১
ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড
লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪৪
বংশগরিমা
এমতাবস্থায় আরবদের মধ্যে স্বভাবতই দু’টি বস্তুর প্রসার ঘটে। দীর্ঘ অবসর ও রাতের উন্মুক্ত আকাশের নীচে কর্মহীন দীর্ঘ আকাশ তাদের মধ্যে কাব্যচর্চার উন্মেষ ঘটায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধিকার রক্ষার অব্যাহত অনুশীলন ও সহিষ্ণুতার অভ্যাস তাদেরকে যুদ্ধবাজ ও কথায় কথায় শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলেছিল। পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহকে জিইয়ে রাখার জন্যে তারা আত্মপ্রশংসা ও বংশগৌরব প্রকাশের দিকেও অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ে। অহমিকা প্রকাশ ও নিজের মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্যে বীরত্ব ও বদান্যতা ছিল দু’টি আকর্ষণীয় ব্যাপার। নিষ্ক্রিয়তা ও কাব্যিকতা তাদেরকে প্রেম নিবেদনে এবং তাদের সচ্ছল লোকদেরকে মদ্যপানে উদ্বুদ্ধ করে। বীরত্ব ও বদান্যতা তাদেরকে প্রথম শ্রেণীর অতিথিপরায়ণ এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অভ্যস্ত করে সকলের শ্রদ্ধাভাজন করে তোলে। জুয়া, তীরন্দাজী, মুশায়েরা (কবিসভা), বংশমর্যাদার অহমিকা প্রকাশ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রভৃতি ছিলো তাদের চিত্তবিনোদনের মাধ্যম। মোদ্দাকথা, আরবের নিঃসর্গ ও আবহাওয়া মনের অজান্তেই তাদের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত চরিত্র গড়ে তুলেছিলো। আরবে বায়িদার প্রতি হযরত হুদ আলায়হিস সালাম, হযরত সালিহ আলায়হিস সালাম প্রমুখ আম্বিয়ায়ে কিরাম প্রেরিত হন। এসব আম্বিয়ায়ে কিরামের প্রতি আনুগত্য না করায় সেই পর্যায়ের জনগোষ্ঠী উজাড় ও ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থাৎ কাহ্তানী আরবদের প্রতিও কতিপয় হিদায়াতকারী প্রেরিত হন। কিন্তু আরববাসীরা খুব কমই তাঁদের কথায় কর্ণপাত করেছে। ফলে পাপাচার, অবাধ্যতার জন্যে বারবার তাদের উপর ধ্বংস নেমে এসেছে। সেদেশের অধিবাসীদের পাপাচার ও বশ্যতাহীন প্রকৃতি তাদেরকে আম্বিয়ায়ে কিরামের শিক্ষা থেকে অনুগৃহীত হতে দেয়নি। হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতিও দেশের খুব কম সংখ্যক লোকই ঈমান এনেছিলো। তাদের বংশ নিয়ে অহমিকা এবং আত্ম-গৌরবের অভ্যাস ধর্মের ব্যাপারও তাদেরকে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রশস্তির দিকে ঠেলে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের নামের প্রতিমাপূজায় অভ্যস্ত করে তুলেছিল। যখন কাহ্তানী কবীলাসমূহের প্রতিপত্তি লোপ পাচ্ছিল এবং বনী ইসমাঈল বা আদনানীদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে তখন খুযায়া গোত্রের মক্কা আক্রমণ এবং জুরহাম গোত্রের বিপর্যয় আদনানী গোত্রসমূহকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয়ের সন্ধানে ছড়িয়ে দিয়ে হিজাযে বনী ইসরাঈলদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত করে। ফলশ্রুতিতে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ও প্রদেশে আদনানী ও কাহ্তানী কবীলাসমূহকে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ করে। এভাবে গোটা আরব উপদ্বীপে ছোট ছোট গোত্রীয় রাজ্য ছাড়া কোন উল্লেখযোগ্য রাজ্য আর অবশিষ্ট থাকলো না। যদিও আরবের বড় বড় রাজ্যও অরাজকতামুক্ত ছিল না এবং কোন আরব