hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২২৬

তৃতীয় অধ্যায় খিলাফতে রাশিদা খিলাফত ও খলীফা

খলীফা অর্থ স্থলবর্তী এবং খিলাফত অর্থ স্থলবর্তিতা। কিন্তু শরীআতের পরিভাষা ও ঐতিহাসিকদের পরিভাষায় খলীফা অর্থ বাদশাহ বা সম্রাটের কাছাকাছি। ইতিহাস ও ঘটনা পরম্পরা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত নবী করীম (সাঃ)-এর পর প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর খিলাফত বৃত্তান্ত আরম্ভ করার পূর্বে খলীফা বা খিলাফত শব্দের আলোচনায় নিজের ও পাঠকদের সময় ব্যয় করা কোন ঐতিহাসিকের পক্ষে জরুরী নয়। কিন্তু যেহেতু হযরত নবী করীম (সাঃ)-এর স্থলবর্তিতার বিষয়টি একটি নৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়ে দু’টি কওমের মধ্যে বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর এই বিবাদ ঐতিহাসিকগণ, ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহ, ঐতিহাসিক রচনাবলী ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনাভঙ্গিতেও তার প্রভাব রেখেছে—যার ফলে একজন প্রতিবেদকের কাজ কতকটা কঠিন হয়ে পড়েছে—তাই ইতিহাস পাঠকারীদেরকে কোন রকম ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য খিলাফত বিষয়টি সম্পর্কে আপন মতবাদ ও আকীদা-বিশ্বাস প্রথমেই বর্ণনা করে দেয়া এবং এরপর খিলাফতে রাশিদার বৃত্তান্ত বর্ণনা করা ইসলামের ইতিহাস লেখকদের পক্ষে আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

কুরআনুল করীমে যেখানে যেখানে ‘খলীফা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার পরে ‘আল-আরদ’ (পৃথিবী) শব্দও অবশ্য এসেছে। আর إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً (আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি) দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা হযরত আদম অর্থাৎ বনী আদমকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন। বনী আদমের আশরাফুল মাখলুকাত হওয়া স্পষ্ট এবং মানব জাতির সৃষ্টিজগতের উপর শাসনকর্তা হওয়া পরিষ্কার ব্যাপার। তাই এই পার্থিব মানব-খিলাফত নিঃসন্দেহে আল্লাহর খিলাফত এবং মানব জাতি হচ্ছে আল্লাহ্‌র খলীফা। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা এক অনুপম সত্তা। তিনি সবার স্রষ্টা ও মালিক। সার্বিকভাবে কোন সৃষ্টির পক্ষে যে আশরাফুল মাখলুকাতই হোক না কেনো—তাঁর স্থলবর্তী অর্থাৎ খলীফা হওয়া সম্ভব নয়। তাই মানব জাতিকে আল্লাহ্‌র আংশিক খলীফা ভাবতে হবে। আর তা এ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না যে, যেভাবে আল্লাহ্ তা‘আলা সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত বাদশাহ ও হুকুমকর্তা, তেমনিভাবে পৃথিবীর বুকে কেবল মানব জাতিকেই অন্যান্য সমুদয় সৃষ্টির উপর বাহ্যত শাসক দৃষ্ট হয় এবং মানুষই প্রতিটি বস্তু ও পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি দ্বারা তার আনুগত্য করিয়ে নেয়। অতএব প্রমাণিত হলো আয়াতে - إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً -এর মধ্যে খলীফা অর্থ শাসনকর্তা, অন্য কিছু নয়। কুরআন করীমের এক স্থানে বলা হয়েছে—

وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ -

তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং তোমাদের কতককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। (৬ : ১৬৫)

এখানে মানবের সেই সাধারণ খিলাফতের মধ্যে বিশেষত্ব বিদ্যমান। অর্থাৎ তোমাদের জাতিকে শাসক জাতি বানিয়েছেন। অন্যান্য মানব শ্রেণী তোমাদের অধীনস্থ এবং তোমরা শাসক জাতি। এখানেও সেই খলীফা শব্দই বিদ্যমান, যার অর্থ শাসক ছাড়া আর কিছু নয়। অন্যত্র বলা হয়েছে :

يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ .

হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। (৩৮: ২৬)

এখানেও একজন ব্যক্তি অর্থাৎ হযরত দাউদ (আ)-এর রাজত্ব ও সাম্রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে। এখানেও খলীফা শব্দটি বর্তমান যার অর্থ বাদশাহ বা সম্রাট ছাড়া আর কিছু নয়। হযরত দাউদ (আ)-এর এই রাজত্ব ও সাম্রাজ্য সম্পর্কে অন্যত্র বলা হয়েছে– وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ (আমি তার রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম। (৩৮ : ২০) অতঃপর বিশিষ্ট মুসলমানগণ বিশেষত সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে বলা হয়েছে :

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ .

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেনই, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে।” (২৪ : ৫৫)

অর্থাৎ যেমনিভাবে পৃথিবীতে আমি অন্যান্য লোককে শাসক বানিয়েছিলাম, তেমনিভাবে তোমাদের মধ্য থেকে (নবী (সাঃ)-এর সম্বোধিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে) যারা ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, তাদেরকে পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা দান করা হবে।