hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪২০

মিসরের অবস্থা

ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, সিফফীন যুদ্ধ চলাকালে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর মিসরের গভর্নর ছিলেন এবং ঐ যুদ্ধে আলী (রা)-এর পক্ষে বা মুআবিয়া (রা)-এর বিপক্ষে কোন ভূমিকা পালন করতে পারেন নি। কেননা তিনি তখন উসমান-ভক্তদের সাথে আভ্যন্তরীণ বিবাদে লিপ্ত ছিলেন। তথাকথিত উসমান-ভক্তরা মুআবিয়া ইব্‌ন খাদীজকে তাদের নেতা মনোনীত করে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকরের সাথে যথারীতি যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল। তারা কয়েকটি যুদ্ধে বিজয় লাভও করেছিল। সিফফীন যুদ্ধের পর আলী (রা) প্রথমে মালিক আশতারকে জাযীরার শাসক নিয়োগ করে পাঠান, কিন্তু কয়েক দিন পর পুনরায় তাকে মিসরের গভর্নর পদে নিয়োগ করেন। মুহাম্মদ যখন এ সংবাদ পান যে, মালিক আশতার মিসরের শাসক হয়ে আসছেন তখন তিনি দুঃখিত হন। অনুরূপভাবে মুআবিয়াও এই সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। কেননা তিনি মালিক আশতারকে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসাবেই জানতেন। তিনি সম্যক বুঝতে পেরেছিলেন যে, মালিক আশতার মিসরের ক্ষমতায় একবার বসে গেলে অবস্থা তার (মুআবিয়া) জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে মালিক আশতার মিসরে পৌঁছার পূর্বেই পথিমধ্যে ইনতিকাল করেন। ফলে মুহাম্মদই যথারীতি মিসরের শাসক থেকে যান। মালিক আশতারের মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে আলী (রা) মুহাম্মদের কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন। তাতে তিনি লিখেন, আমি মালিক আশতারকে মিসরের গভর্নর পদে এজন্য নিয়োগ করিনি যে, আমি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট, বরং সে অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে এমন কিছু রাজনৈতিক বিষয়ের মীমাংসা করতে পারত যা মিসর সরকারের জন্য ছিল খুবই প্রয়োজনীয়। তিনি যখন পথিমধ্যেই ইনতিকাল করেছেন তখন তুমিই মিসর প্রশাসনের জন্য শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। তোমার উচিত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে শত্রুদের মুকাবিলা করা। ঐ পত্রের উত্তরে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর লিখেন, আমি আপনার একান্ত অনুগত এবং আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। মধ্যস্থতাকারী হাকিমদের ফায়সালা ঘোষণার পূর্বেই এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল। যখন আযরাজ নামক স্থানে শালিসদ্বয়ের ফায়সালা ঘোষিত হল তখন সিরিয়াবাসীরা আমীরে মুআবিয়াকে খলীফা মেনে নিয়ে তার হাতে বায়‘আত করে। ফলে তার শক্তি ও প্রতিপত্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। উপরন্তু তিনি মুআবিয়া ইব্‌ন খাদীজের কাছে, যিনি মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকরের সাথে যুদ্ধরত ছিলেন, চিঠিপত্র লিখে তাকে তার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে থাকেন। তখন ইব্‌ন খাদীজ মুআবিয়ার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনিও মনে মনে তাই কামনা করছিলেন। তিনি অবিলম্বে আমর ইব্‌ন ‘আসকে ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে মিসরের দিকে প্রেরণ করেন। সেই সাথে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকরের নামে তিনি একটি চিঠিও লিখে দেন। আমর (রা) মিসরের সন্নিকটে পৌঁছে নিজের একটি চিঠির সাথে মুআবিয়া (রা)-এর চিঠিটিও মুহাম্মদের কাছে প্রেরণ করেন। মুহাম্মদ উভয় পত্রই আলী (রা)-এর কাছে কূফায় পাঠিয়ে দেন। আলী (রা) জনসাধারণকে একত্রিত করে তাদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেন। মাত্র দু’হাজার লোক মিসর অভিযানের জন্য তৈরি হয়। অগত্যা তিনি তাদেরকেই মালিক ইব্‌ন কা‘বের নেতৃত্বে মিসরের দিকে প্রেরণ করেন। ওদিকে মুহাম্মদ দু’হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী কিনানা বিশরির নেতৃত্বে আমর ইবনুল আসের মুকাবিলায় প্রেরণ করেছিলেন। সিরীয়দের মুকাবিলা করতে গিয়ে কিনানা নিহত হন, তার কিছু সঙ্গী মারা যায় এবং কিছু এদিক-ওদিক পলায়ন করে।

এই পরাজয়ের সংবাদ শুনে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার সংকল্প নেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গীরা সিরীয়দের সম্পর্কে এতই ভীত হয়ে পড়ে যে, যুদ্ধের পূর্বেই তারা তার সঙ্গ ছেড়ে চলে যায়। মুহাম্মদ তখন নিজেকে একেবারে একাকী পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে জাবালা ইব্‌ন মাসরূকের ঘরে আশ্রয় নেন। তখন সিরীয় বাহিনী এবং মুআবিয়া ইব্‌ন খাদীজের সঙ্গীরা জাবালার ‘ঘর’ চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে।

মুহাম্মদ জীবনের আশা থেকে নিরাশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করতে করতে বন্দী হন। মুআবিয়া ইব্‌ন খাদীজ তাঁকে হত্যা করে এবং তার লাশ একটি মৃত ঘোড়ার চামড়ার মধ্যে ঢুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। আলী (রা)-এর গোয়েন্দা আবদুর রহমান ইব্‌ন শাবাত ফাযারী সিরিয়া থেকে ফিরে এসে তাকে উপরোক্ত ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে। তিনি তখনই মালিক ইব্‌ন কা‘বকে ফেরত আনার জন্য লোক প্রেরণ করেন। ওদিকে মালিক ইব্‌ন কা‘ব কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর পথিমধ্যে হাজ্জাজ ইব্‌ন আরাফা আনসারীর সাথে তার দেখা হয়। হাজ্জাজ মিসর থেকে আসছিলেন। তিনি মুহাম্মদের মৃত্যু এবং আমর ইবনুল ‘আস কর্তৃক মিসর দখলের কথা মালিক কা‘বকে বলেন। ইতিমধ্যে আলী (রা) কূফাবাসীদের একত্রিত করে একটি বক্তৃতা দেন। তিনি তাদেরকে দোষারোপ করে বলেন, তোমাদেরই অকর্মণ্যতা ও নিস্পৃহতার কারণে মিসর দেশটি আমার হাতছাড়া হয়ে গেল। কিন্তু এই বক্তৃতা শুনেও কূফাবাসীরা চুপ থাকে। আলী (রা) শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মিসর ও সিরিয়ার চিন্তা ছেড়ে দেন। মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর হিজরী ৩৮ সনে মিসরে নিহত হন।