১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩০৪
অধ্যায়- ৬ : চন্দ্র ও সূর্য
মানুষ চন্দ্র ও সূর্যের সাহায্যে দিন গণনা করে :
وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًاؕ ذٰلِكَ تَقْدِيْرُ الْعَزِيْزِ الْعَلِيْمِ
তিনিই গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন; এসবই মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ (আল্লাহ) কর্তৃক নির্ধারিত। (সূরা আন‘আম- ৯৬)
هُوَ الَّذِيْ جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَآءً وَّالْقَمَرَ نُوْرًا وَّقَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِيْنَ وَالْحِسَابَؕ مَا خَلَقَ اللهُ ذٰلِكَ اِلَّا بِالْحَقِّۚ يُفَصِّلُ الْاٰيَاتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ
তিনিই সূর্যকে জ্যোতির্ময় ও চন্দ্রকে আলোকময় করেছেন এবং এর (চন্দ্রের) মন্যিল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা বৎসর গণনা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এটা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি; তিনি এসব নিদর্শন জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করেন। (সূরা ইউনুস- ৫)
ব্যাখ্যা : এসব বিরাট বিরাট গ্রহ-উপগ্রহ অত্যন্ত শক্তিশালী নিয়ম ও শৃঙ্খলার বাঁধনে আবদ্ধ। মানুষ সময়, দিন, তারিখ ও মওসূমের হিসাব করতে সক্ষম হচ্ছে এ কারণে যে, সূর্যের উদয়াস্ত ও বিভিন্ন রাশি অতিক্রমের যে নিয়ম কানুন নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তাতে কখনই কোন পরিবর্তন হয় না। পৃথিবীতে অসংখ্য জীবজন্তু বেঁচে আছে এ কারণে যে, চন্দ্র ও সূর্যকে পৃথিবী থেকে একটি বিশেষ দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে এবং একটি নির্ভুল মাপের মাধ্যমে বিশেষ শৃঙ্খলার সাথে এ দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কোন হিসাব-নিকাশ ও মাপ ছাড়াই যদি পৃথিবীতে এদের দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত, তাহলে এখানে কারো পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না।
চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে :
وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتٰى عَادَ كَالْعُرْجُوْنِ الْقَدِيْمٌ
আমি চন্দ্রের জন্য নির্ধারণ করেছি বিভিন্ন স্তর। এমনকি তা ভ্রমণ শেষে ক্ষীণ হয়ে খেজুরের পুরাতন ডালের মতো হয়ে যায়। (সূরা ইয়াসীন- ৩৬)
চন্দ্র মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় নির্দেশ করে :
يَسْاَلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِؕ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ
তারা তোমাকে নতুন চাঁদসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বলো, এগুলো হচ্ছে মানুষের এবং হজ্জের জন্য সময় নির্ধারক। (সূরা বাক্বারা- ১৮৯)
সূর্য নামাযের সময় নির্দেশ করে :
اَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوْكِ الشَّمْسِ اِلٰى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْاٰنَ الْفَجْرِؕ اِنَّ قُرْاٰنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُوْدًا
সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যমত্ম সালাত কায়েম করবে এবং ফজরের সালাত কায়েম করবে। নিশ্চয় ফজরের কুরআন পাঠ (সালাত ফেরেশতাদের) উপস্থিতির সময়। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৮)
সূর্যের কারণেই ছায়া ওঠানামা করে :
اَلَمْ تَرَ اِلٰى رَبِّكَ كَيْفَ مَدَّ الظِّلَّۚ وَلَوْ شَآءَ لَجَعَلَهٗ سَاكِنًاۚ ثُمَّ جَعَلْنَا الشَّمْسَ عَلَيْهِ دَلِيْلًا – ثُمَّ قَبَضْنَاهُ اِلَيْنَا قَبْضًا يَّسِيْرًا
তুমি কি তোমার প্রতিপালকের প্রতি লক্ষ্য কর না- কীভাবে তিনি ছায়া সম্প্রসারিত করেন? তিনি ইচ্ছা করলে একে স্থির রাখতে পারতেন। অতঃপর আমি সূর্যকে এর নির্দেশক করেছি। অতঃপর আমি একে আমার দিকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়ে আসি। (সূরা ফুরক্বান- ৪৫, ৪৬)
আল্লাহ চন্দ্রকে আলোকময় করেছেন :
تَبَارَكَ الَّذِيْ جَعَلَ فِى السَّمَآءِ بُرُوْجًا وَّجَعَلَ فِيْهَا سِرَاجًا وَّقَمَرًا مُّنِيْرًا
তিনি কতই না মহান! যিনি নভোমন্ডলে সৃষ্টি করেছেন কক্ষপথ এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও আলোকময় চন্দ্র। (সূরা ফুরক্বান- ৬১)
