hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০২

অধ্যায়- ২ : কুরবানীর উদ্দেশ্য

কুরবানীর উদ্দেশ্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা :

وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِّنْ شَعَآئِرِ اللهِ لَكُمْ فِيْهَا خَيْرٌۗ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَآفَّۚ فَاِذَا وَجَبَتْ جُنُوْبُهَا فَكُلُوْا مِنْهَا وَاَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ ؕ كَذٰلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ

আর আমি উষ্ট্রকে করেছি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম, তোমাদের জন্য তাতে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং তোমরা সারিবদ্ধ হয়ে দন্ডায়মান অবস্থায় তাদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তোমরা সেটা হতে আহার করো এবং ধৈর্যশীল ও সওয়ালকারী অভাবগ্রস্তদেরকেও আহার করাও; এভাবে আমি তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (সূরা হজ্জ- ৩৬)

ব্যাখ্যা : মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত যেসব জিনিস থেকে লাভবান হয়, তার মধ্য থেকে প্রত্যেকটিই আল্লাহর নামে কুরবানী করা উচিত। শুধুমাত্র নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য নয় বরং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মালিকানার স্বীকৃতি দেয়ার জন্যও। যাতে করে মানুষ মনে মনে ও কার্যত এ কথা স্বীকার করে নেয় যে, আল্লাহ আমাকে যা কিছু দিয়েছেন সবকিছুই মূলত তাঁরই মালিকানাধীন। সুতরাং বলা যায় যে, ঈমান ও ইসলাম হচ্ছে, আত্মত্যাগের নাম। সালাত ও রোযা হচ্ছে, দেহ ও তার শক্তিসমূহের কুরবানী। যাকাত হচ্ছে, আল্লাহ আমাদেরকে যেসব সম্পদ দিয়েছেন সেগুলোর কুরবানী। জিহাদ হচ্ছে, সময় এবং মানসিক ও শারীরিক যোগ্যতাসমূহের কুরবানী। আর আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা হচ্ছে প্রাণের কুরবানী। এসব এক একটি নিয়ামতের কুরবানী এক একটি দানের জন্য কৃতজ্ঞতা। এভাবে পশু কুরবানী করার দায়িত্বও আমাদের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যাতে আমরা আল্লাহর এ বিরাট নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেই। কারণ তিনি তাঁর সৃষ্ট বহু প্রাণীকে আমাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন। আমরা তাদের পিঠে চড়ে দূর-দূরান্ত পথ অতিক্রম করি, তাদের সাহায্যে চাষাবাদ ও মাল পরিবহন করি, তাদের গোশত খাই, দুধ পান করি এবং তাদের চামড়া, পশম, রক্ত, হাড় ইত্যাদি প্রত্যেকটি জিনিস নানাভাবে ব্যবহার করি। এ চতুষ্পদ জমুতগুলোকে আমাদের জন্য অনুগত করে দিয়ে আল্লাহ আমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এ কুরবানী হচ্ছে সে বিরাট নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা :

لَنْ يَّنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلٰكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوٰى مِنْكُمْؕ كَذٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰى مَا هَدَاكُمْ ؕ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِيْنَ

আল্লাহর নিকট তাদের গোশত এবং রক্ত (কোনকিছুই) পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাক্বওয়া। এভাবে তিনি এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে পথপ্রদর্শন করেছেন; সুতরাং তুমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে সুসংবাদ দাও। (সূরা হজ্জ- ৩৭)

ব্যাখ্যা : জাহেলী যুগে লোকেরা কুরবানীর জন্তুর রক্ত কা‘বাগৃহের দেয়ালে মুছে দেয়া মর্যাদার কাজ মনে করত এবং এতে আল্লাহ খুশি হন বলে ধারণা করত। অতঃপর মানুষ যখন ইসলাম গ্রহণ করল, তখন সেসব প্রথা বজায় রাখতে চাইলে তাদেরকে তা হতে বারণ করার উদ্দেশ্যে এ আয়াতটি নাযিল হয়।

আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান দেখানো :

وَمَنْ يُّعَظِّمْ شَعَآئِرَ اللهِ فَاِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ

যদি কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান করে, তবে এটা তো তার অন্তরের তাক্বওয়া মাত্র। (সূরা হজ্জ- ৩২)

ব্যাখ্যা : شَعَائِرُ اللهِ (শা‘আইরুল্লাহ) অর্থাৎ আল্লাহর চিহ্নসমূহ তথা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের চিহ্নসমূহ। এটি দু’ধরনের হতে পারে- একটি হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাতমূলক কর্ম তথা সালাত, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি। অপরটি হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ হয় এমন স্মৃতিচিহ্ন তথা বাইতুল্লাহ বা কা‘বাঘর, সাফা-মারওয়া, কুরবানীর জন্য চিহ্নিত জন্তু, হজ্জের স্থানসমূহ ইত্যাদি। এ সম্মান প্রদর্শন হৃদয়ের অভ্যন্তরে লুকায়িত তাক্বওয়ার ফলেই সংঘটিত হয়। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি জেনে বুঝে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কোন অমর্যাদা পোষণ করে, তাহলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার মনে আল্লাহর কোন ভয় নেই।