hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪০৮

সিফ্‌ফীন যুদ্ধের সূচনা

আপোস মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সাথে সাথে উভয় পক্ষই যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে। কিন্তু যেহেতু উভয় পক্ষই ছিল মুসলমান, সর্বোপরি তারা ছিল একে অন্যের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু, তাই কারো অন্তরেই যুদ্ধ করার সেরূপ আগ্রহ বা প্রেরণা ছিল না, যেরূপ কাফিরদের বেলায় হয়ে থাকে। সাধারণভাবে লোকেরা চাচ্ছিলো যেন যুদ্ধ না বাঁধে এবং যে কোনভাবে আপোস-মীমাংসার পথ বেরিয়ে উভয় পক্ষ থেকে একজন করে লোক যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে আসত এবং পরস্পরের সাথে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হত আর বাকীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখত। কিছুদিন পর্যন্ত প্রতিদিনই এ ধরনের যুদ্ধ চলতে থাকে। এরপর যুদ্ধের ক্ষেত্র কিছুটা সম্প্রসারিত হয়। উভয় পক্ষের এক একজন অধিনায়ক নিজ নিজ পক্ষ থেকে সীমিত সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে আসত এবং উভয় পক্ষের এই দুই ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকত। আর বাকী সৈন্যরা নিজ নিজ জায়গায় নীরবে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখত। একমাস পর্যন্ত এ ধরনের মুকাবিলা চলতে থাকে। অন্য কথায় বলতে গেলে একমাস পর্যন্ত উভয় বাহিনী তাদের ভাবী রক্তাক্ত যুদ্ধের জন্য পরস্পরের মধ্যে মহড়া দিতে থাকে। এক মাসের এই বিচ্ছিন্ন যুদ্ধকে সিফফীন যুদ্ধের প্রথম ভাগ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। যিলহাজ্জ মাস শেষ হয়ে মুহাররম মাস আরম্ভ হলে (১লা মুহাররম ৩৭ হিজরী) উভয় পক্ষই এক মাসের জন্য সম্পূর্ণরূপে যুদ্ধ বন্ধ রাখে। এই একমাস উভয় পক্ষের সৈন্যরা একেবারে নীরব থাকে এবং এই অবকাশে পুনরায় আপোস-মীমাংসার কথাবার্তা চলতে থাকে। এখানে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, মুহাররমের এই এক মাস পরস্পরের উপর কোনরূপ আঘাত না করে উভয় বাহিনীকে নীরবে নিজ নিজ তাঁবুতে অবস্থান করা একথারই স্পষ্ট প্রমাণ যে, উভয় বাহিনীই মনে করত, যুদ্ধের চেয়ে আপোস-মীমাংসাই ভাল এবং মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যকার যুদ্ধ মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। যখন সকল যোদ্ধার মধ্যেই এই মনোবৃত্তির সৃষ্টি হয় তখন তাদের অধিনায়করাও কোন না কোনভাবে একটা আপোস চুক্তিতে উপনীত হতে বাধ্য হন। কিন্তু এই শান্তি ও নীরবতার দিনগুলোতে সাবাঈ দল, যারা ছদ্মবেশে হযরত আলী (রা)-এর বাহিনীতে অবস্থান করছিল এবং যাদের পৃথক কোন পরিচয় ছিল না, অশান্তি সৃষ্টির ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর থাকে। উভয় পক্ষের মধ্যে যাতে সহানুভূতি ও ভালবাসার সৃষ্টি না হয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষের সৃষ্টি হয় সেজন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আর উভয় বাহিনীর অধিনায়কদের অবস্থান ছিল এই যে, আলী (রা)-এর পক্ষে তো খিলাফত ত্যাগ করা কোনমতেই সম্ভব ছিল না। আবার এই মুহূর্তেই হযরত উসমান (রা)-এর হত্যাকারী এবং বিদ্রোহীদের শাস্তি প্রদান করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেননা মালিক আশতারের মতো প্রতাপশালী সেনাপতি, মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ বকর (রা)-এর মত গভর্নর ও আম্মার ইব্‌ন ইয়াসিরের মত সম্মানিত সাহাবীকে শাস্তি প্রদান এবং সমগ্র কূফা ও মিসরীয় বাহিনীকে শত্রুতে পরিণত করা মোটেই সহজ ব্যাপার ছিল না। তা ছাড়া যে অবস্থায় ঐ হত্যাকাণ্ড ঘটে তাতে হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদেরকে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করাও সম্ভব ছিল না। সর্বোপরি আলী (রা) আমীরে মুআবিয়ার মুকাবিলায় খিলাফতের পদের জন্য সব দিক দিয়েই যে অধিক যোগ্য ছিলেন তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না।

অপর দিকে আমীরে মুআবিয়া মক্কার রইস এবং উহুদ ও আহযাবের বিরাট যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আবূ সুফিয়ানের পুত্র হওয়ার কারণে আরবের আমীর বলে মনে করতেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সহধর্মিণী উম্মে হাবীবা (রা)-এর ভাই এবং ওয়াহী লেখক। উসমানের উত্তরাধিকারী হওয়ার দিক দিয়ে উসমান হত্যার কিসাস দাবী করা তিনি নিজের একটি পবিত্র অধিকার জ্ঞান করতেন। এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের হোতাদের খুঁজে বের করা কঠিন বলে কারো উপর থেকে কিসাস গ্রহণ না করা, তাঁর মতে, একটি সাক্ষাত জালিয়াতি ছাড়া কিছু নয়। হযরত আলী (রা)-এর কোন ব্যাখ্যাই তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। অন্য কথায়, তিনি তা বুঝতে চাচ্ছিলেন না। আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে তালহা (রা) ও যুবায়র (রা)-এর বিদ্রোহ, মদীনার বেশ কয়েকজন সাহাবী তাঁর হাতে বায়‘আত হওয়া থেকে এবং তার (মুআবিয়া) প্রতি আমর ইবনুল ‘আস প্রমুখের সহায়তা আমীরে মুআবিয়ার আস্থা ও বিশ্বাসকে আরো জোরদার করে দিয়েছিল। উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ দাবী ও সংকল্প পুনর্বিবেচনা করতে এবং উচ্চাশা ত্যাগ করতে নিশ্চয়ই বাধ্য হতেন, যদি তাদের সঙ্গীসাথী এবং সৈন্যরা নিজেরা সঠিক পথে এসে এর পর নিজেদের নেতৃবৃন্দের উপরও সঠিক পথে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করত। এজন্য ঐ বিরতিকাল তথা মুহাররম মাস ছিল একটি যথার্থ মাস। কিন্তু সাবাঈ দল এমনভাবে ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র চালায় যে, মুসলমানরা শেষ পর্যন্ত একটা আপোস-মীমাংসায় উপনীত হতে ব্যর্থ হয়।