শাসকেরই প্রজাদের উপর তেমন শক্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল না যা পারস্যের কোন সাধারণ সামন্তরাজের বা রাজকর্মচারীর পারসিক প্রজাদের উপর নিয়ন্ত্রণের সাথে তুল্য ছিল। তখন ঐ অরাজকতা এবং কবীলাদের বল্গাহীন আযাদীর ঐ যুগে আরবদেশে সামাজিক অনাচার ও চারিত্রিক ব্যাধির দ্রুত প্রসার ঘটে। আরব দেশে ইসলামের অভ্যুদয় না ঘটা পর্যন্ত চারিত্রিক ব্যাধি ও অসামাজিক কার্যকলাপের প্রসার লাভ অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে।
আরববাসীদের বেশীর ভাগ লোকই যাযাবর জীবন-যাপন করতো এবং তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকই শহরে জনপদে স্থায়ীভাবে বসবাস করতো। আরববাসীরা তাদের বংশপঞ্জি অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে মুখস্থ ও সংরক্ষণ করতো। পিতৃপুরুষের নামধাম ও কীর্তি তারা গর্বসহকারে প্রকাশ করতো এবং একেই তারা যুদ্ধ-বিগ্রহে বীরত্ব প্রদর্শন ও উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমরূপে ব্যবহার করতো। দেশের আবহাওয়ার প্রভাবেই হোক বা বংশপঞ্জি মুখস্থ রাখার আগ্রহেই হোক আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। কয়েক শ’ পংক্তির কবিতা তারা দু’ একবার শুনেই অনায়াসে মুখস্থ বলে দিতে পারতো। কাব্যচর্চা তাদের ভাষাকে এমনি উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, অত্যন্ত সঙ্গতভাবেই তারা অনারবদেরকে আজমী বা বোবা বলে অভিহিত করতো। কোন গোত্রের কেউ যদি অপর গোত্রের হাতে নিহত হত তার স্বগোত্রীয়ের কারো রক্তের বদলা নিতে না পারতো, তাহলে তার অস্থিরতার অবধি থাকতো না। হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে নির্বিকারভাবে বসে থাকা তাদের নিকট ছিল রীতিমত অপমানজনক ব্যাপার। খানা কা‘বার সাহায্য করা এবং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয় থাকা তাদের সমাজে একটি বড় গুণ বলে গণ্য হতো। কাপুরুষতা ও কৃপণতাকে তারা সর্বাধিক ঘৃণা করতো।
আরববাসীদের বেশীর ভাগ লোকই যাযাবর জীবন-যাপন করতো এবং তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকই শহরে জনপদে স্থায়ীভাবে বসবাস করতো। আরববাসীরা তাদের বংশপঞ্জি অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে মুখস্থ ও সংরক্ষণ করতো। পিতৃপুরুষের নামধাম ও কীর্তি তারা গর্বসহকারে প্রকাশ করতো এবং একেই তারা যুদ্ধ-বিগ্রহে বীরত্ব প্রদর্শন ও উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমরূপে ব্যবহার করতো। দেশের আবহাওয়ার প্রভাবেই হোক বা বংশপঞ্জি মুখস্থ রাখার আগ্রহেই হোক আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। কয়েক শ’ পংক্তির কবিতা তারা দু’ একবার শুনেই অনায়াসে মুখস্থ বলে দিতে পারতো। কাব্যচর্চা তাদের ভাষাকে এমনি উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, অত্যন্ত সঙ্গতভাবেই তারা অনারবদেরকে আজমী বা বোবা বলে অভিহিত করতো। কোন গোত্রের কেউ যদি অপর গোত্রের হাতে নিহত হত তার স্বগোত্রীয়ের কারো রক্তের বদলা নিতে না পারতো, তাহলে তার অস্থিরতার অবধি থাকতো না। হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে নির্বিকারভাবে বসে থাকা তাদের নিকট ছিল রীতিমত অপমানজনক ব্যাপার। খানা কা‘বার সাহায্য করা এবং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয় থাকা তাদের সমাজে একটি বড় গুণ বলে গণ্য হতো। কাপুরুষতা ও কৃপণতাকে তারা সর্বাধিক ঘৃণা করতো।