hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩৮

মক্কায় কাফিরদের প্রতিশোধস্পৃহা

মক্কায় এ পরাজয়ের পর যে প্রতিক্রিয়া হয় তা হয় অতি সংগোপনে। নিহতদের উত্তরাধিকারীরা উচ্চৈঃস্বরে কোন বিলাপ করেনি। কেননা এ সংবাদে মুসলমানরা উল্লসিত হতো। সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া তার নিহত পিতা উমাইয়া ও সহোদর আলীর রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে উমায়র ইব্‌ন ওয়াহবকে মদীনায় গিয়ে গোপনে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করার জন্যে প্ররোচিত করে। উমায়র ইব্‌ন ওয়াহব বিষমাখা তলোয়ার নিয়ে মক্কা থেকে মদীনায় গিয়ে হাযির হলো। তাকে দেখে কেন যেন হযরত উমর (রা)-এর মনে সন্দেহ হলো। তিনি উমায়রের তলোয়ারের হাতল ধরে তাকে নিয়ে নবী করীম (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। হযরত নবী (সাঃ) বললেন, উমর! তুমি উমায়রকে ছেড়ে দাও! তারপর তিনি উমায়রকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন : বল তো, তুমি কেন এসেছিলে? জবাবে উমায়র বললো : আমার ছেলে আপনাদের হাতে বন্দী, তাকে মুক্ত করার জন্যে এসেছি। দয়া করে তাকে আপনি মুক্ত করে দিন! হযরত নবী করীম (সাঃ) বললেন : সত্যি কথা বলছো না কেন, আমাকে হত্যা করার জন্য সাফওয়ান তোমাকে প্ররোচনা দিয়ে পাঠায়নি? তিনি সাফওয়ান ও উমায়রের গোপন পরামর্শের খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে দিলেন। উমায়র তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন : আমি এক্ষুনি মুসলমান হচ্ছি এবং স্বীকার করছি যে, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল। কেননা, এ ব্যাপারটি সাফওয়ান ও আমি ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ঘুণাক্ষরেও কিছু জানা ছিলো না।

বদর যুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের দ্বারা মুসলমানদের সাহায্য করেন। ফেরেশতাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা স্বয়ং কুরায়শরা মক্কায় গিয়ে বর্ণনা করে। মদীনার কোন কোন মুশরিক যুদ্ধের দৃশ্য উপভোগ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশে পাহাড়ের উপর বসেছিল অথবা ঘটনাচক্রেই তারা সেসব পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিলো। তাদের বর্ণনা: আমরা ঠিক যুদ্ধের সময় আমাদের মাথার উপর দিয়ে একটি মেঘখণ্ড যুদ্ধের দিকে যেতে দেখলাম। সে মেঘখণ্ড যখন আমাদের অতি নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলো তখন আমরা তাতে ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনি শুনতে পাই। কেউ একজন তখন বলছিলো, দ্রুত অগ্রসর হও! বর্ণনাকারী বলেন, এ আওয়াজ শুনে আমরা এতই ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়লাম যে, ভয়ে আমার চাচাতো ভাই ঘটনাস্থলেই মারা গেলো।

বদর যুদ্ধশেষে ২২শে রমযান হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মদীনায় আসেন। এ রমযান মাসের শেষ দিকে সাদাকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয়। ঈদের নামাযদ্বয় এবং কুরবানীও এ বছরই ধার্য হয়। এ বছরই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মে কুলছুম (রা)-কে হযরত উসমান (রা)-এর সাথে শাদী দেন এবং তিনি ‘যিন্‌নূরায়ন’ বলে অভিহিত হন। এ বছরই বদর যুদ্ধের পরে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা হযরত ফাতিমা (রা)-এর শাদী হযরত আলী (রা)-এর সাথে সম্পাদন করেন।

মক্কার কাফিরদের মনে দ্রুত প্রতিহিংসার বহ্নি জ্বলে উঠলো। বদর যুদ্ধের ছ’মাস পর আবূ সুফিয়ান দুইশ’ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে যুদ্ধার্থে মক্কা থেকে বের হলো। এরা মদীনার নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছতেই হযরত নবী করীম (সাঃ) সংবাদ পেয়ে গেলেন। তিনিও মুসলমানদেরকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আবূ সুফিয়ান খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিয়ে পলায়ন করলো। সাথে সাথে শিকারের উদ্দেশ্যে সেখানে আগত দুই ব্যক্তিকে তারা হত্যাও করে যায়। ঐ নিহত দু’ ব্যক্তির একজন হলেন হযরত সাঈদ ইব্‌ন আমর আনসারী (রা) এবং অপরজন তার একজন চুক্তিবদ্ধ মিত্র। মুসলমানদের আগমন সংবাদ পেতেই কাফির বাহিনী পালিয়ে গেল। তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হতে সাহস পায়নি। পলায়নপর কাফির বাহিনী দ্রুত পলায়নের উদ্দেশ্যে ছাতুর বস্তাসমূহ ফেলে দিয়ে যায়। মুসলমানরা কিদর নামক স্থান পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং স্থানে স্থানে তারা ছাতুর বস্তা পান। হযরত নবী (সাঃ) সদলবলে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। আরবী ভাষায় ছাতুকে সাবীক বলা হয়ে থাকে। তাই এ যুদ্ধ পত্রটি সাবীক অভিযান নামে খ্যাত হয়। সাবীক অভিযানটি দ্বিতীয় হিজরীর যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দিকে পরিচালিত হয়। যিলহাজ্জ মাসের শেষ পর্যন্ত হযরত নবী করীম (সাঃ) মদীনায় অবস্থান করেন এবং আর কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা এ বছর ঘটেনি।