hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯৬

কুরায়শদের বিরোধিতা

ঈমান আনয়ন করে যারা মুসলমান হলেন, তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন যারা ক্রীতদাস। আর কিছু লোক এমনও ছিলেন যারা কবীলা বা গোত্রের বল বা আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা প্রচুর না থাকায় সমাজে অত্যন্ত দুর্বল বলে বিবেচিত হতেন। এমন লোকদেরকে ইসলামচ্যুত করার জন্যে বিরুদ্ধবাদীরা তাদেরকে দৈহিকভাবে নির্যাতন করতে শুরু করলো। যারা কোন কবীলাভুক্ত ছিলেন তাদেরকে নির্যাতন করলে তাঁদের আত্মীয়-স্বজন তাদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যেতে পারে এরূপ আশঙ্কায় তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনকেই ইসলাম গ্রহণকারী নিকটাত্মীয়দেরকে শাস্তি দিয়ে ও নির্যাতন চালিয়ে ধর্মচ্যুত করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলো। যাতে কেউ ইসলাম গ্রহণে সাহসী না হয় তজ্জন্য মুসলমানদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করার এবং তাদেরকে প্রকাশ্যে নিন্দাবাদ করার জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলো। এদিকে হযরত রাসূল (সাঃ)-ও ইসলামের প্রকাশ্য প্রচারকার্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। ওদিকে কুরায়শরাও পূর্ণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে বিরোধিতার জন্যে কোমর বাঁধলো। হযরত বিলাল (রা) ছিলেন উমাইয়া ইব্‌ন খালফের ক্রীতদাস। তার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পেরে উমাইয়া তাঁকে নানারূপ পীড়া দিতে থাকে। মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে বুকের উপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে রাখা হতো। বেত্রাঘাতে গোটা দেহ জর্জরিত করা হতো। ভুখা রাখা হতো। গলায় রশি বেঁধে দুষ্ট ছেলেদের হাতে তাকে তুলে দেয়া হতো। তারা তাকে মক্কার অলিতে-গলিতে, শহরে-বাইরে, পাহাড়-পর্বতে ও মরুপ্রান্তরে টেনে নিয়ে ফিরতো এবং বেদম মারপিট করতো। হযরত বিলাল (রা) এ সব নির্যাতনই সহ্য করে যেতেন আর মুখে ‘আহাদ’ ‘আহাদ উচ্চারণ করতেন।

হযরত আম্মার (রা) তার পিতা ইয়াসির এবং মাতা সুমাইয়ার সাথে একত্রে মুসলমান হন। আবূ জাহেল তাদেরকে নানারূপে ক্লেশ দিতো। জালিম আবূ জাহেল হযরত সুমাইয়া (রা)-কে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বর্শার আঘাতে শহীদ করে। হযরত যুবায়র (রা)-কে আবূ জাহেল এতই প্রহার করে যে, প্রহারের ফলে তিনি অন্ধ হয়ে যান। এমন গোলাম-বাঁদীর সংখ্যা প্রচুর যাদেরকে এত কঠোর ও অমানবিক নির্যাতন করা হয় যে, এগুলো কল্পনা করতেও শরীর শিউরে উঠে। কিন্তু ইসলাম এমনি এক শক্তি যে, ঐ নিষ্ঠুর নরপিশাচের এতরূপ নির্যাতন করেও কোন একটি মুসলমানকেও ইসলামচ্যুত করে মুরতাদ বানাতে সমর্থ হয়নি।

হযরত উসমান (রা) ছিলেন বনী উমাইয়া গোত্রের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে তাঁর চাচা রশি দিয়ে তাকে বেঁধে বেদম প্রহার করে এবং নানাভাবে দৈহিক নির্যাতন চালায়। হযরত যুবায়র ইব্‌ন আওআম (রা)-কে তাঁর চাচা চাটাইর উপর শুইয়ে দিয়ে তার নাকে ধোয়া দিতো। হযরত আবূ যর গিফারী (রা)-কে কুরআন পড়তে শুনে কুরায়শরা এরূপ প্রহার করে যে, তাঁর সংজ্ঞা লোপ পায় এবং তিনি ভূমিতে লুটিয়ে পড়েন। তারা তাঁকে প্রাণে বধ করতেই উদ্যত হয়েছিল। এমন সময় হযরত আব্বাস (রা) এই বলে তাদেরকে বাধা দেন যে, এ হচ্ছে বনী গিফার গোত্রের লোক। তোমাদের বাণিজ্য কাফেলা চলার পথেই এদের বাস। এরা তোমাদের নাকে দম এনে তবে ছাড়বে। অর্থাৎ বাণিজ্য কাফেলার পথ রুদ্ধ করে অর্থনৈতিকভাবে তোমাদেরকে অবরোধ করবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসঊদ (রা)-কেও অনুরূপভাবে কা‘বা প্রাঙ্গণে প্রহার করতে করতে তারা বেহুশ করে ফেলে। অনুরূপভাবে হযরত খাব্বাব ইব্‌ন আরাতকে তারা নানাভাবে নির্যাতন করে। একবার জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর তাকে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে এক ব্যক্তি তার বুকের উপর চেপে বসে যাতে তিনি পার্শ্ব পরিবর্তন করতে না পারেন। তার কোমরের চামড়া ও গোশত পুড়ে গিয়ে কা‘বাব হয়ে যায়। কোন কোন সাহাবাকে গরু বা উটের কাঁচা চামড়ার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে দিত। কাউকে কাউকে লোহার বর্ম পরিয়ে জ্বলন্ত আগুনে এবং জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর ফেলে দিতো।