hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২৯

অধ্যায়- ৯ : আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় বাধা

সত্য প্রতিষ্ঠায় বাধা থাকবেই :

يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِۚ مَا يَاْتِيْهِمْ مِّنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا كَانُوْا بِهٖ يَسْتَهْزِئُوْنَ

আফসোস! সেসব বান্দাদের জন্য, যাদের কাছে কখনো এমন কোন রাসূল আসেনি, যাকে নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেনি। (সূরা ইয়াসীন- ৩০)

ব্যাখ্যা : আল্লাহর বাণীকে সমুনণত করা ও তাঁর বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দুনিয়ার যেখানেই যা কিছু প্রচেষ্টা চলছে, মুসলিমরা যতই নির্যাতিত হচ্ছে তাতে কাফিরদের মনে একটুও সমবেদনা জাগবে না। কেননা কাফিরদের সমস্ত আগ্রহ আল্লাহর হুকুম অমান্য করার সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহর হুকুম অমান্য করার কাজ যে যেখানেই করবে কাফিররা যদি তাতে শরীক নাও হতে পারে, তবুও অন্ততপক্ষে জিন্দাবাদ ধ্বনি দেবে। এভাবে সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের বুকে সাহস যোগাবে। অপরদিকে যদি কেউ আল্লাহর হুকুম পালন করতে থাকে, তাহলে কাফিররা তাকে বাধা দেয়ার ব্যাপারে একটুও ইতস্ততবোধ করবে না।

ইসলামের দুশমনরা ইসলামের আলো নিভিয়ে দিতে চায় :

يُرِيْدُوْنَ لِيُطْفِئُوْا نُوْرَ اللهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَاللهُ مُتِمُّ نُوْرِهٖ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُوْنَ

তারা আল্লাহর নূরকে (ইসলামকে) তাদের মুখের ফুৎকার দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণরূপে প্রকাশকারী, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। (সূরা সাফ- ৮)

তারা সত্যকে হেয় করার চেষ্টা করে :

وَيُجَادِلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوْا بِهِ الْحَقَّ وَاتَّخَذُواۤ اٰيَاتِيْ وَمَاۤ اُنْذِرُوْا هُزُوًا

কাফিররা সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য মিথ্যা যুক্তি পেশ করে বিতর্কে লিপ্ত হয়। আর তারা আমার নিদর্শনাবলি এবং যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে সেগুলোকে বিদ্রূপের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। (সূরা কাহফ- ৫৬)

তারা মুসলিমদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় :

وَاِذَا تُتْلٰى عَلَيْهِمْ اٰيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ تَعْرِفُ فِيْ وُجُوْهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا الْمُنْكَرَؕ يَكَادُوْنَ يَسْطُوْنَ بِالَّذِيْنَ يَتْلُوْنَ عَلَيْهِمْ اٰيَاتِنَاؕ قُلْ اَفَاُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ مِّنْ ذٰلِكُمُؕ اَلنَّارُؕ وَعَدَهَا اللهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْاؕ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ

তাদের নিকট আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হলে তুমি কাফিরদের মুখমন্ডলে অসন্তোষ ভাব লক্ষ্য করবে। অবস্থা দেখে মনে হয়, যারা তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এখনি তাদের উপর আক্রমণ করবে। বলো, তবে কি আমি তোমাদেরকে এর চেয়ে মন্দ কিছুর সংবাদ দেব? আর তা হলো এমন আগুন, যার ব্যাপারে আল্লাহ কাফিরদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? আর এটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! (সূরা হজ্জ- ৭২)

হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন :

اَ لَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ الطَّاغُوْتِ فَقَاتِلُوْاۤ اَوْلِيَآءَ الشَّيْطَانِۚ اِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيْفًا

যারা মুমিন তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে এবং যারা কাফির তারা তাগুতের পথে যুদ্ধ করে। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; (মনে রেখো) শয়তানের কৌশল অবশ্যই দুর্বল। (সূরা নিসা- ৭৬)

