hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৩৩

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

এরপর একের পর এক চুক্তির সবগুলো ধাপ অতিক্রান্ত হয় এবং ইমাম হাসান (রা) সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণীও পূর্ণ হয় যাতে তিনি বলেছিলেন : “আর এ পুত্র (নাতি) হচ্ছে একজন নেতা। আল্লাহ তা‘আলা তার মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করাবেন। ইমাম হাসান (রা) তাঁর ভাষণ শেষে যখন মিম্বর থেকে নামেন তখন আমীরে মুআবিয়া অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তাকে সম্বোধন করে বলেন :

“আবু মুহাম্মদ! আপনি আজ এমন বাহাদুরী ও বীরত্ব দেখিয়েছেন যা আজ পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারে নি।

হযরত আলী (রা)-এর শাহাদতের ছয় মাস পর হিজরী ৪১ সনে এই সন্ধি সম্পাদিত হয়। তাই হিজরী ৪১ সনকে ‘আমূল জামাআত’ বা ‘সম্মিলনী বছর’ বলা হয়।

চুক্তি সম্পাদনের পর মুআবিয়া (রা) কূফা থেকে দামিশকের দিকে যাত্রা করেন। এরপর যতদিন পর্যন্ত হাসান (রা) জীবিত ছিলেন, মুআবিয়া তাঁর সাথে অত্যন্ত সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেন এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী তাঁর কাছে সর্বদা অর্থ প্রেরণ করতে থাকেন। মুআবিয়া (রা) কূফা থেকে চলে যাবার পর কূফাবাসীরা আপোসে বলাবলি করতে শুরু করল যে, আহওয়ায প্রদেশের খারাজ হচ্ছে আমাদেরই প্রাপ্য মালে গনীমত। আমরা এ থেকে হাসান (রা)-কে কিছুই নিতে দেব না। একথা শুনে তিনি কূফাবাসীদের একত্রিত করেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে নিম্নোক্ত ভাষণ দেন।

হে ইরাকবাসী! আমি বার বার তোমাদের ক্ষমা করেছি। তোমরা আমার পিতাকে শহীদ করেছ, আমার সহায়-সম্পদ লুট করেছ এবং আমাকে বর্শা মেরে আহত করেছ। তোমরা দুই শ্রেণীর নিহত ব্যক্তির কথা স্মরণ রেখেছো, প্রথমত যারা সিফফীন যুদ্ধে নিহত হয়েছে এবং দ্বিতীয়ত যারা নাহরাওয়ানে নিহত হয়েছে। এখন তোমরা আমার কাছে ঐ নিহতদের বদলা দাবী করছ। আমীরে মুআবিয়া তোমাদের সাথে যে কাজটি (চুক্তি) করেছেন তাতে তোমাদের কোন সম্মান নিহিত নেই এবং ন্যায়বিচারও তাই। অতএব তোমরা যদি মৃত্যুর জন্য রাযী থাক আমি ঐ চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলব এবং তীক্ষ্ণধার তরবারির মাধ্যমেই এর একটা ফায়সালা তলব করব। আর যদি তোমরা তোমাদের জীবনকে ভালবাস তাহলে অতঃপর আমি এই চুক্তির উপর কায়েম থাকব।

এই ভাষণ শোনার সাথে সাথে চতুর্দিক থেকে আওয়াজ উঠল, আপনি চুক্তির উপর কায়েম থাকুন, চুক্তির উপর কায়েম থাকুন। আসল কথা হল, ইমাম হাসান (রা) কূফাবাসীদের ভীরুতা ও নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। তাই তিনি তাদেরকে হুমকি দিয়েই সরল পথে নিয়ে আসতে চাচ্ছিলেন এবং এটাকে সমীচীন মনে করেছিলেন। যাহোক, এখন থেকে আমীরে মুআবিয়া সর্বসম্মতিক্রমেই খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হন। হযরত সা‘দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) যিনি রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে শুধু উট বকরী চরাতেন এবং নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন—তিনিও মুআবিয়া (রা)-এর হাতে বায়‘আত করেন। মোটকথা, এমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি আর অবশিষ্ট ছিলেন না, যিনি সঙ্গে সঙ্গে অথবা কিছুদিন ভাবনা-চিন্তার পর আমীরে মুআবিয়াকে খলীফা স্বীকার করে তার হাতে বায়‘আত করেন নি। চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর ইমাম হাসান (রা) কিছুদিন কূফায় অবস্থান করেন। এরপর কূফা পরিত্যাগ করে নিজের সঙ্গী-সাথী ও ভক্ত-অনুরক্তসহ মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। কূফাবাসীরা কিছুদূর পর্যন্ত তাঁকে এগিয়ে দেয়। মদীনা আসার পর তিনি আর কখনো অন্য কোথাও বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নি।