আল্লাহ সূর্যকে করেছেন উজ্জ্বল প্রদীপস্বরূপ :
وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيْهِنَّ نُوْرًا وَّجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا
সেখানে চাঁদকে আলো ও সূর্যকে প্রদীপরূপে স্থাপন করেছেন। (সূরা নূহ- ১৬)
وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَّهَّاجًا
আমি সৃষ্টি করেছি একটি দীপ্তমান প্রদীপ। (সূরা নাবা- ১৩)
ব্যাখ্যা : وَهَّاجٌ (ওয়াহ্হাজ) এর অর্থ হচ্ছে, অতি উত্তপ্ত, অতি উজ্জ্বল। এ ছোট বাক্যটিতে মহান আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার যে বিরাট নিদর্শনটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে- তা হচ্ছে সূর্য। এটা পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড়। তার তাপমাত্রা ১ কোটি ৪০ লক্ষ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থান করা সত্ত্বেও তার আলোর শক্তি এত বেশি যে, মানুষ খালি চোখে তার দিকে দৃষ্টি রাখার চেষ্টা করলে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবে। মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীকে সূর্য থেকে এক ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্বে স্থাপন করেছেন। পৃথিবী তার বর্তমান অবস্থানের চেয়ে সূর্যের বেশি কাছাকাছি নয় বলে অস্বাভাবিক গরম নয়। আবার বেশি দূরে নয় বলে অস্বাভাবিক ঠান্ডাও নয়। এ কারণে এখানে মানুষ, পশু-পাখি ও উদ্ভিদের জীবন ধারণ সম্ভবপর হয়েছে। সূর্য থেকে শক্তির অপরিমেয় ভান্ডার উৎসারিত হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এ শক্তিই পৃথিবীর বুকে আমাদের জীবন ধারণের উৎস। এরই সাহায্যে আমাদের ক্ষেতে ফসল পরিপক্ক হচ্ছে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী আহার লাভ করছে। এরই উত্তাপে সাগরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়, তারপর বাতাসের সাহায্যে দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে বৃষ্টি আকারে অবতরণ করে। এ সূর্যের বুকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ এমন বিশাল অগ্নিকুন্ড জ্বালিয়ে রেখেছেন, যা কোটি কোটি বছর থেকে সমগ্র সৌরজগতে অব্যাহতভাবে আলো ও উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
চন্দ্র ও সূর্য মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত :
وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَآئِبَيْنِۚ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ
তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন; এগুলো অবিরাম একই নিয়মের অনুগামী। আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি ও দিবসকে। (সূরা ইবরাহীম- ৩৩)
وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَؕ وَالنُّجُوْمُ مُسَخَّرَاتٌ ۢبِاَمْرِهٖؕ اِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَاٰيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُوْنَ
তিনিই তোমাদের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত করেছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে; আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। নিশ্চয় এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিশ্চিত নিদর্শন। (সূরা নাহল- ১২)
চন্দ্র ও সূর্য নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে :
وَهُوَ الَّذِيْ خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَؕ كُلٌّ فِيْ فَلَكٍ يَّسْبَحُوْنَ
আর তিনি সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিবস এবং সূর্য ও চন্দ্র; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে। (সূরা আম্বিয়া- ৩৩)
এগুলো কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই ঘুরতে থাকবে :
كُلٌّ يَّجْرِيْ لِاَجَلٍ مُّسَمًّى
প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যমত্ম আবর্তন করবে। (সূরা রা‘দ- ২)
وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَؗ كُلٌّ يَّجْرِيْ لِاَجَلٍ مُّسَمًّى
তিনি নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে; প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলতে থাকবে। (সূরা ফাতির- ১৩)
