hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

ব্যক্তিতন্ত্র ও গণতন্ত্র

মানুষ যেমন সৃষ্টির সেরা এবং গোটা বিশ্বের সবকিছুর সেবা সে লাভ করছে, তেমনি এটাও তার স্বভাবজাত যে, কোন উচ্চতর শক্তির কাছে সে মাথা নত করে তারই দ্বারা সে পরিচালিত হয়। মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তিই তাকে আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী হওয়ার প্রেরণা যোগায় এবং সমস্ত বাতিল উপাস্যকে বর্জন করে একক লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। শয়তান যে ব্যাপারে মানুষকে সবচাইতে বেশি ধোঁকায় ফেলেছে তা হলো শাসক হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাবলীর কথা বিস্মৃত মানুষ উত্তরাধিকার ও বংশগত সম্পর্ককে এর একটি অপরিহার্য পূর্বশর্তরূপে মেনে নিয়েছে। ফলশ্রুতিতে, অযোগ্য লোকেরা কেবল পূর্ববর্তী রাজা-বাদশাহর সন্তান বা উত্তরাধিকারী হওয়ার ভিত্তিতে রাজা-বাদশাহ বনে গিয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিদেরকে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত করার সুযোগ লাভ করেছে। মানব জাতির এ ভুলের দরুন পৃথিবীতে বহু অনর্থের সৃষ্টি হয়েছে এবং এজন্যে মানব জাতিকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

কুরআনুল কারীম নাযিল হয়ে এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নবীরূপে আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীবাসীকে তাদের এ বিশ্বজোড়া বিভ্রান্তি ও পর্বততুল্য ভ্রান্তির অপনোদন করেছেন। এর সমস্ত মানবীয় গুণের অধিকারী নবী করীম (সাঃ) স্বয়ং রাজ্য পরিচালনা করে নবুওয়াত ও রিসালতের গুরুদায়িত্ব পালনের সাথে সাথে পার্থিব রাজ্য পরিচালনার প্রকৃষ্ট নমুনাও বিশ্ববাসীর সম্মুখে উপস্থাপিত করেছেন এবং বিশ্ববাসীকে বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, রাজ্যের শাসক কেমন হতে হয় এবং তার দায়িত্ব ও ইখতিয়ারের গণ্ডি কি? তার অব্যবহিত পরে তাঁর সাহচর্য ধন্য এবং তাঁরই হাতে শিক্ষা-দীক্ষা প্রাপ্ত, তাঁর হাতে গড়া সর্বোত্তম মানব শ্রেণী অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম তাঁর শিক্ষা অনুসারে সর্বোত্তম ব্যক্তিটি অর্থাৎ শাসক হওয়ার যোগ্যতম ব্যক্তিটিকে তাদের শাসকরূপে নির্বাচিত করেন। বাস্তব ক্ষেত্রে এই সর্বপ্রথম পৃথিবীর ইতিহাসে শয়তানের সেই ভোজবাজিটির অবসান ঘটলো যে, শাসক হওয়ার জন্যে অবশ্যই পূর্ববর্তী শাসকের উত্তরাধিকারী বা সন্তান হতে হবে। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর পর হযরত উমর ফারূক (রা)-এর নির্বাচনও যোগ্যতার ভিত্তিতেই হয় এবং তার পরে হযরত উছমান গনী (রা)-এর নির্বাচন যদিও বংশগত বা উত্তরাধিকারসূত্রে হয়নি, তবুও মুসলমানদের কোন কোন ব্যক্তি ও শ্রেণীর মনে এ ব্যাপারে কিছুটা অনীহার ভাব বিদ্যমান ছিল এবং উসমান (রা) তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও স্বগোত্রীয় লোকদেরকে বিভিন্ন ব্যাপারে প্রাধান্য দিয়ে রেখেছিলেন।১ তাই তার শাসনামল বিক্ষোভমুক্ত ছিল না। তাই বলা যায়, হুযূর (সাঃ) রাসূল হিসাবে যেভাবে দীর্ঘ তেইশ বছরকাল তার আপন জীবনকে মানব জাতির পথ প্রদর্শনের জন্য নিয়োজিত রেখেছিলেন, ঠিক তেমনি ১ম হিজরী থেকে ২৩ হিজরী পর্যন্ত তার রাজ্য শাসনের আদর্শও সুদীর্ঘ ২৩ বছরকাল বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। যেভাবে হুযূর (সাঃ)-এর জীবনের নবুওয়াতী জীবনের তেইশটি বছর মানবজাতির অনুকরণীয় আদর্শ, ঠিক তেমনি তার মাদানী জীবন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) এবং হযরত উমর ফারুক (রা)-এর খিলাফত কালব্যাপী তেইশটি বছর বিশ্বের রাজন্যবর্গের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ স্বরূপ।

────────────────১. সত্যিকারের ইতিহাস বিচারে এ বক্তব্য আংশিক সত্য মাত্র। যেমন, হযরত উসমান (রা) তার যেসব আত্মীয় ও স্বগোত্রীয়কে প্রাধান্য দিয়েছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে, তাদের অধিকাংশই তার খিলাফত আমলের পূর্ব থেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে অধিষ্ঠিত ছিলেন। গোত্রীয় জিহালত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই এসব প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছিল—অনুবাদক।

খিলাফতে রাশিদার পর মানবীয় দুর্বলতা এবং শয়তানী ভোজবাজি আবার উত্তরাধিকার সম্পর্কে শাসক হওয়ার জন্যে অপরিহার্য পূর্বশর্তের মর্যাদা দিয়ে দিল এবং আবার শাসক হওয়ার জন্যে যোগ্যতর লোকের স্থলে অযোগ্য পাত্ররাই পূর্ববর্তী শাসকের উত্তরাধিকারী হওয়ার ভিত্তিতে শাসক হওয়ার যোগ্যপাত্র বলে বিবেচিত হতে লাগলো। ফলে যোগ্য শাসকদের অযোগ্য উত্তরাধিকারীরাই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে লাগলো। এ অযোগ্য লোকদেরকে পদচ্যুত করতে প্রচুর মেধাক্ষয় এবং কষ্ট ও নির্যাতন স্বীকার করতে হতো। অবশেষে এসব নির্যাতনে উত্যক্ত হয়ে লোকজন সেই গণতন্ত্রের দ্বারস্থ হলো—যা আজকাল ফ্রান্স, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে দৃষ্ট হয়ে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে বংশগত উত্তরাধিকার ভিত্তিক রাজতন্ত্র যেমন মানবজাতির জন্যে অনিষ্টকর ছিল, তেমনি এসব গণতন্ত্রও মানব জাতির জন্যে উপাদেয় ও আশীর্বাদস্বরূপ হতে পারে না। মানব জাতির স্বভাবধর্মের সাথে পূর্ণ সঙ্গতিশীল এবং সর্বপ্রকারে উপাদেয় কেবল সেই রাজ্যশাসন পদ্ধতিই যা হিজরী শতকের প্রথম চতুর্থাংশ বিশ্ববাসীর সম্মুখে উপস্থাপিত করেছিল—যা গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মাঝামাঝি একটা ব্যবস্থা।