hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২৯

হিজরী প্রথম বর্ষ

হিজরী প্রথম বর্ষের ঘটনাবলীর মধ্যে মসজিদে নববী নির্মাণ, নবী করীম (সাঃ)-এর বাসস্থান নির্মাণ, মক্কার অবশিষ্ট মুসলমানদেরকে মদীনায় নিয়ে আসার কথা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবূ উমামা আসআদ ইব্‌ন যুরারা (রা)-এর মৃত্যুর ঘটনাটিও উল্লেখের দাবী রাখে। আবূ উমামার কোন রোগ-শোক ছিলো না। অকস্মাৎ রোগাক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তিকাল করেন। এ খবরটি পাওয়া মাত্র হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছিলেন, বিধর্মীদের এ কথা বলার সুযোগ এসে গেলো যে, এ কেমনতর রাসূল যে, তার বন্ধুদের একজন আকস্মিকভাবে মারা গেলো। তার ইন্তিকালের পর বনূ নাজ্জার-এর লোকজন এসে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বললো: “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ উমামা আমাদের সরদার ছিলেন। তাঁর ইন্তিকালে আমরা সরদার শূন্য হয়ে গেলাম। আপনি আমাদের মধ্য থেকে কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করে দিন।”

জবাবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বললেন : বনূ নাজ্জারের তোমরা তো আমার মামু। এজন্যে আমি নিজেও তোমাদেরই একজন। আমি নিজেই তোমাদের নকীব বা সরদাররূপে রইলাম। এ কথা শুনে বনু নাজ্জারের লোকদের খুশির সীমা-পরিসীমা রইলো না। তারা আনন্দে বাগ বাগ হয়ে গেলো। তাদের মধ্য থেকে কাউকে নেতা নিযুক্ত করলে নেতৃত্ব প্রয়াসী অন্যরা হয়তো তাকে সহজে মেনে নিতে পারতো না। ফলে সাময়িকভাবে হলেও গোত্রটির মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর এ বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে সে আশংকা দূর হয়ে গেল। এভাবে গোত্রটির সাহস ও ঐক্য পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধিই পেলো।

হযরত নবী করীম (সাঃ) মদীনায় এসে সর্বপ্রথম যে ব্যাপারটির প্রতি মনোযোগী হলেন তা হলো শহরের নিরাপত্তা বিধান এবং নাগরিকদের পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ বৃদ্ধি। তিনি মদীনায় পৌঁছেই উপলব্ধি করেন যে, মক্কা থেকে মুহাজিরগণ যেন মদীনাবাসীদের কষ্টের কারণ ও সমস্যা হয়ে না দাঁড়ান। সাথে সাথে দীনের খাতিরে সীমাহীন কষ্ট অকাতরে গ্রহণকারী এবং নিজেদের প্রিয় ঘরবাড়ি, আত্মীয়-পরিজন, অর্থ-সম্পদ, জমি-জমার মায়াত্যাগী মুহাজিরগণও যাতে কোনরূপ মর্মযাতনার শিকার না হন, সেদিকেও তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিলো। তাই তিনি সমস্ত আনসার ও মুহাজিরকে একটি সমাবেশে একত্রিত করে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কে তাদেরকে উপদেশ দিলেন এবং মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতি স্থাপন করেন। প্রায় সকল মুহাজিরই কোন-না-কোন আনসারের ভাইয়ে পরিণত হলেন। হযরত আবূ বকর (রা)-এর দীনী ভাই হলেন খারিজা ইব্‌ন যুবায়র আনসারী (রা)। হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-এর ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হলো হযরত সা‘দ ইব্‌ন মুআয আনসারী (রা)-এর সাথে। হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আউফ (রা)-এর ভাই হলেন সা‘দ ইব্‌ন রবী‘ আনসারী। হযরত যুবায়র ইব্‌ন আওআম (রা)-এর ভ্রাতৃত্ব হলো সালামা ইব্‌ন সালামা (রা)-এর সাথে। হযরত উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) ছাবিত ইব্‌ন মুনযির আনসারী (রা)-এর ভাই হলেন। অনুরূপভাবে হযরত তালহা ইব্‌ন উবায়দুল্লাহ্ (রা) ও হযরত কা‘ব ইব্‌ন মালিক (রা), হযরত মুসআব ইব্‌ন উমায়র (রা) ও হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রা), আম্মার ইব্‌ন ইয়াসির (রা) ও হযরত হুযায়ফা ইব্‌ন ইয়ামান (রা) পরস্পরে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। মোটকথা এক এক জন মুহাজির এক একজন আনসারীর সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। মদীনার আনসারগণ এ ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কের যে মর্যাদা প্রদর্শন করেন পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোন নজীর নেই। মুহাজিরগণকে আনসারগণ তাঁদের সত্যিকারের ভাই বলেই গ্রহণ করেন এবং নিঃসংকোচে নিজেদের সমস্ত ধন-সম্পদ তাদের হাতে তুলে দেন। কোন কোন আনসার ভাই তো তার মুহাজির ভাইয়ের মনতুষ্টির জন্য নিজের দু’টি স্ত্রীর একজনকে তালাক দিয়ে মুহাজির ভাইয়ের হাতে তুলে দিতে অগ্রসর হন। মুহাজিরগণও এমনি সতর্ক ছিলেন যে, তারা তাদের ব্যয়ভার আনসার ভাইদের উপর চাপানো থেকে বিরত থাকেন। তারা অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে দেন এবং এভাবে তারা নিজেদের জীবিকা কায়িক শ্রম দ্বারা নির্বাহ করতে শুরু করেন। এভাবে তারা তাদের আনসার ভাইদের শক্তি বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ালেন।