উভয়ের চলার পথে কোন ভিন্নতা ঘটে না :
لَا الشَّمْسُ يَنْۢبَغِيْ لَهَاۤ اَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِؕ وَكُلٌّ فِيْ فَلَكٍ يَّسْبَحُوْنَ
সূর্যের সাধ্য নেই যে, সে চন্দ্রকে ধরে ফেলবে এবং রাত্রিরও (সাধ্য) নেই যে, সে দিনের পূর্বে আসতে পারবে। প্রত্যেকেই নির্ধারিত কক্ষপথে বিচরণ করে। (সূরা ইয়াসীন- ৪০)
কিছু লোক সূর্যের পূজা করে :
وَجَدْتُّهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُوْنَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُوْنِ اللهِ
(হুদহুদ পাখি বলল) আমি তাকে (বিলকিসকে) ও তার সম্প্রদায়কে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যকে সিজদারত অবস্থায় পেলাম। (সূরা নামল- ২৪)
অথচ সূর্য কোন উপাস্য নয় :
فَلَمَّا رَاَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هٰذَا رَبِّيْ هٰذَاۤ اَكْبَرُۚ فَلَمَّاۤ اَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ اِنِّيْ بَرِيْٓءٌ مِّمَّا تُشْرِكُوْنَ ‐ اِنِّيْ وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ حَنِيْفًا وَّمَاۤ اَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ
অতঃপর যখন সে (ইবরাহীম আঃ) সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে উদয় হতে দেখল তখন বলল, এটা আমার রব; আর এটাই সবচেয়ে বড়। কিন্তু যখন এটাও অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে (প্রতিপালকের সাথে) শরীক কর আমি তা হতে মুক্ত। আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আন‘আম- ৭৮, ৭৯)
আল্লাহ চন্দ্র-সূর্যের পূজা করতে নিষেধ করেছেন :
وَمِنْ اٰيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُؕ لَا تَسْجُدُوْا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوْا لِلّٰهِ الَّذِيْ خَلَقَهُنَّ اِنْ كُنْتُمْ اِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ
তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা করো না এবং চন্দ্রকেও নয়; বরং সিজদা করো আল্লাহকে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন; যদি তোমরা তাঁরই ইবাদাত করে থাক। (সূরা হা-মীম সাজদা- ৩৭)
وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًاؕ ذٰلِكَ تَقْدِيْرُ الْعَزِيْزِ الْعَلِيْمِ
তিনিই গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন; এসবই মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ (আল্লাহ) কর্তৃক নির্ধারিত। (সূরা আন‘আম- ৯৬)
هُوَ الَّذِيْ جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَآءً وَّالْقَمَرَ نُوْرًا وَّقَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِيْنَ وَالْحِسَابَؕ مَا خَلَقَ اللهُ ذٰلِكَ اِلَّا بِالْحَقِّۚ يُفَصِّلُ الْاٰيَاتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ
তিনিই সূর্যকে জ্যোতির্ময় ও চন্দ্রকে আলোকময় করেছেন এবং এর (চন্দ্রের) মন্যিল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা বৎসর গণনা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এটা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি; তিনি এসব নিদর্শন জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করেন। (সূরা ইউনুস- ৫)
ব্যাখ্যা : এসব বিরাট বিরাট গ্রহ-উপগ্রহ অত্যন্ত শক্তিশালী নিয়ম ও শৃঙ্খলার বাঁধনে আবদ্ধ। মানুষ সময়, দিন, তারিখ ও মওসূমের হিসাব করতে সক্ষম হচ্ছে এ কারণে যে, সূর্যের উদয়াস্ত ও বিভিন্ন রাশি অতিক্রমের যে নিয়ম কানুন নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তাতে কখনই কোন পরিবর্তন হয় না। পৃথিবীতে অসংখ্য জীবজন্তু বেঁচে আছে এ কারণে যে, চন্দ্র ও সূর্যকে পৃথিবী থেকে একটি বিশেষ দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে এবং একটি নির্ভুল মাপের মাধ্যমে বিশেষ শৃঙ্খলার সাথে এ দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কোন হিসাব-নিকাশ ও মাপ ছাড়াই যদি পৃথিবীতে এদের দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত, তাহলে এখানে কারো পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না।
চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে :
وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتٰى عَادَ كَالْعُرْجُوْنِ الْقَدِيْمٌ
আমি চন্দ্রের জন্য নির্ধারণ করেছি বিভিন্ন স্তর। এমনকি তা ভ্রমণ শেষে ক্ষীণ হয়ে খেজুরের পুরাতন ডালের মতো হয়ে যায়। (সূরা ইয়াসীন- ৩৬)
চন্দ্র মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় নির্দেশ করে :
يَسْاَلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِؕ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ
তারা তোমাকে নতুন চাঁদসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বলো, এগুলো হচ্ছে মানুষের এবং হজ্জের জন্য সময় নির্ধারক। (সূরা বাক্বারা- ১৮৯)
সূর্য নামাযের সময় নির্দেশ করে :
اَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوْكِ الشَّمْسِ اِلٰى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْاٰنَ الْفَجْرِؕ اِنَّ قُرْاٰنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُوْدًا
সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যমত্ম সালাত কায়েম করবে এবং ফজরের সালাত কায়েম করবে। নিশ্চয় ফজরের কুরআন পাঠ (সালাত ফেরেশতাদের) উপস্থিতির সময়। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৮)
সূর্যের কারণেই ছায়া ওঠানামা করে :
اَلَمْ تَرَ اِلٰى رَبِّكَ كَيْفَ مَدَّ الظِّلَّۚ وَلَوْ شَآءَ لَجَعَلَهٗ سَاكِنًاۚ ثُمَّ جَعَلْنَا الشَّمْسَ عَلَيْهِ دَلِيْلًا – ثُمَّ قَبَضْنَاهُ اِلَيْنَا قَبْضًا يَّسِيْرًا
তুমি কি তোমার প্রতিপালকের প্রতি লক্ষ্য কর না- কীভাবে তিনি ছায়া সম্প্রসারিত করেন? তিনি ইচ্ছা করলে একে স্থির রাখতে পারতেন। অতঃপর আমি সূর্যকে এর নির্দেশক করেছি। অতঃপর আমি একে আমার দিকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়ে আসি। (সূরা ফুরক্বান- ৪৫, ৪৬)
আল্লাহ চন্দ্রকে আলোকময় করেছেন :
تَبَارَكَ الَّذِيْ جَعَلَ فِى السَّمَآءِ بُرُوْجًا وَّجَعَلَ فِيْهَا سِرَاجًا وَّقَمَرًا مُّنِيْرًا
তিনি কতই না মহান! যিনি নভোমন্ডলে সৃষ্টি করেছেন কক্ষপথ এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও আলোকময় চন্দ্র। (সূরা ফুরক্বান- ৬১)
আল্লাহ সূর্যকে করেছেন উজ্জ্বল প্রদীপস্বরূপ :
وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيْهِنَّ نُوْرًا وَّجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا
সেখানে চাঁদকে আলো ও সূর্যকে প্রদীপরূপে স্থাপন করেছেন। (সূরা নূহ- ১৬)
وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَّهَّاجًا
আমি সৃষ্টি করেছি একটি দীপ্তমান প্রদীপ। (সূরা নাবা- ১৩)
ব্যাখ্যা : وَهَّاجٌ (ওয়াহ্হাজ) এর অর্থ হচ্ছে, অতি উত্তপ্ত, অতি উজ্জ্বল। এ ছোট বাক্যটিতে মহান আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার যে বিরাট নিদর্শনটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে- তা হচ্ছে সূর্য। এটা পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড়। তার তাপমাত্রা ১ কোটি ৪০ লক্ষ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থান করা সত্ত্বেও তার আলোর শক্তি এত বেশি যে, মানুষ খালি চোখে তার দিকে দৃষ্টি রাখার চেষ্টা করলে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবে। মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীকে সূর্য থেকে এক ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্বে স্থাপন করেছেন। পৃথিবী তার বর্তমান অবস্থানের চেয়ে সূর্যের বেশি কাছাকাছি নয় বলে অস্বাভাবিক গরম নয়। আবার বেশি দূরে নয় বলে অস্বাভাবিক ঠান্ডাও নয়। এ কারণে এখানে মানুষ, পশু-পাখি ও উদ্ভিদের জীবন ধারণ সম্ভবপর হয়েছে। সূর্য থেকে শক্তির অপরিমেয় ভান্ডার উৎসারিত হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এ শক্তিই পৃথিবীর বুকে আমাদের জীবন ধারণের উৎস। এরই সাহায্যে আমাদের ক্ষেতে ফসল পরিপক্ক হচ্ছে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী আহার লাভ করছে। এরই উত্তাপে সাগরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়, তারপর বাতাসের সাহায্যে দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে বৃষ্টি আকারে অবতরণ করে। এ সূর্যের বুকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ এমন বিশাল অগ্নিকুন্ড জ্বালিয়ে রেখেছেন, যা কোটি কোটি বছর থেকে সমগ্র সৌরজগতে অব্যাহতভাবে আলো ও উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
