hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৬

অধ্যায়- ২৪ : কুরআন থেকে বিমুখ হওয়ার পরিণতি

শয়তান এসব লোকের সঙ্গী হয়ে যায় :

وَمَنْ يَّعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمٰنِ نُقَيِّضْ لَهٗ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهٗ قَرِيْنٌ

যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে যায়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি; অতঃপর সে-ই হয় তার সহচর। (সূরা যুখরুফ- ৩৬)

তাদের তুলনা গাধার সাথে :

فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِيْنَ ‐ - كَاَنَّهُمْ حُمُرٌ مُّسْتَنْفِرَةٌ ‐ - فَرَّتْ مِنْ قَسْوَرَةٍ

তাদের কী হলো যে, তারা উপদেশবাণী (কুরআন) হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তারা যেন পলায়নপর গাধা, যা সিংহের সম্মুখ হতে পলায়ন করে। (সূরা মুদ্দাসসির, ৪৯-৫১)

তারা কিয়ামতের দিন বিপদে পড়বে :

وَقَدْ اٰتَيْنَاكَ مِنْ لَّدُنَّا ذِكْرًا – - مَنْ اَعْرَضَ عَنْهُ فَاِنَّهٗ يَحْمِلُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وِزْرًا

আমার নিকট হতে আমি তোমাকে উপদেশ দান করেছি। যে এটা হতে বিমুখ হবে, সে কিয়ামতের দিন পাপের বোঝা বহন করবে। (সূরা ত্বা-হা , ৯৯, ১০০)

তাদের হাশর হবে অন্ধ অবস্থায় :

وَمَنْ اَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِيْ فَاِنَّ لَهٗ مَعِيْشَةً ضَنْكًا وَّنَحْشُرُهٗ يَوْمَ الْقِيَامَةِ اَعْمٰى ‐ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِۤيْ اَعْمٰى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيْرًا ‐ قَالَ كَذٰلِكَ اَتَتْكَ اٰيَاتُنَا فَنَسِيْتَهَاۚ وَكَذٰلِكَ الْيَوْمَ تُنْسٰى ‐ وَكَذٰلِكَ نَجْزِيْ مَنْ اَسْرَفَ وَلَمْ يُؤْمِنْ ۢبِاٰيَاتِ رَبِّهٖؕ وَلَعَذَابُ الْاٰخِرَةِ اَشَدُّ وَاَبْقٰى

যে আমার স্মরণ (কুরআন) হতে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার জীবন-যাপন সংকুচিত হয়ে যাবে। আর আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠাব। অতঃপর সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালে? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। তিনি বলবেন, এভাবেই আমার আয়াতসমূহ তোমার নিকট এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে; সুতরাং আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো। আর এভাবেই আমি তাকে প্রতিফল দেই, যে বাড়াবাড়ি করে ও তার প্রতিপালকের নিদর্শনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না। আর পরকালের শাসিত্ম আরো কঠিন ও অধিক স্থায়ী। (সূরা ত্বা-হা, ১২৪-১২৭)

ব্যাখ্যা : আল্লাহর অসীম ক্ষমতা বলে তারা আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য এবং নিজেদের দুষ্কৃতির ফলাফল দেখতে পাবে; কিন্তু অন্যান্য দিক থেকে তাদের অবস্থা হবে এমন অন্ধের মতো, যে নিজের চলার পথ দেখতে পায় না, যার হাতে লাঠিও নেই এবং হাতড়ে চলার ক্ষমতাও নেই। ফলে সে প্রতি পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না যে, সে কোন দিকে যাবে এবং নিজের প্রয়োজন কীভাবে পূর্ণ করবে। তখন আল্লাহ বলবেন, ‘‘যেভাবে তুমি আমার আয়াতগুলো ভুলে গিয়েছিলে ঠিক তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হয়েছে।’’ অর্থাৎ তুমি কোথায় কোথায় হোঁচট খাচ্ছ অথবা আঘাত পাচ্ছ আজ তার কোন পরোয়াই করা হবে না। কেউ তোমার হাত ধরবে না, তোমার কোন প্রয়োজনও পূর্ণ করবে না। ফলে তুমি চরম উপেক্ষা ও অবজ্ঞা অতল তলে নিক্ষিপ্ত হবে। আর এসব লোক দুনিয়াতেও মানসিক স্থিরতা লাভ করতে পারবে না। কোটিপতি হলে মানসিক অস্থিরতায় ভুগবে। সম্রাট হলেও সে মানসিক অতৃপ্তিতে আবদ্ধ থাকবে। কখনো তারা এসব মানসিক রোগ থেকে মুক্ত হতে পারবে না। তাদের পার্থিব সাফল্যগুলো হবে হাজারো ধরনের অবৈধ কলাকৌশল অবলম্বনের ফল। এগুলোর কারণে নিজের বিবেকসহ প্রত্যেকটি জিনিসের সাথে তার লাগাতার দ্বন্দ্ব চলতে থাকবে। যার ফলে সে কখনো প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারবে না।

