hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০৭

অধ্যায়- ৩ : আসহাবে কাহফের হিজরত

আল্লাহ তাদের ঘটনা বর্ণনা করেছেন :

اَمْ حَسِبْتَ اَنَّ اَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيْمِ كَانُوْا مِنْ اٰيَاتِنَا عَجَبًا

তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর? (সূরা কাহফ- ৯)

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَاَهُمْ بِالْحَقِّ

আমি তোমার নিকট তাদের বৃত্তামত্ম সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। (সূরা কাহফ- ১৩)

তারা ছিলেন কয়েকজন ঈমানদার যুবক :

اِنَّهُمْ فِتْيَةٌ اٰمَنُوْا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى

তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদেরকে সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম। (সূরা কাহফ- ১৩)

তাদের সংখ্যা নিয়ে লোকেরা মতভেদ করেছিল :

سَيَقُوْلُوْنَ ثَلَاثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْۚ وَيَقُوْلُوْنَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا ۢبِالْغَيْبِۚ وَيَقُوْلُوْنَ سَبْعَةٌ وَّثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْؕ قُلْ رَّبِّيْۤ اَعْلَمُ بِعِدَّتِهِمْ مَّا يَعْلَمُهُمْ اِلَّا قَلِيْلٌ فَلَا تُمَارِ فِيْهِمْ اِلَّا مِرَآءً ظَاهِرًا وَّلَا تَسْتَفْتِ فِيْهِمْ مِّنْهُمْ اَحَدًا

অচিরেই তারা বলবে, তারা ছিল তিনজন, তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর। আবার কেউ কেউ বলবে, তারা ছিল পাঁচজন, তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর- (মূলত) তারা অজানা বিষয়ে অনুমানের উপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বলবে, তারা ছিল সাতজন, তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলো, আমার প্রতিপালকই তাদের সংখ্যা ভালোভাবে জানেন; আর (প্রকৃতপক্ষে) তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে। সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করো না এবং এদের কাউকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করো না। (সূরা কাহফ- ২২)

তারা ছিল আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী :

وَرَبَطْنَا عَلٰى قُلُوْبِهِمْ اِذْ قَامُوْا فَقَالُوْا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ لَنْ نَّدْعُوَاْ مِنْ دُوْنِهٖۤ اِلٰهًا لَّقَدْ قُلْنَاۤ اِذًا شَطَطًا

আর আমি তাদের অন্তর দৃঢ় করে দিলাম। ফলে যখন তারা উঠে দাঁড়াল তখন বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনিই যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক। আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন ইলাহকে আহবান করব না। আর যদি আমরা এমনটি বলে থাকি, তবে তা হবে অতিশয় গর্হিত কাজ। (সূরা কাহফ- ১৪)

তাদের জাতি শিরকে লিপ্ত ছিল :

هٰۤؤُلَآءِ قَوْمُنَا اتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِهٖۤ اٰلِهَةًؕ لَوْلَا يَأْتُوْنَ عَلَيْهِمْ بِسُلْطَانٍ ۢبَيِّنٍؕ فَمَنْ اَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرٰى عَلَى اللهِ كَذِبًا

আমাদেরই এ সম্প্রদায় আল্লাহর পরিবর্তে অনেক ইলাহ্ গ্রহণ করেছে। তারা এ সমসত্ম ইলাহ্ সম্বন্ধে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে? (সূরা কাহফ- ১৫)

তারা আল্লাহর রহমত কামনা করে একটি গুহায় আশ্রয় নেয় :

اِذْ اَوَى الْفِتْيَةُ اِلَى الْكَهْفِ فَقَالُوْا رَبَّنَاۤ اٰتِنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً وَّهَيِّئْ لَنَا مِنْ اَمْرِنَا رَشَدًا

যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি নিজ হতে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করো এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করো। (সূরা কাহফ- ১০)

আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন :

وَاِذِ اعْتَزَلْتُمُوْهُمْ وَمَا يَعْبُدُوْنَ اِلَّا اللهَ فَأْوُوْاۤ اِلَى الْكَهْفِ يَنْشُرْ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِّنْ رَّحْمَتِهٖ وَيُهَيِّئْ لَكُمْ مِّنْ اَمْرِكُمْ مِّرْفَقًا

যখন তোমরা তাদের ও তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদাত করে তাদের হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, অতঃপর তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করলে তখন তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর দয়া বিসত্মার করলেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করলেন। (সূরা কাহফ- ১৬)

তারা নিদ্রাবস্থায় পার্শ্ব পরিবর্তন করত :

وَتَحْسَبُهُمْ اَيْقَاظًا وَّهُمْ رُقُوْدٌۗ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِيْنِ وَذَاتَ الشِّمَالِ

তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিল নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডান দিকে ও বাম দিকে। (সূরা কাহফ- ১৮)

সূর্যের কিরণ তাদের গর্তে প্রবেশ করত না :