চন্দ্র ও সূর্য মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত :
وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَآئِبَيْنِۚ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ
তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন; এগুলো অবিরাম একই নিয়মের অনুগামী। আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি ও দিবসকে। (সূরা ইবরাহীম- ৩৩)
وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَؕ وَالنُّجُوْمُ مُسَخَّرَاتٌ ۢبِاَمْرِهٖؕ اِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَاٰيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُوْنَ
তিনিই তোমাদের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত করেছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে; আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। নিশ্চয় এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিশ্চিত নিদর্শন। (সূরা নাহল- ১২)
চন্দ্র ও সূর্য নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে :
وَهُوَ الَّذِيْ خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَؕ كُلٌّ فِيْ فَلَكٍ يَّسْبَحُوْنَ
আর তিনি সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিবস এবং সূর্য ও চন্দ্র; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে। (সূরা আম্বিয়া- ৩৩)
এগুলো কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই ঘুরতে থাকবে :
كُلٌّ يَّجْرِيْ لِاَجَلٍ مُّسَمًّى
প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যমত্ম আবর্তন করবে। (সূরা রা‘দ- ২)
وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَؗ كُلٌّ يَّجْرِيْ لِاَجَلٍ مُّسَمًّى
তিনি নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে; প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলতে থাকবে। (সূরা ফাতির- ১৩)
উভয়ের চলার পথে কোন ভিন্নতা ঘটে না :
لَا الشَّمْسُ يَنْۢبَغِيْ لَهَاۤ اَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِؕ وَكُلٌّ فِيْ فَلَكٍ يَّسْبَحُوْنَ
সূর্যের সাধ্য নেই যে, সে চন্দ্রকে ধরে ফেলবে এবং রাত্রিরও (সাধ্য) নেই যে, সে দিনের পূর্বে আসতে পারবে। প্রত্যেকেই নির্ধারিত কক্ষপথে বিচরণ করে। (সূরা ইয়াসীন- ৪০)
কিছু লোক সূর্যের পূজা করে :
وَجَدْتُّهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُوْنَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُوْنِ اللهِ
(হুদহুদ পাখি বলল) আমি তাকে (বিলকিসকে) ও তার সম্প্রদায়কে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যকে সিজদারত অবস্থায় পেলাম। (সূরা নামল- ২৪)
অথচ সূর্য কোন উপাস্য নয় :
فَلَمَّا رَاَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هٰذَا رَبِّيْ هٰذَاۤ اَكْبَرُۚ فَلَمَّاۤ اَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ اِنِّيْ بَرِيْٓءٌ مِّمَّا تُشْرِكُوْنَ ‐ اِنِّيْ وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ حَنِيْفًا وَّمَاۤ اَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ
অতঃপর যখন সে (ইবরাহীম আঃ) সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে উদয় হতে দেখল তখন বলল, এটা আমার রব; আর এটাই সবচেয়ে বড়। কিন্তু যখন এটাও অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে (প্রতিপালকের সাথে) শরীক কর আমি তা হতে মুক্ত। আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আন‘আম- ৭৮, ৭৯)
আল্লাহ চন্দ্র-সূর্যের পূজা করতে নিষেধ করেছেন :
وَمِنْ اٰيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُؕ لَا تَسْجُدُوْا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوْا لِلّٰهِ الَّذِيْ خَلَقَهُنَّ اِنْ كُنْتُمْ اِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ
তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা করো না এবং চন্দ্রকেও নয়; বরং সিজদা করো আল্লাহকে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন; যদি তোমরা তাঁরই ইবাদাত করে থাক। (সূরা হা-মীম সাজদা- ৩৭)