১
ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড
লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩০৬
বাবেল ও কূছী বিজয়
ইরানীরা কাদিসিয়া থেকে বাবেলের দিকে পালিয়ে যায় এবং সেখানেই অবস্থান নেয়। পরে কয়েকজন ইরানী সেনাপতি পলাতক সৈন্যদের একত্র করে পুনরায় মুকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। হযরত সা‘দ (রা) কাদিসিয়া যুদ্ধের পর সেখানে দু’মাস পর্যন্ত অবস্থান করেন। তিনি হযরত ফারূকে আযম (রা)-এর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করছিলেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি আপন পরিবার-পরিজনকে কাদিসিয়ায় রেখে স্বয়ং ইসলামী বাহিনীর সাথে মাদায়েনের দিকে যাত্রা করেন। তিনি হযরত যুহরা ইব্ন হাইওয়াকে অগ্রগামী বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করেন এবং তাকে পূর্বাহ্নেই মাদায়েনের দিকে পাঠিয়ে দেন। হযরত যুহরা (রা) শত্রুদেরকে মেরে তাড়িয়ে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকেন এবং বাবেলের সন্নিকটে গিয়ে পৌঁছেন। হযরত সা‘দ (রা)-ও তাঁর পুরো বাহিনী নিয়ে সেখানে হাযির হন। ইরানী বাহিনী যখন হযরত সাদ-এর আগমনের কথা জানতে পারে তখন তাদের কেউ কেউ বাবেল ত্যাগ করে মাদায়েনের দিকে, আবার কেউ কেউ হাওয়াযিন ও নিহাওয়ান্দের দিকে যাত্রা করে। যাবার সময় তারা রাস্তার সকল সেতু ধ্বংস করে দিয়ে যায়। ফলে মুসলমানদের জন্য দজলা ও তার শাখা নদীসমূহ অতিক্রম করার কোন পথ বাকী থাকেনি। ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে যে, ইরানীদের পলায়ন ও বিক্ষিপ্ত হওয়ার সংবাদ শুনে হযরত সা‘দ (রা) হযরত যুহরা (রা)-কে আগেই মাদায়েনের দিকে পাঠিয়ে দেন এবং নিজে প্রধান বাহিনী নিয়ে তাকে অনুসরণ করেন। হযরত যুহরা (রা) যখন কূছী নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন জানতে পারেন যে, সেখানে ইরানীদের বিখ্যাত সেনাপতি শাহরিয়ার তার মুকাবিলার জন্য তৈরী হয়ে আছেন। কূছী হচ্ছে সেই স্থান যেখানে নমরূদ হযরত ইবরাহীম (আ)-কে বন্দী করে রেখেছিল। শাহরিয়ার যখন জানতে পারলেন যে, হযরত যুহরা (রা) তার সন্নিকটে পৌঁছে গেছেন, তখন তিনি ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে নিজ বাহিনীকে মুসলমানদের মুখোমুখি করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান। তারপর স্বয়ং আগে বেড়ে উচ্চেঃস্বরে ঘোষণা করেন : তোমাদের বাহিনীর মধ্যে যে বীরশ্রেষ্ঠ সে আমার মুকাবিলায় আসুক। হযরত যুহরা (রা) উত্তর দেনঃ আমি নিজে তোমার মুকাবিলার জন্য তৈরী ছিলাম, কিন্তু এখন তোমার এ অসার লম্ফঝম্প দেখে আমি নিজে না এসে এ বাহিনীর একজন নগণ্য গোলামকে পাঠালাম। সে-ই তোমার সব জারিজুরি খতম করে দেবে। এ বলে তিনি বনূ তামীম গোত্রের গোলাম হযরত নায়িল ইব্ন জু‘শুম আ‘রাজ (রা)-কে ইঙ্গিত প্রদান করেন। সঙ্গে সঙ্গে হযরত নায়িল (রা) ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে শাহরিয়ারের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ান। শাহরিয়ার হযরত নায়িল (রা)-কে খুবই শীর্ণকায় দেখে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে আসেন এবং তার ঘাড় ধরে এমন জোরে হেচকা টান দেন যে, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এবার শাহরিয়ার তার বুকের উপর চড়ে বসেন। ঘটনাচক্রে শাহরিয়ারের অনামিকা হযরত নায়িলের মুখের নাগালের মধ্যে এসে যায় এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা এমন জোরে কামড়ে ধরেন যে, শাহরিয়ার যন্ত্রণায় একেবারে অস্থির হয়ে উঠে। আর সেই সুযোগে হযরত নায়িল ঝট করে তার বুকের উপর চড়ে বসেন এবং খঞ্জর বের করে তার পেট একেবারে বিদীর্ণ করে দেন। শাহরিয়ার নিহত হওয়ার সাথে সাথে ইরানী বাহিনী প্রাণ নিয়ে পলায়ন করে। শাহরিয়ারের বর্ম, মূল্যবান পোশাক, সোনার মুকুট, অস্ত্রশস্ত্র সব কিছুই হযরত নায়িলের ভাগে পড়ে। হযরত সা‘দ (রা) কূছী পৌঁছে শাহরিয়ার হত্যা এবং তার বাহিনীর পলায়ন সংবাদ পান। তিনি সেই স্থানটি পরিদর্শন করেন যেখানে হযরত ইবরাহীম (আ)-কে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। তারপর তিনি হযরত নায়িল (রা)-কে নির্দেশ দেন যেন সে শাহরিয়ারের পোশাক পরে এবং তার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তার সামনে আসে। নায়িল (রা) তাই করেন এবং মুসলিম বাহিনী এ দৃশ্য দেখে মহান আল্লাহর প্রশংসায় মেতে উঠে।