وَتَرَى الشَّمْسَ اِذَا طَلَعَتْ تَّزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِيْنِ وَاِذَا غَرَبَتْ تَّقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ وَهُمْ فِيْ فَجْوَةٍ مِّنْهُؕ ذٰلِكَ مِنْ اٰيَاتِ اللهِؕ مَنْ يَّهْدِ اللهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِۚ وَمَنْ يُّضْلِلْ فَلَنْ تَجِدَ لَهٗ وَلِيًّا مُّرْشِدًا

তুমি দেখতে পেতে- তারা গুহার প্রশসত্ম চত্বরে অবস্থিত, সূর্য উদয়কালে (তার কিরণ) তাদের গুহার দক্ষিণ পার্শ্বে হেলে যায় এবং অসত্মকালে (তার কিরণ) বাম পার্শ্ব দিয়ে তাদেরকে অতিক্রম করে, এগুলো আল্লাহর নিদর্শন। আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন, সে সৎপথপ্রাপ্ত হয় এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনো তার কোন পথপ্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবে না। (সূরা কাহফ- ১৭)

একটি কুকুর তাদেরকে পাহারা দিত :

وَكَلْبُهُمْ بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيْدِ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَّلَمُلِئْتَ مِنْهُمْ رُعْبًا

আর তাদের কুকুর সম্মুখের পা দু’টি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে তাকিয়ে ছিল, তাদেরকে দেখলে তুমি পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রসত্ম হয়ে পড়তে। (সূরা কাহফ- ১৮)

পরে আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেছেন :

ثُمَّ بَعَثْنَاهُمْ لِنَعْلَمَ اَيُّ الْحِزْبَيْنِ اَحْصٰى لِمَا لَبِثُوْاۤ اَمَدًا

তারপর আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম এ কথা জানানোর জন্য যে, দু’দলের মধ্যে কারা তাদের অবস্থানকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে। (সূরা কাহফ- ১২)

কতদিন গর্তে ছিল তা তারা বুঝতে পারেনি :

وَكَذٰلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَآءَلُوْا بَيْنَهُمْؕ قَالَ قَآئِلٌ مِّنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْؕ قَالُوْا لَبِثْنَا يَوْمًا اَوْ بَعْضَ يَوْمٍؕ قَالُوْا رَبُّكُمْ اَعْلَمُ بِمَا لَبِثْتُمْ

এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে নেয়। অতঃপর তাদের একজন বলল, তোমরা এখানে কত কাল অবস্থান করেছ? কেউ কেউ বলল, আমরা অবস্থান করেছি এক দিন অথবা এক দিনের কিছু অংশ। কেউ বলল, তোমরা কত কাল অবস্থান করেছ তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন। (সূরা কাহফ- ১৯)

তাদের গোহায় অবস্থানকাল :

فَضَرَبْنَا عَلٰۤى اٰذَانِهِمْ فِى الْكَهْفِ سِنِيْنَ عَدَدًا

অতঃপর আমি তাদেরকে গুহায় কয়েক বৎসর ঘুমমত্ম অবস্থায় রাখলাম। (সূরা কাহফ- ১১)

قُلِ اللهُ اَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوْاۚ لَهٗ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِؕ اَبْصِرْ بِهٖ وَاَسْمِعْؕ مَا لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهٖ مِنْ وَّلِيٍّؗ وَلَا يُشْرِكُ فِيْ حُكْمِهٖۤ اَحَدًا

বলো, তারা কত কাল ছিল তা আল্লাহই ভালো জানেন, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই। তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্রোতা! তিনি ব্যতীত তাদের অন্য কোন অভিভাবক নেই। আর তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না। (সূরা কাহফ- ২৬)

وَلَبِثُوْا فِيْ كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِيْنَ وَازْدَادُوْا تِسْعًا

তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশ’ বৎসর এবং আরো নয় বৎসর। (সূরা কাহফ- ২৫)

আসহাবে কাহফের কাহিনীর শিক্ষা :

কুরআন যে তাওহীদের দাওয়াত দিচ্ছে আসহাবে কাহফের লোকেরা ছিলেন এরই প্রবক্তা। তাদের অবস্থা মক্কার মজলুম মুসলিমদের অবস্থা থেকে ভিন্নতর ছিল না। তাদের জাতির মনোভাব ও ভূমিকা মক্কার কুরাইশ বংশীয় কাফিরদের মতোই ছিল। এ কাহিনী থেকে ঈমানদারদেরকে এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, যদি কাফিররা সীমাহীন ক্ষমতা ও আধিপত্যের অধিকারী হয়ে থাকে এবং তাদের যুলুম-নির্যাতনের ফলে মুমিনরা সীমাহীন কষ্ট পায়, তবুও বাতিলের সামনে মাথা নত করা উচিত নয়। বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে আনুসাঙ্গিকভাবে এ কথাও বলা হয়েছে যে, আসহাবে কাহাফের কাহিনী আখিরাত বিশ্বাসের নির্ভুলতার একটি প্রমাণ। যেভাবে আল্লাহ তা‘আলা আসহাবে কাহফকে সুদীর্ঘকাল মৃত্যু নিদ্রায় বিভোর করে রাখার পর আবার জীবিত করে তুললেন- ঠিক তেমনিভাবে তিনি কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একত্রে জীবিত করতেও সক্ষম।