১
ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড
লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৬৪
গাযওয়ায়ে যাতুস-সালাসিল বা জিঞ্জির পরা যুদ্ধ
হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) উবলা নামক স্থানে ইসলামী লশকরের হাযিরা নিলেন। মোট আঠার হাজার লোক ছিল। তাঁর সামনে ছিল ইরাকের সেই ইরানী প্রদেশ—যার নাম ছিল হুদায়র। ইরানের রাজ-দরবার থেকে ঐ প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত ছিল হরমুয নামক জনৈক বাহাদুর ও যুদ্ধবাজ সরদার। এই হরমুযেরই ভীতি গোটা আরব, ইরাক ও হিন্দুস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কেননা, সে যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হিন্দুস্তানের উপকূলেও আক্রমণ চালাতো। হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) বিবাদ মিটানোর শেষ চেষ্টা হিসাবে হরমুযকে একটি চিঠি লিখে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিলেন। হরমুয এই চিঠি পাওয়া মাত্রই তৎক্ষণাৎ ইরানের রাজদরবারকে তা অবহিত করলো এবং স্বয়ং সৈন্য সমাবেশ করে হযরত খালিদ (রা)-এর মুকাবিলায় অগ্রসর হলো। ওদিকে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) তার লশকর তিন ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগের নেতৃত্ব সমর্পণ করলেন হযরত আদী ইব্ন হাতিম (রা)-কে। দ্বিতীয় ভাগ সমর্পণ করলেন হযরত কা‘কা‘ ইব্ন আমর (রা)-কে এবং তৃতীয় ভাগকে স্বীয় অধীনে রেখে তিন নেতাই ডান-বামে এক দিনের দূরত্ব বজায় রেখে হুদায়র অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। ইরানী বাহিনীর কাছে পৌঁছে তিন ইসলামী নেতাই একত্রিত হলেন। ইরানীদের বিপরীত দিকে ইসলামী লশকর তাঁবু স্থাপন করলো। প্রথমে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) ময়দানে উপস্থিত হলেন এবং হরমুযকে মুকাবিলার জন্য আহবান করলেন। হরমুয হযরত খালিদ (রা)-এর ডাক শুনে ময়দানে এলো। দুই নেতাই ঘোড়া থেকে নিচে নেমে পদাতিক হলেন। প্রথমে হযরত খালিদ (রা) আঘাত হানলেন। হরমুয চকিতে পিছে হটে এবং রণকৌশল পরিবর্তন করে আঘাত থেকে বাঁচলো। তারপর অতি ক্ষিপ্রতার সাথে হযরত খালিদের উপর আঘাত করলো। হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) হঠাৎ বসে পড়ে সামনে কুঁচকে গিয়ে হরমুযের কবজি ধরে তলোয়ার ছিনিয়ে নিলেন। হরমুয তলোয়ার ছিনতাই হতেই হযরত খালিদকে লেপ্টে ধরলো এবং কুস্তি শুরু হলো। হযরত খালিদ (রা) হরমুযের কোমর ধরে উপরে উঠালেন এবং যমীনের উপর এমন জোরে আছাড় মারলেন যে সে আর নড়চড় করতে পারলো না। খালিদ হরমুযের বুকের উপর উঠে বসলেন এবং শির কর্তন করে ছুঁড়ে মারলেন। ইরানীদের একটি সেনাদল তাদের সেনাপতিকে পরাস্ত হতে দেখে তার সাহায্যার্থে আক্রমণ করলো। এদিকে কা‘কা‘ ইব্ন আমর (রা) সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের বাধা দিলেন। এরপর উভয় বাহিনী সামনে বাড়লো। ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানী বাহিনী ময়দান ছেড়ে পালালো। বহু হতাহত ও বন্দী হলো। হরমুযের পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্র হযরত খালিদ (রা) হস্তগত করলেন। হরমুয ছিল ইরানী রাজদরবারের এমন একজন সরদার, যার মাথায় সর্বদা মুকুট পরিহিত থাকতো। তার মুকুটের মূল্য ছিল এক লাখ দীনার যা হযরত খালিদ (রা)-এর হস্তগত হয়। এই যুদ্ধে ইরানী বাহিনীর একটি অংশ তাদের পায়ে জিঞ্জির বেঁধে নিয়েছিল, যাতে আরবদের মুকাবিলায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতে না পারে। কিন্তু তারপরও তাদের জিঞ্জির ভেঙ্গে পালাতে হলো। এই জিঞ্জিরের কারণেই এই যুদ্ধ ‘জঙ্গে যাতিস্-সালাসিল’ (জিঞ্জির যুদ্ধ) নামে পরিচিত।
হযরত মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা)-কে খালিদ ইব্ন ওয়ালিদ (রা) ইরানীদের পশ্চাদ্ধাবনে প্রেরণ করলেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে হিসনুল মারাআত حصن الرأة অবরোধ করেন এবং এই দুর্গটি জয় করেন। সেখানকার শাসনকর্তা নিহত হলো। তার স্ত্রী মুসলমান হলো এবং হযরত মুছান্না (রা)-কে বিয়ে করলো।
হযরত মুছান্না ইব্ন হারিছা (রা)-কে খালিদ ইব্ন ওয়ালিদ (রা) ইরানীদের পশ্চাদ্ধাবনে প্রেরণ করলেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে হিসনুল মারাআত حصن الرأة অবরোধ করেন এবং এই দুর্গটি জয় করেন। সেখানকার শাসনকর্তা নিহত হলো। তার স্ত্রী মুসলমান হলো এবং হযরত মুছান্না (রা)-কে বিয়ে করলো।