hadith book logo

ইসলামের ইতিহাস ১ম খণ্ড

লেখকঃ মাওলানা আকবর শাহ খান নজিববাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭১

নবী প্রেরণের জন্যে আরবকে কেন নির্বাচন করা হলো

এ প্রশ্নেরই সবচাইতে সঙ্গত, বুদ্ধিগ্রাহ্য ও মোক্ষম জবাব হচ্ছে, আখিরী যামানার নবী যে দেশেই জন্মগ্রহণ করতেন, সে দেশ সম্পর্কেই এরূপ প্রশ্ন উঠতে পারতো যে, সে দেশকে কেন এজন্যে নির্বাচিত করা হলো? কেননা, নবী তো শেষ পর্যন্ত কোন একটি দেশেই জন্মগ্রহণ করতেন এবং অন্যান্য দেশ এ গৌরব থেকে বঞ্চিত থাকতোই। সুতরাং এরূপ প্রশ্ন অবান্তর।

দ্বিতীয় জবাব হলো, দুনিয়ার অন্যান্য দেশ প্রাচীন আমলের কোন-না-কোন পর্যায়ে একবার একবার উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছে। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, নৈতিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে তারা তখন গোটা বিশ্বকে তাদের বিজয়ডংকা শুনিয়েছে। সকল জাতিই ইতিহাসের কোন না কোন পর্যায়ে অন্যান্য জাতির উপর প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে বা অপরের বশ্যতা স্বীকার করেছে। উপরন্তু পৃথিবীর অন্য কোন জাতির ভাষা ততটা উৎকর্ষ ও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। আরবী ভাষা, সে দেশের ভৌগোলিক ও নৈসর্গিক অবস্থা এবং তার অধিবাসীদের প্রচুর অবকাশের জন্য উৎকর্ষ ও পূর্ণতা লাভে সমর্থ হয়েছিলো। আরব ছাড়াও অন্য কোন দেশে যদি এ কামিল নবীর জন্ম হতো তাহলে তার প্রথম সম্বোধিত জাতি যেহেতু ইতোপূর্বে অন্যান্য জাতিকে দুর্দান্ত প্রতাপে শাসন করেছে তাই এ নবীর হিদায়াত ও তাঁর হিদায়াতনামা পূর্ণ প্রভায় উদ্ভাসিত হতো না বরং সংশ্লিষ্ট জাতির এক বিরাট অংশ তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের পরিচয়েই পরিচিত রয়ে গিয়েছিলো। এ কামিল নবীর শিক্ষার দ্বারা সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চরিত্র শুদ্ধির ক্ষেত্রে যে বিরাট কীর্তি সাধিত হতো তাও ঐ দেশ ও জাতির প্রাচীন ঐতিহ্যের অবদান বলে গণ্য হয়ে আখেরী যামানার নবী ও শেষ আসমানী কিতাবের বাহকের পূর্ণ প্রভা বিকাশের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতো। কামিল হিদায়াতনামা নাযিলের জন্যে প্রয়োজন ছিল ঐ ভাষার যা পৃথিবীর যাবৎ ভাষার মধ্যে পূর্ণাঙ্গতার শীর্ষে আরোহণ করেছে। আরবী ছাড়া এ চিরন্তন ও বিশ্বজনীন হিদায়াতনামার উপযোগী অন্য কোন ভাষা ছিল না এ পৃথিবীতে—যা‘ কিয়ামতকাল পর্যন্ত সকল দেশের সকল জাতিকে পথ প্রদর্শন করবে। এজন্যেই মহানবী (সাঃ)-এর আরবদেশে জন্মগ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো। আরববাসীরা না কোন দিন অন্য কোন জাতির দ্বারা শোষিত হয়েছে, আর না তারা কোন দিন অন্য কোন জাতিকে শাসন-শোষণ করেছে। তাই আরবদের জন্যে গোটা বিশ্বের সকল দেশ সকল জাতি ছিল একই সমান। তারা যখন ইসলামের আলোকবর্তিকা নিয়ে বেরিয়েছে তখন হিস্পানিয়া অর্থাৎ আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ব উপকূল থেকে চীন তথা চীন সাগরের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত গোটা সভ্য দুনিয়া সকল দেশ সকল জাতি তাদের দৃষ্টিতে সমান ছিলো। তারা সকলের কাছেই পর ছিলেন আর সকলেই তাদের নিকট পর ছিল। তাই আল্লাহ্ তা‘আলা যখন গোটা বিশ্বের জন্য এক অভিন্ন ধর্ম সাব্যস্ত করলেন তখন ঐ ধর্ম তিনি এমনি একটি জাতির মাধ্যমে গোটা বিশ্বে প্রচার করলেন, যারা সবার জন্যে সমান এবং একান্তই নিরপেক্ষ। আরবের নৈতিকতা তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির যেহেতু ইতোপূর্বে মোটেই উন্নতি হয়নি তাই ঐ বিশ্বজনীন ধর্ম রাতারাতি তাদেরকে সর্বাধিক শুদ্ধিশুদ্ধ, সর্বাধিক সভ্য ও নৈতিকতামণ্ডিত ও সকল জাতির শিক্ষক ও পথ প্রদর্শকে রূপান্তরিত করে এ সত্যকে সপ্রমাণিত করলো যে, আরবের এ বিস্ময়কর উন্নতির হেতু ইসলামের শিক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। সাথে সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, মহানবী (সাঃ) এমনি বিপুল আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী যে, পৃথিবীর প্রতিটি দেশ প্রতিটি জাতি সব যুগে তা থেকে উপকৃত হতে পারে। উপরন্তু পৃথিবীর সকল হাদী সকল পথপ্রদর্শক সকল নবী-রাসূল বিভিন্ন জাতির জন্যে যেসব শিক্ষা ও হিদায়াতনামা নিয়ে এসেছিলেন সেসবের মূলনীতিই কুরআন শরীফের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে :

فيها كتب قيمة .

আর উম্মী লকবধারী আরবী নবী (সাঃ)-এর মহান সত্তা সমস্ত পূর্ণতার আঁধার।

ফার্সী কবির ভাষায় :

انچه خويان همه دارند توتنها داری

তাদের সকলে যত সৌন্দর্য-সৌকর্যের অধিকারী ছিলেন হে মহানবী! আপনি একাই সে সবের অধিকারী।

এই শেষোক্ত বাক্যগুলোকে হয়ত ঐতিহাসিকের গণ্ডির বাইরের বক্তব্য বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু যেহেতু আমি এ ইতিহাস গ্রন্থটি মুসলমান পাঠকদের অধ্যয়নের জন্যই প্রণয়ন করেছি আর আমি আশা করি যে, মুসলমান পাঠকরাই এ গ্রন্থটি বেশী অধ্যয়ন করবেন, আর আমি নিজেও আল্লাহর শোকর মুসলমানই। তাই হুযূর (সাঃ)-এর জীবনকথা বিবৃত করতে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে বাক্যগুলো বেরিয়ে এসেছে, তা আমি প্রত্যাহার করতে পারতাম না। এটা যদি ঐতিহাসিকদের মজলিসে একটা দোষাবহ কাজ হয়েই থাকে, তা হলে আমি এজন্যে অবশ্যই খুশী যে, ঐতিহাসিকদের দল থেকে আমাকে বহিষ্কার করে দিলেও মুসলমানদের দলে তো আমি অবশ্যই শামিল বলে গণ্য হবো।