এখানে প্রথমত বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এ উপদেশবাণী অর্থাৎ কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং তার বিধান ও পথনির্দেশনা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে, সে নিজের ক্ষতি সাধন করবে। এর ফলে মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁকে প্রেরণকারী আল্লাহর কোন ক্ষতি হবে না। তার এ নির্বুদ্ধিতা হবে তার নিজের সাথে শত্রুতার নামান্তর। দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির কাছে কুরআনের এ নসীহত পৌঁছার পরও এটাকে গ্রহণ করতে ছলনার আশ্রয় নিয়েছে, সে আখিরাতে শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। অত্র আয়াতের শব্দাবলি ব্যাপক অর্থ প্রকাশক। এটা কোন দেশ, জাতি বা সময়ের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত নয়। যতদিন দুনিয়ায় এ কুরআন থাকবে এবং যেখানে যার কাছেই এটা পৌঁছে যাবে সেখানে তার জন্য দু’টি পথই খোলা থাকবে। তৃতীয় কোন পথ সেখানে থাকবে না। হয় একে মেনে নিয়ে এর আনুগত্য করতে হবে। অন্যথায় একে অস্বীকার করে এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রথম পথ অবলম্বনকারীদের পরিণতি হবে জান্নাত এবং দ্বিতীয় পথ অবলম্বনকারীদের পরিণতি হবে জাহান্নাম।

তারা কোন মুক্তির পথ খুঁজে পাবে না :

وَمَنْ كَانَ فِيْ هٰذِهٖۤ اَعْمٰى فَهُوَ فِى الْاٰخِرَةِ اَعْمٰى وَاَضَلُّ سَبِيْلًا

আর যে ব্যক্তি এখানে অন্ধ, সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭২)

কুরআনবিমুখ লোকদের প্রতি আল্লাহর প্রশ্ন :

وَهٰذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ اَنْزَلْنَاهُ اَفَاَنْتُمْ لَهٗ مُنْكِرُوْنَ

এটা কল্যাণময় উপদেশ; আমি এটা অবতীর্ণ করেছি। তবুও কি তোমরা এটাকে অস্বীকার করবে? (সূরা আম্বিয়া- ৫০)

فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِيْنَ

তাদের কী হলো যে, তারা উপদেশবাণী (কুরআন) হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়? (সূরা মুদ্দাসসির- ৪৯)

اَفَبِهٰذَا الْحَدِيْثِ اَنْتُمْ مُّدْهِنُوْنَ

তারপরও কি তোমরা এ হাদীসকে (কুরআনকে) সাধারণ মনে করবে? (সূরা ওয়াক্বিয়া- ৮১)

اَفَمِنْ هٰذَا الْحَدِيْثِ تَعْجَبُوْنَ – - وَتَضْحَكُوْنَ وَلَا تَبْكُوْنَ – - وَاَنْتُمْ سَامِدُوْنَ

তোমরা কি এর (কুরআনের) কথায় বিস্ময়বোধ করছ? হাসছ অথচ কাঁদছ না? তোমরা তো বড়ই উদাসীন। (সূরা নাজম, ৫৯-৬১)

فَبِاَيِّ حَدِيْثٍ ۢبَعْدَهٗ يُؤْمِنُوْنَ

এরপর তারা আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে? (সূরা মুরসালাত- ৫০)

وَاِذَا قُرِئَ عَلَيْهِمُ الْقُرْاٰنُ لَا يَسْجُدُوْنَ – فَمَا لَهُمْ لَا يُؤْمِنُوْنَ

সুতরাং তাদের কী হলো যে, তারা ঈমান আনয়ন করে না এবং তাদের নিকট কুরআন পাঠ করা হলে, তারা সিজদা করে না? (সূরা ইনশিক্বাক- ২০, ২১)

فَاَيْنَ تَذْهَبُوْنَ ‐ وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّجِيْمٍ

এটা (কুরআন) কোন অভিশপ্ত শয়তানের কথা নয়। সুতরাং তোমরা কোথায় চলেছ? (সূরা তাকভীর- ২৫, ২৬)

ব্যাখ্যা : তাদের এ মনোভাবের কারণ কী? তারা কি এ বাণী বুঝেনি, তাই একে মানছে না? না, মূলত কারণ এটা নয়। কুরআন কোন দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা হয়নি। কিতাবটিতে এমনসব বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটানো হয়নি, যা মানুষের বোধগম্য নয়। তারা এর প্রত্যেকটি কথা বুঝেও না বুঝার অভিনয় করে। কারণ তারা একে মানতে চায় না।