hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩২৪

আহওয়ায বিজয় এবং হরমূযানের ইসলাম গ্রহণ

ইরানের প্রখ্যাত নেতা হরমুযান কাদিসিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে আহওয়ায প্রদেশের রাজধানী খুজিস্তানে গিয়ে পৌঁছেন এবং ঐ এলাকার শহরগুলোর উপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে সৈন্য সংগ্রহে মনোনিবেশ করেন। ধীরে ধীরে তিনি ঐ এলাকার উপর আপন রাজ্যের সীমা সম্প্রসারিত করতে থাকেন। কূফা ও বসরার সেনাছাউনি থেকে মুসলিম বাহিনী তার উপর হামলা চালায় এবং হরমুযান শোচনীয় ভাবে পরাজিত হন। শেষ পর্যন্ত আহওয়ায প্রদেশের উপর নিজের দখল অব্যাহত রাখার জন্য হরমুযান জিযিয়া প্রদানের শর্তে মুসলমানগণের সাথে সন্ধি করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং ‘সূকে আহ্ওয়ায’ নামক স্থানে মুসলমানগণের হাতে পরাজিত হয়ে ‘রাম হরমুয’ নামক স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেন। এবারও হরমুযান অনন্যোপায় হয়ে সন্ধির আবেদন জানান। মুসলমানগণ শেষ পর্যন্ত বাকী এলাকা হরমুযানের দখলে ছেড়ে দিয়ে জিযিয়া শর্তে তার সাথে সন্ধি করে। আহওয়ায বিজেতা হযরত হরকুম ইব্‌ন মুহায়র সা‘দী (রা) আহওয়ায পর্বতে তাঁবু স্থাপন করে আহওয়ায এলাকার ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরসমূহ পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ঐ সময়ে এ মর্মে সংবাদ আসে যে, পারস্য সম্রাট ইয়াযদেজিরদ একটি বিরাট বাহিনী গঠন করে মুসলমানগণের উপর আক্রমণ পরিচালনার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছেন।

এ সংবাদ পেয়ে হযরত ফারূকে আযম (রা) হযরত সা‘আদ ইব্‌ন আবূ ওয়াক্কাস (রা)-কে লিখেন : এ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বিভিন্ন দিকে ও বিভিন্ন পথে ইসলামী বাহিনী মোতায়েন কর। সে অনুযায়ী হযরত সা‘আদ (রা) সাবধানবশত একটি বাহিনী হরমুযানের মুকাবিলায় রাম হরমুযানেও মোতায়েন করেন। কেননা, হরমুযানও ইয়াযদেজিরদের নির্দেশ পালন ও তার সংকল্প বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন। হরমুযান তার বাহিনী নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মুকাবিলা করেন কিন্তু তাকে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। মুসলমানগণ রাম হরমুযান দখল করে নেয়। হরমুযান পরাজিত ও পর্যুদস্ত অবস্থায় তাশতর নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছেন এবং মুসলমানগণের বিরুদ্ধে পুনরায় সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তিনি তাশতর দুর্গ পুনর্নির্মাণ করেন, চতুর্দিকে পরিখা খনন করেন এবং টাওয়ারগুলো মজবুত ও সুদৃঢ় করেন। ইরানী বাহিনীর সৈন্যরাও তার কাছে সমবেত হতে থাকে। এ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সাথে সাথে হযরত ফারূকে আযম (রা) হযরত আবূ মূসা (রা)-কে বসরার সমগ্র বাহিনীর সেনাপতি করে পাঠান।

হযরত আবূ মূসা (রা) তাশতরের দিকে অগ্রসর হন এবং ‘হারকাত’ নামক স্থানের নিকটবর্তী হয়ে ইরানীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। হরমুযান কয়েকবারই মুসলমানগণের মুখোমুখি হন, কিন্তু টিকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাশতর দুর্গে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকেই মুসলিম বাহিনীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। অনেকগুলো সংঘর্ষের পর তাশতর মুসলমান দখলে আসে। হরমুযান তাশতর দুর্গে আশ্রয় নেন। দুর্গটির উপরও মুসলমানগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন সময় হরমুযান হযরত আবূ মূসা (রা)-এর কাছে এ মর্মে আবেদন পেশ করেন যে, তিনি নিজেই মুসলমানগণের হাতে নিজেকে সমর্পণ করবেন, তবে এ শর্তে যে, তাকে হযরত ফারূকে আযম (রা)-এর কাছে পাঠাতে হবে এবং তার ব্যাপারটি খলীফার সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিতে হবে। হযরত আবূ মূসা (রা) তার এ শর্ত মেনে নেন। হরমুযানকে হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা), হযরত আহনাফ ইব্‌ন কায়স (রা) প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্রতিনিধিদলের সাথে মদীনা শরীফে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মদীনা শরীফের নিকটবর্তী হয়ে হরমুযান তার মণিমুক্তা খচিত মুকুট এবং জাঁকজমক পূর্ণ পোশাক পরিধান করেন। হযরত ফারূকে আযম (রা) এতবড় একজন সর্দারকে যখন এভাবে বন্দী অবস্থায় দেখতে পান, তখন তিনি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করেন। তারপর তিনি হরমুযানকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি বহুবার তোমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ। এখন বলো, তোমার সাথে কিরূপ আচরণ করা হবে? এ সম্পর্কে তোমার কোন ওযর-আপত্তি থাকলেও অনায়াসে বলতে পার। হরমুযান বললেন, আমি আশংকা করছি, না জানি আমার ওযর-আপত্তির কথা না শুনেই আপনি আমাকে হত্যা করে ফেলেন। হযরত ফারূকে আযম (রা) বললেন, না, তুমি সে আশংকা করো না। তোমার ওযর-আপত্তি অবশ্যই শোনা হবে। তারপর হরমুযান পানি চাইলেন এবং পানির পাত্র হাতে নিয়ে বললেন, আমি আশংকা করছি, না জানি পানি পান করার অবস্থায়ই আপনি আমাকে হত্যা করে ফেলেন। হযরত ফারূকে আযম (রা) বললেন, তুমি মোটেই ভয় করো না। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি পানি পান না কর, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার কোন ক্ষতি করা হবে না। একথা শোনার সাথে সাথে হরমুযান হাত থেকে পাত্রটি রেখে দেন এবং বলেন, আমি পানি পান করবো না। আর এ শর্ত অনুযায়ী আপনি আমাকে হত্যাও করতে পারেন না। কেননা, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।