hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪১৪

অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধকরণ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাবর্তন

আমর ইবনুল ‘আস (রা) হযরত আলীর দরবারে হাযির হয়ে তাঁকে অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে অনুরোধ জানান এবং তখনই উভয় পক্ষের সম্মতিতে নিম্নলিখিত অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধ করা হয়।

আলী ইব্‌ন আবূ তালিব ও মুআবিয়া ইব্‌ন আবূ সূফিয়ানের মধ্যে এই অঙ্গীকারনামা লিপিবদ্ধ করা হলো। আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) কূফাবাসী এবং ঐ সমস্ত লোকের পক্ষ থেকে, যারা তার সাথে রয়েছেন, একজন মুনসিফ তথা মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করেছেন। অনুরূপভাবে মুআবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফিয়ান সিরিয়াবাসী এবং ঐ সমস্ত লোকের পক্ষ থেকে যারা তার সাথে রয়েছেন, একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছেন। আমরা আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং তাঁর নির্দেশকে চূড়ান্ত ফায়সালাকারী মেনে নিয়ে এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে, আমরা আল্লাহর হুকুম এবং আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কিছুকে (আমাদের বিষয়াদি ফায়সালার ক্ষেত্রে) গুরুত্ব দেব না। আমরা ‘আলহামদু’ (সূরা ফাতিহা) থেকে আরম্ভ করে ‘ওয়ান্নাস’ (সূরা নাস) পর্যন্ত সমগ্র কুরআন যেসব কাজ করার নির্দেশ দেয় আমরা তাই করব এবং যে কাজ করতে নিষেধ করে আমরা তা থেকে বিরত থাকব। দুই পক্ষের যে দু’জন প্রতিনিধি মনোনীত হয়েছেন তারা হচ্ছেন আবূ মূসা আবদুল্লাহ ইব্‌ন কায়স আশআরী (রা) এবং আমর ইবনুল ‘আস (রা)। এরা উভয়ে আল্লাহর কিতাবের মধ্যে যে নির্দেশ পাবেন তদনুযায়ী ফায়সালা করবেন। আর যদি আল্লাহর কিতাবের মধ্যে নির্দেশ না পান তাহলে সেই সুন্নাত অনুযায়ী ফায়সালা করবেন, যার উপর মুসলিম উম্মতের মতৈক্য রয়েছে।

এরপর উভয় হাকিম তথা আবূ মূসা আশআরী ও আমর ইবনুল ‘আস (রা)-এর নিকট থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নেওয়া হয় যে, তারা আল্লাহকে হাযির-নাযির জেনে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী উভয় পক্ষের মধ্যকার বিরোধের সঠিক ফায়সালা করবেন এবং মুসলিম উম্মাহকে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে নিক্ষেপ করবেন না। এরপর উভয় হাকিমকে পরবর্তী রমযান পর্যন্ত ছয় মাসের সময় দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে, তারা এই সময়ের মধ্যে যখন ইচ্ছা উভয় পক্ষকে অবহিত করে আওয়াজ নামক স্থানে (যা দামিশক ও কূফার ঠিক মধ্যস্থলে ও দুমাতুল জানদালের সন্নিকটে অবস্থিত) তাদের ফায়সালা শুনিয়ে দেবেন। এই সময়ের মধ্যে তারা উভয় পক্ষের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ করবেন এবং একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই প্রস্তাবও গৃহীত হয় যে, যখন হাকিমদ্বয় তাদের চূড়ান্ত ফায়সালা শোনাবার জন্য আওয়াজের দিকে রওয়ানা হবেন তখন আলী (রা) মাত্র চারশ’ লোক নিয়ে কূফা থেকে আবূ মূসা আশআরীর সাথে আসবেন। অনুরূপভাবে আমীরে মুআবিয়া (রা) দামিশক থেকে মাত্র চারশ’ লোক নিয়ে আমর ইবনুল ‘আসের সাথে আসবেন। এই আটশোলোক যাদেরকে হাকিমদ্বয় তাঁদের চূড়ান্ত ফায়সালা শোনাবেন সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের প্রতিনিধি হিসাবে গণ্য হবেন।

উপরোক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আলী (রা) ও মুআবিয়া (রা) আপন আপন বাহিনীর কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শোনানোর পর উভয় হাকিম বা প্রতিনিধির জানমাল ও পরিবার-পরিজনের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা থাকবে। এরপর অঙ্গীকার পত্রের দু’টি কপি তৈরি করা হয়। তাতে সাক্ষী ও যামিন হিসাবে স্বাক্ষর করেন হযরত আলী (রা)-এর পক্ষ থেকে আশআস্ ইব্‌ন কায়স, সা‘দ ইব্‌ন কায়স হামদানী, ওয়ারাকা ইব্‌ন ইয়াহইয়া বাজালী, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন ফাহল আজালী, হুজর ইব্‌ন আদী আল-কিনদী, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন তুফায়ল আমিরী, উকবা ইব্‌ন যিয়াদ হাদরামী, ইয়াযীদ ইব্‌ন খুযায়মা তামীমী, মালিক ইব্‌ন কা‘ব হামাদানী এবং আমীরে মুআবিয়া (রা)-এর পক্ষ থেকে আবুল আওয়ার হাবীব ইব্‌ন মাসলামা, যুউল ইব্‌ন আমর উযরী, হামযা ইব্‌ন মালিক হামাদানী, আবদুর রহমান ইব্‌ন খালিদ মাখযূমী, সুমাইয়া ইব্‌ন ইয়াযীদ আনসারী, উত্‌বা ইব্‌ন আবূ সূফিয়ান ও ইয়াযীদ ইবনুল হুর আবসী। উভয় কপি তৈরি হলে তার একটি আবূ মূসা আশআরী (রা)-এর এবং অপরটি আমর ইবনুল ‘আস (রা)-কে সোপর্দ করা হল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হযরত আলী (রা)-এর পক্ষ থেকে সাক্ষী ও যামিন হিসাবে আশতারকে স্বাক্ষর করতে বললে তিনি স্পষ্ট ভাষায় তা অস্বীকার করেন। আশআস ইব্‌ন কায়স এজন্য তাকে চাপ দিলে উভয়ের মধ্যে চরম কথা কাটাকাটি হয়, তবে তা ফিতনার পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। অঙ্গীকারনামা সম্পর্কিত বিষয়াদি সম্পন্ন করতে চার দিন লেগে যায়। সফর মাসের ১৩ তারিখে অঙ্গীকারনামা উভয় হাকিমের হাতে অর্পণ করা হয়। এরপর উভয় বাহিনী সিফ্‌ফীনের যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে কূফা ও দামিশকের দিকে ফিরে যায়। আমীর মুআবিয়া ভালোয় ভালোয় দামিশকে পৌঁছতে সক্ষম হলেও আলী (রা)-এর সামনে ফিতনার আর একটি নতুন দরজা খুলে যায়।