hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪০৪

কূফায় রাজধানী স্থানান্তর

জামাল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হযরত আলী (রা)-এর সবচেয়ে বড় কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, সিরিয়া প্রদেশকে আয়ত্তাধীনে আনা এবং আমীর মুআবিয়ার কাছ থেকে বায়‘আত গ্রহণ করা। এই লক্ষ্যে তিনি কূফায় অবস্থান করাই সমীচীন মনে করলেন। তাছাড়া আলী (রা)-এর বাহিনীর মধ্যে কূফীরাই ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী। এই প্রেক্ষিতেও কূফার রাজধানী স্থানান্তর ছিল যুক্তিসঙ্গত। উপরন্তু কূফা ছিল মদীনার চাইতে সিরিয়ার অধিক নিকটবর্তী। ইরানী প্রদেশগুলো ছিল কূফা দ্বারা অধিক প্রভাবিত। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফত আমলে মদীনার গণ্যমান্য তথা সাহাবিগণ বিভিন্ন প্রদেশে কর্মকর্তা বা গভর্নর পদে নিয়োগ লাভ করে মদীনার বাইরে চলে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই নিজেদের সফর সঙ্গী করে সংশ্লিষ্ট প্রদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন। কেননা এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা গভর্নরের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেত এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করাও সহজ হত। এভাবে হযরত উসমান (রা)-এর শাসন আমলে মদীনার গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফারূকে আযম (রা) তার খিলাফত আমলে মদীনাকে সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন এবং নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে তার প্রয়োজনও ছিল। কিন্তু এখন আর সে প্রয়োজন বাকী ছিল না। আলী (রা)-এর পূর্ববর্তী খলীফাদের স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার বা সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু সমসাময়িক পরিস্থিতিরি প্রেক্ষিতে আলী (রা) স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে হাযির থাকতে এবং একজন সেনাপতিরূপে যুদ্ধ পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যা হোক আলী (রা)-এর মদীনার পরিবর্তে কূফায় অবস্থান করাটাই ছিল অধিক সমীচীন। তাই তিনি আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে বসরার শাসনকর্তা নিয়োগ করে নিজে সৈন্যবাহিনীসহ কূফায় চলে যান।

এখানে একটি কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, হযরত উসমান (রা)-এর হত্যাকারী এবং বিদ্রোহীদের একটি অংশ আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাবার প্রচেষ্টায় তার একান্ত ভক্তে পরিণত হয়েছিল। এদেরকে আবদুল্লাহ ইব্‌ন সাবার দল বলা যেতে পারে। কিন্তু যেহেতু অনেক সরলপ্রাণ মুসলমান স্রেফ প্রতারিত হয়ে ঐ সাবাঈ দুলে যোগদান করেছিল তাই সত্যিকার অর্থে সাবাঈ দল বলতে ঐ সামান্য সংখ্যক লোকদের বোঝাত, যারা ছিল ঐ দলের মূল ভিত্তি। তারা যখন যেভাবে প্রয়োজন মনে করত, ঐ ধরনের লোক দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে মনে করত, তখন সেভাবে সে ধরনের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের মধ্য থেকেই একজন দলীয় নেতা নিয়োগ করত এবং ইতিপূর্বে অপর লক্ষ্য হাসিলের জন্য যেসব লোককে নিজেদের দলে ভিড়িয়েছিল তাদেরকে ছেড়ে দিত। এটাই একমাত্র কারণ যে, উসমান হত্যার ক্ষেত্রে সাবা দল সকল বিদ্রোহীকেই কাজে লাগিয়েছিল এবং জামাল যুদ্ধ পর্যন্ত তাদের একটি বিরাট অংশকে নিয়োজিত রেখেছিল। জামাল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন তারা আলী (রা)-এর বিরোধিতা এবং তার ছিদ্রান্বেষণে আত্মনিয়োগ করে তখন বিদ্রোহীদের একটি বিরাট অংশ সাবাঈ দল থেকে পৃথক হয়ে যায়। তারা হযরত আলীর সাথে সম্পৃক্ত থাকে এবং আপন কর্মতৎপরতা ও ত্যাগ উৎসর্গের বদৌলতে খলীফার দরবারে যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনেও সক্ষম হয়। হযরত আলী কুফায় আবাস গ্রহণ করায় কূফাবাসীদের উপর তার নির্ভরশীলতা আরো বেশী বৃদ্ধি পায়। এভাবে উসমানের হত্যাকারীরা হযরত আলীর বাহিনীতে শুধু আশ্রয়ই নেয়নি, বরং তাদের অনেকেই তার আস্থা অর্জনেও সক্ষম হয়। আর আমীরে মুআবিয়ার শক্তি বৃদ্ধির এটাও ছিল একটা কারণ। কেননা যে সমস্ত লোক হযরত উসমানের হত্যাকারীদের কিসাস গ্রহণ জরুরী মনে করত তারা যখন ঐ হত্যাকারীদেরই কিছু লোককে আলী (রা)-এর বাহিনীতে সসম্মানে ও সদর্পে বিচরণ করতে দেখত তারা আমীরে মুআবিয়ার তুলনায় আলী (রা)-এর অধিক উত্তম স্বীকার করা সত্ত্বেও আমীর মুআবিয়া (রা)-কে সমর্থন করছিল। আমীরে মুআবিয়া উসমান হত্যার প্রতিশোধের দাবীতেই হযরত আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।