ব্যাখ্যা : এটি আল্লাহর একটি দ্ব্যর্থহীন ফায়সালা। আল্লাহর জমিনে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে লড়াই করা হচ্ছে ঈমানদারদের কাজ। যথার্থ ও সত্যিকার মুমিন এ কাজ থেকে কখনো বিরত থাকবে না। আর আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহদ্রোহীদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তাগুতের পথে লড়াই করা হচ্ছে কাফিরদের কাজ। কোন ঈমানদার ব্যক্তি এ কাজ করতে পারে না।

সত্য প্রতিষ্ঠায় বাধা পরীক্ষাস্বরূপ :

وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةًؕ اَتَصْبِرُوْنَۚ وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيْرًا

হে মানুষ! আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপর জনের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ বানিয়েছি। সুতরাং তোমরা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখছেন। (সূরা ফুরক্বান- ২০)

ব্যাখ্যা : দ্বীনের বিরোধীরা যুলুম, নিপীড়ন ও শত্রুতার যে আগুনের কুন্ড জ্বালিয়ে রেখেছে, তা মূলত প্রকৃত ঈমানদারদেরকে যাচাই করার জন্য একটি সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম, যার মাধ্যমে দুর্বল ঈমানদাররা চিহ্নত হয়ে যায়। এরপর খাঁটি ঈমানদারদের মুকাবিলায় দুনিয়ার আর কোন শক্তিই দাঁড়াতে পারে না। এ আগুনের কুন্ড না থাকলে ভালো-মন্দ সবধরনের লোক নবী ﷺ এর চারদিকে একত্রিত হতে থাকত এবং দ্বীনের সূচনাই হতো একটি অপরিপক্ক দল থেকে। এ ছাঁকনি ছাড়া যদি রাসূল ﷺ বিরাট শান-শওকতের সাথে এসে সিংহাসনে বসে যেতেন। অতঃপর অর্থভান্ডারের মুখ তাঁর অনুসারীদের জন্য খুলে দেয়া হতো এবং সবার আগে বড় বড় সরদার ও সমাজপতীরা অগ্রসর হয়ে তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করে নিত, তাহলে এমন কোন নির্বোধ লোক পাওয়া যেত না যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনত না। এ অবস্থায় সত্যপ্রিয় লোকেরা সবার পেছনে থেকে যেত এবং বৈষয়িক স্বার্থ পূজারীরা এগিয়ে যেত।

প্রত্যেক নবীই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন :

وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا مِّنَ الْمُجْرِمِيْنَؕ وَكَفٰى بِرَبِّكَ هَادِيًا وَّنَصِيْرًا

এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়ে দিয়েছিলাম। পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে তোমার জন্য তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট। (সূরা ফুরক্বান- ৩১)

وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِيْنَ الْاِنْسِ وَالْجِنِّ يُوْحِيْ بَعْضُهُمْ اِلٰى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًا

এভাবে আমি মানব ও জিনদের মধ্যে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়ে দিয়েছি। প্রতারণার উদ্দেশ্যে তারা একে অন্যকে চমকপ্রদ কথার দ্বারা প্ররোচিত করে। (সূরা আন‘আম- ১১২)

