যেন তিনি জনতার সামনে একটি ভাষণ দেন। মুআবিয়া (রা) তাঁর এই পরামর্শ পছন্দ করেন। হাসান (রা) জনতার সামনে নিম্নোক্ত ভাষণ দেন :

মুসলমানগণ! আমি বিশৃঙ্খলা খুবই অপছন্দ করি। আমি আমার মাতামহের উম্মত থেকে ফিতনা-ফাসাদ দূরীকরণ এবং মুসলমানদের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য আমীরে মুআবিয়ার সাথে সন্ধি করেছি এবং তাঁকে আমীর ও খলীফা বলে স্বীকার করে নিয়েছি। যদি খিলাফত ও রাষ্ট্র পরিচালনা তার অধিকার হয়ে থাকে তাহলে তা তাঁর হাতে পৌঁছে গেছে। আর যদি আমার অধিকার হয়ে থাকে তাহলে আমি তা তাকে দান করলাম।