hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৭৭

ফিরায যুদ্ধ

হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) ফিরাযে পৌঁছে যুদ্ধের প্রস্তাবনা পেশ করলেন। এই স্থানটি ছিল ফোরাত নদীর কূল ঘেঁষে। অপর পারে রোমক সৈন্য তাঁবু ফেলেছিল। রোমক সৈন্য বার্তা পাঠালো যে, হয়তো তোমরা ফোরাত নদীর এপারে এসো, অথবা আমাদেরকে ওপারে যেতে দাও যাতে আমরা এবং তোমরা একে অন্যের মুখোমুখি হতে পারি।

হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) জবাব দিলেন, তোমরাই এপারে এসো। সুতরাং রোমক বাহিনী নদী পার হয়ে ... ইসলামী লশকরের মুখোমুখি হলো। ইসলামী লশকর উপর্যুপরি সফর ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। রোমকরা ছিল সম্পূর্ণ সতেজ ও শ্রান্তিহীন। জনশক্তির দিক দিয়েও তারা আট-দশগুণ বেশি ছিল। যুদ্ধ শুরু হলো। সারা দিন দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও তুমুল যুদ্ধ চললো। অবশেষে রোমক বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হলো এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্রে একলাখ মৃতদেহ রেখে মুসলমানদের সম্মুখ থেকে পলায়ন করলো। এই যুদ্ধ শেষ করে ১২ হিজরীর ২৫শে যিলকদ হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) শাজারা ইবনুল আগার সহকারে গোটা বাহিনীকে হীরা অভিমুখে ফেরত পাঠালেন এবং নিজে কয়েকজন সহচর নিয়ে নিঃশব্দে ফিরায থেকে প্রস্থান করে মক্কা মুআযযমা পৌঁছে বায়তুল্লাহ্‌র হজ্জে শরীক হলেন।

হজ্জ সমাপন করে তৎক্ষণাৎ তিনি হীরা অভিমুখে গমন করলেন। হীরা পৌঁছে যখন তিনি লশকরে শরীক হলেন, তখন কেউ ধারণাও করতে পারেননি তিনি হজ্জ করে এসেছেন। ঘটনাচক্রে এই খবর গোপন রইল না। ক্রমে ক্রমে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর কানে পৌঁছে গেলো। তিনি খালিদ (রা)-কে ভবিষ্যতে এই ধরনের কাজ করতে নিষেধ করলেন এবং কিছুটা অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করলেন। এই বছর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-ও বায়তুল্লাহ্‌র হজ্জ আদায় করেন এবং হযরত উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মদীনা মুনাওয়ারায় স্বীয় স্থলবর্তী নিয়োগ করেন। হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) হীরায় ফিরে এসে সেখানকার অবশিষ্ট ছোট ছোট স্থানগুলো দখল করলেন।

হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) ১৩ হিজরীর রবীউল আউয়াল পর্যন্ত হীরায় অবস্থান করেন। ১২ হিজরীর মুহাররমের শেষ দিকে তিনি ঐ এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি পায়ে পায়ে শত্রুর মুকাবিলা করেন এবং বিশটি রক্তক্ষয়ী বড় যুদ্ধ পরিচালনা করেন। প্রতিটি যুদ্ধেই তার সৈন্যসংখ্যা কম এবং শত্রুপক্ষের সৈন্য কয়েকগুণ বেশী ছিল। প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি জয়লাভ করেন। কোন স্থানেই তিনি পরাস্ত ও পরাভূত হননি। ইরানীদের অহংকারী মনে ও শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তরে তাঁর বাহুবল ও দৃঢ়চিত্ততার বদৌলতে ভীতি সৃষ্টি হলো। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি যে বিশাল দেশ ও বড় বড় গোত্র-গোষ্ঠী বশীভূত করেছেন, তার দৃষ্টান্ত বিশ্ব-ইতিহাসে সহজে পাওয়া যাবে না। হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর অতুলনীয় বীরত্ব ও যোগ্যতাপূর্ণ সৈনাপত্যের জন্য তাঁর উপর দরূদ ও সালাম পাঠাতে আমরা বাধ্য। কিন্তু এই সমুদয় খালিদী কৃতিত্বের একটি মূলতত্ত্ব ও প্রাণশক্তি রয়েছে। সেই মূলতত্ত্ব ও প্রাণশক্তিও আমাদের খুঁজে বের করা উচিত। সেটা হচ্ছে, সিদ্দীকী নির্বাচন, সিদ্দীকী প্রশিক্ষণ ও সিদ্দীকী দিক-নির্দেশনা। মদীনা মুনাওয়ারা ও ইসলামী লশকরের মধ্যে অহরহ চিঠিপত্রের আদান-প্রদান চলতো। প্রত্যেকটি ঘটনার খবরাখবর অতিদ্রুত রাসূলের খলীফার নিকট পৌঁছে যেতো। আর এইভাবে সামান্য সামান্য ব্যাপারেও রাসূলের খলীফার তরফ থেকে দিক-নির্দেশনা পৌঁছাতে থাকতো।