ব্যাখ্যা : সত্য বিরোধীদের একটি পুরাতন অস্ত্র হলো যখনই কেউ সংস্কারমূলক কাজের কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে, তখনই তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয় যে, এর উদ্দেশ্য শুধু ক্ষমতা দখল করা। এ অভিযোগটিই ফিরাউন মূসা ও হারূন (আঃ) এর বিরুদ্ধে এনেছিল। সে বলেছিল, তোমরা দেশে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার জন্য এসেছ। এ অভিযোগ ঈসা (আঃ) এর বিরুদ্ধেও আনা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এ ব্যক্তি ইয়াহুদিদের বাদশাহ হতে চায়। আর কুরাইশ সরদাররা নবী ﷺ সম্পর্কেও একই সন্দেহ পোষণ করত। এজন্য কয়েকবার তারা তাঁর সাথে এভাবে চুক্তি করতে চেয়েছিল যে, যদি তুমি কর্তৃত্ব লাভ করতে চাও, তাহলে আমাদের দলে এসে পড়। আমরা তোমাকে বাদশাহ বানিয়ে দেব। সংস্কারকদের বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতার লোভ’ এ অপবাদ চিরকাল ক্ষমতাসীন লোকেরা লাগিয়ে এসেছে। অর্থাৎ তারা যেন এ কথা বলতে চায় যে, তারা নিজেরা এবং তাদের প্রভুরা যে ক্ষমতা লাভ করেছে তা যেন তাদের জন্মগত অধিকার। এখানে এ কথাটিও বুঝে নিতে হবে যে, প্রচলিত জীবনব্যবস্থার দোষত্রুটিগুলো দূর করার জন্য যে ব্যক্তিই অগ্রসর হবে এবং এর মুকাবিলায় সংস্কারবাদী হয়ে দাঁড়াবে, তাদেরকে সরিয়ে দেয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালানো হবে। তাছাড়া এ ধরনের লোকের দাওয়াত যখনই সফল হবে, তার স্বাভাবিক পরিণতিতে সে জনগণের উপর কর্তৃত্বশীল হবে। আসলে ক্ষমতার জন্যই ক্ষমতা কামনা করা এবং আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ক্ষমতা কামনা করার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। এটা এতটাই পার্থক্য যে, যেমন পার্থক্য আছে ডাক্তারের ছুরি ও ডাকাতের ছুরির মধ্যে। কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি ডাকাতকে ডাক্তার এবং ডাক্তারকে ডাকাত মনে করার মতো ভুল করতে পারে না।

অনেক নবীকেই প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে :

اِنَّ الَّذِيْنَ يَكْفُرُوْنَ بِاٰيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُوْنَ النَّبِيِّيْنَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَّيَقْتُلُوْنَ الَّذِيْنَ يَاْمُرُوْنَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ اَلِيْمٍ

নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করেছে এবং অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করেছে; আর যারা ইনসাফের নির্দেশ দেয় তাদেরকেও হত্যা করেছে, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। (সূরা আলে ইমরান- ২১)

অতীতের মুসলিমরাও চরম বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন :

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَاْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِيْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْؕ مَسَّتْهُمُ الْبَاْسَآءُ وَالضَّرَّآءُ وَزُلْزِلُوْا حَتّٰى يَقُوْلَ الرَّسُوْلُ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَعَهٗ مَتٰى نَصْرُ اللهِؕ اَ لَاۤ اِنَّ نَصْرَ اللهِ قَرِيْبٌ

তোমরা কি ধারণা করছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতো সংকটময় অবস্থা এখনো তোমাদের উপর আসেনি। তাদেরকে বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল, এমনকি তাদেরকে কাঁপিয়ে তুলা হয়েছিল। অবশেষে রাসূল ও তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলতে বাধ্য হয়েছিল যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী। (সূরা বাক্বারা- ২১৪)

ব্যাখ্যা : আল্লাহ নিজের ইচ্ছায় তাদেরকেও কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেন, যারা নিজেদের প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আবার যারা আনুগত্যের পথ অবলম্বন করেছে, তাদেরকেও একইভাবে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিচ্ছেন। তবে তাঁর সন্তুষ্টি ও সাহায্য-সহায়তার হাত প্রসারিত হয় সত্যপন্থীদের দিকেই, কারণ তিনি যে কাজ পছন্দ করেন তারা তা-ই করে যাচ্ছে। সৎপথের অনুসারীরা এ আশা যেন না করে যে, যারা ঈমান আনতে চায় না আল্লাহ প্রাকৃতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদেরকে ঈমান গ্রহণে বাধ্য করবেন। অথবা মানুষ ও জিন সম্প্রদায়ের সেসব শয়তানদেরকে জোরপূর্বক তাদের পথ থেকে সরিয়ে দেবেন, যারা নিজেদের সমস্ত শক্তি ও উপায়-উপকরণ সত্যের পথ রোধ করার জন্য ব্যবহার করছে। সত্যের অনুসারীদেরকে বাতিলপন্থীদের মুকাবিলা করতে হবে। মু‘জিযা, কারামত ও অলৌকিক ক্ষমতার জোরে যদি বাতিলকে নির্মূল ও হককে বিজয়ী করা আল্লাহর উদ্দেশ্য হতো, তাহলে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। আল্লাহ নিজেই দুনিয়ার সমস্ত শয়তানকে নির্মূল করে কুফর ও শিরকের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারতেন।