১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৩৫
অধ্যায়- ৫ : সাহাবায়ে কেরামের গুণাবলি
তারা ঈমানকে ভালোবাসতেন :
وَلٰكِنَّ اللهَ حَبَّبَ اِلَيْكُمُ الْاِيْمَانَ وَزَيَّنَهٗ فِيْ قُلُوْبِكُمْ
কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা দান করেছেন এবং তিনি তোমাদের অন্তরে তা সুশোভিত করে দিয়েছেন। (সূরা হুজুরাত- ৭)
তারা পাপকে ঘৃণা করতেন :
وَكَرَّهَ اِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوْقَ وَالْعِصْيَانَؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الرَّاشِدُوْنَ
তিনি তোমাদের অন্তরে কুফরী, ফাসিকী ও নাফরমানির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; আর এমন লোকেরাই সুপথে আছে। (সূরা হুজুরাত- ৭)
দুনিয়ার কাজ তাদেরকে ইবাদাত থেকে বিরত রাখতে পারত না :
رِجَالٌ لَّا تُلْهِيْهِمْ تِجَارَةٌ وَّلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَاِقَامِ الصَّلَاةِ وَاِيْتَآءِ الزَّكَاةِ
তারা এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না। (সূরা নূর- ৩৭)
তারা কিয়ামতের বিপদকে খুবই ভয় করতেন :
يَخَافُوْنَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيْهِ الْقُلُوْبُ وَالْاَبْصَارُ
তারা ভয় করে সেদিনকে যেদিন অনেক অমত্মর ও দৃষ্টিসমূহ বিপর্যসত্ম হয়ে পড়বে। (সূরা নূর- ৩৭)
আহত হওয়ার পরও তারা নবীর সাথে জিহাদ করতেন :
اَ لَّذِيْنَ اسْتَجَابُوْا لِلّٰهِ وَالرَّسُوْلِ مِنْ ۢبَعْدِ مَاۤ اَصَابَهُمُ الْقَرْحُؕ لِلَّذِيْنَ اَحْسَنُوْا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا اَجْرٌ عَظِيْمٌ
যারা আঘাত পাওয়ার পরও আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশে সাড়া দিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে ও তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা আলে ইমরান- ১৭২)
বিরোধীদের হুমকি শুনলে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেয়ে যেত :
اَ لَّذِيْنَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ اِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ اِيْمَانًا وَّقَالُوْا حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ
লোকেরা যাদেরকে বলেছিল, নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে লোকজন সমবেত হয়েছে, অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো। কিন্তু এতে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং মঙ্গলময় কর্মবিধায়ক। (সূরা আলে ইমরান- ১৭৩)
তারা মুমিনদের ব্যাপারে নরম এবং কাফিরদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন :
مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِؕ وَالَّذِيْنَ مَعَهٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُمْ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর যারা তাঁর সাথে আছে (অর্থাৎ সাহাবীরা) তারা কাফিরদের উপর কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে কোমল। (সূরা ফাতহ- ২৯)
ব্যাখ্যা : কাফিরদের ব্যাপারে সাহাবীদের কঠোর হওয়ার অর্থ এ নয় যে, তারা কাফিরদের সাথে কঠোর আচরণ করতেন; বরং এর অর্থ হচ্ছে, তারা তাদের ঈমানের পরিপক্কতা, নীতির দৃঢ়তা, চারিত্রিক শক্তি এবং ঈমানী দূরদর্শিতার মাধ্যমে কাফিরদের মুকাবিলায় মজবুত পাথরের মতো অনমনীয় ও আপোষহীন ছিলেন। তারা অস্থিরমনা ছিলেন না যে, কাফিররা তাদেরকে যেদিকে ইচ্ছা ঘুরিয়ে দিতে পারবে। যে মহৎ উদ্দেশ্যে তারা জীবন বাজি রেখে মুহাম্মাদ ﷺ কে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত হয়েছেন তা থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা কাফিরদের ছিল না। তাদের মধ্যে যতটুকু কঠোরতা ছিল তা কাফিরদের জন্য, ঈমানদারদের জন্য নয়। ঈমানদারদের কাছে তারা বিনম্র, স্নেহশীল ও দুঃখের সাথি ছিলেন। নীতি ও উদ্দেশ্যের ঐক্য তাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল।
তারা রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন :
اِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ اَنَّكَ تَقُوْمُ اَدْنٰى مِنْ ثُلُثَيِ اللَّيْلِ وَنِصْفَهٗ وَثُلُثَهٗ وَطَآئِفَةٌ مِّنَ الَّذِيْنَ مَعَكَ
নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক জানেন যে, তুমি জাগরণ কর কখনো রাত্রির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ, কখনো অর্ধাংশ এবং কখনো এক তৃতীয়াংশ। আর তোমার সাথে যারা আছে তাদের একটি দলও (এ আমল করে)। (সূরা মুয্যাম্মিল- ২০)
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদাত করতেন :
تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَّبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللهِ وَرِضْوَانًا
যখন তুমি তাদেরকে দেখবে, তখন তাদেরকে রুকূ-সিজদা অবস্থায় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি তালাশে মগ্ন পাবে। (সূরা ফাতহ- ২৯)
তাদের চেহারাই তাদের পরিচয় বহন করত :
سِيْمَاهُمْ فِيْ وُجُوْهِهِمْ مِّنْ اَثَرِ السُّجُوْدِ
তাদের চেহারায় সিজদার আলামত রয়েছে, যা থেকে তাদেরকে (আলাদাভাবে) চেনা যায়। (সূরা ফাতহ- ২৯)
ব্যাখ্যা : সিজদা করতে করতে কোন কোন নামাযীর কপালে যে দাগ পড়ে এখানে তা বুঝানো হয়নি। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহভীরুতা, হৃদয়ের বিশালতা, মর্যাদা এবং মহৎ চরিত্রের প্রভাব, যা আল্লাহর সামনে মাথা নত করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই কোন মানুষের চেহারায় ফুটে ওঠে। মানুষের চেহারা একটি খোলা গ্রন্থের মতো- যার পাতায় মানুষের মনোজগতের অবস্থা সহজেই অবলোকন করা যেতে পারে। একজন অহংকারীর চেহারা একজন বিনম্র ও কোমল স্বভাবের মানুষের চেহারা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন দুশ্চরিত্রবান ব্যক্তির চেহারা একজন সচ্চরিত্রবান ব্যক্তির চেহারা থেকে আলাদা থাকে। আল্লাহ তা‘আলার এ উক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুহাম্মাদ ﷺ এর এসব সঙ্গী-সাথি এমন যে, যে কেউ তাদের চেহারা দেখা মাত্রই অনুধাবন করতে পারবে যে, তারা সৃষ্টির সেরা। কারণ তাদের চেহারায় আল্লাহভীরুতার দীপ্তি সমুজ্জল।
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করেছেন :
لِلْفُقَرَآءِ الْمُهَاجِرِيْنَ الَّذِيْنَ اُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ وَاَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللهِ وَرِضْوَانًا وَّيَنْصُرُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ
(এ সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই তো সত্যবাদী। (সূরা হাশর- ৮)
তারা একে অপরকে খুবই ভালোবাসতেন :
وَالَّذِيْنَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْاِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ اِلَيْهِمْ
যারা তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্ব থেকেই এ নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করে এসেছে এবং ঈমান এনেছে, তারা তাদের নিকট যারা হিজরত করে এসেছিল তাদেরকে ভালোবাসত। (সূরা হাশর- ৯)
ব্যাখ্যা : আরববাসীদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিলেন আল্লাহ তা‘আলা তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, স্নেহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। অথচ তারা বিভিন্ন গোত্র থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে শত শত বছর থেকে শত্রুতা চলে আসছিল। বিশেষ করে আওস ও খাযরাজ গোত্রের ব্যাপারে এটা ছিল সুস্পষ্ট। মাত্র দুই থেকে তিন বছরে তাদের মধ্যে এমন গভীর বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে, যা তাদেরকে একটি সীসা ঢালা প্রাচীরে পরিণত করে।
তারা নিজেদের প্রয়োজন বাদ দিয়ে অপরের প্রয়োজন মেটাতেন :
وَيُؤْثِرُوْنَ عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
আর তারা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। (সূরা হাশর- ৯)
শানে নুযূল : আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা এক আনসারী লোকের বাড়িতে এক অতিথি রাত কাটালেন। তখন তাঁর কাছে তাঁর ও সন্তানদের জন্য অল্প কিছু খাদ্য ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, বাচ্চাদের ঘুমিয়ে দাও, আলোটা বন্ধ করে দাও এবং তোমার নিকট যা কিছু আছে তাই অতিথির জন্য পেশ করো। রাবী বলেন, এ প্রেক্ষাপটে উক্ত আয়াতটি নাযিল হয়। (সহীহ মুসলিম, হা/৫২৫৫)
তাদের বিকাশ লাভের একটি দৃষ্টান্ত :
وَمَثَلُهُمْ فِى الْاِنْجِيْلِۚ كَزَرْعٍ اَخْرَجَ شَطْاَهٗ فَاٰزَرَهٗ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوٰى عَلٰى سُوْقِهٖ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيْظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ
আর ইঞ্জিলে তাদের উদাহরণ এভাবে দেয়া হয়েছে যে, যেন একটি বীজ বপন করা হলো, যা থেকে প্রথমে অঙ্কুর বের হলো, তারপর তা মজবুত হলো, তারপর পুষ্ট হলো, এরপর নিজের কান্ডের উপর খাড়া হয়ে গেল। (এ দৃশ্য) চাষীকে বিস্মিত করে দেয়, যাতে কাফিরদের (অন্তরে) জ্বালা সৃষ্টি হয়। (সূরা ফাতহ- ২৯)
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন:
رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। (সূরা তাওবা- ১০০)
তাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে :
وَاَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الْاَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَاۤ اَبَدًاؕ ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ
তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়ে গেছে এবং সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এটাই মহাসাফল্য। (সূরা তাওবা- ১০০)
وَلٰكِنَّ اللهَ حَبَّبَ اِلَيْكُمُ الْاِيْمَانَ وَزَيَّنَهٗ فِيْ قُلُوْبِكُمْ
কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা দান করেছেন এবং তিনি তোমাদের অন্তরে তা সুশোভিত করে দিয়েছেন। (সূরা হুজুরাত- ৭)
তারা পাপকে ঘৃণা করতেন :
وَكَرَّهَ اِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوْقَ وَالْعِصْيَانَؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الرَّاشِدُوْنَ
তিনি তোমাদের অন্তরে কুফরী, ফাসিকী ও নাফরমানির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; আর এমন লোকেরাই সুপথে আছে। (সূরা হুজুরাত- ৭)
দুনিয়ার কাজ তাদেরকে ইবাদাত থেকে বিরত রাখতে পারত না :
رِجَالٌ لَّا تُلْهِيْهِمْ تِجَارَةٌ وَّلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَاِقَامِ الصَّلَاةِ وَاِيْتَآءِ الزَّكَاةِ
তারা এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না। (সূরা নূর- ৩৭)
তারা কিয়ামতের বিপদকে খুবই ভয় করতেন :
يَخَافُوْنَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيْهِ الْقُلُوْبُ وَالْاَبْصَارُ
তারা ভয় করে সেদিনকে যেদিন অনেক অমত্মর ও দৃষ্টিসমূহ বিপর্যসত্ম হয়ে পড়বে। (সূরা নূর- ৩৭)
আহত হওয়ার পরও তারা নবীর সাথে জিহাদ করতেন :
اَ لَّذِيْنَ اسْتَجَابُوْا لِلّٰهِ وَالرَّسُوْلِ مِنْ ۢبَعْدِ مَاۤ اَصَابَهُمُ الْقَرْحُؕ لِلَّذِيْنَ اَحْسَنُوْا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا اَجْرٌ عَظِيْمٌ
যারা আঘাত পাওয়ার পরও আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশে সাড়া দিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে ও তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা আলে ইমরান- ১৭২)
বিরোধীদের হুমকি শুনলে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেয়ে যেত :
اَ لَّذِيْنَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ اِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ اِيْمَانًا وَّقَالُوْا حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ
লোকেরা যাদেরকে বলেছিল, নিশ্চয় তোমাদের বিরুদ্ধে লোকজন সমবেত হয়েছে, অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো। কিন্তু এতে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং মঙ্গলময় কর্মবিধায়ক। (সূরা আলে ইমরান- ১৭৩)
তারা মুমিনদের ব্যাপারে নরম এবং কাফিরদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন :
مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِؕ وَالَّذِيْنَ مَعَهٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُمْ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর যারা তাঁর সাথে আছে (অর্থাৎ সাহাবীরা) তারা কাফিরদের উপর কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে কোমল। (সূরা ফাতহ- ২৯)
ব্যাখ্যা : কাফিরদের ব্যাপারে সাহাবীদের কঠোর হওয়ার অর্থ এ নয় যে, তারা কাফিরদের সাথে কঠোর আচরণ করতেন; বরং এর অর্থ হচ্ছে, তারা তাদের ঈমানের পরিপক্কতা, নীতির দৃঢ়তা, চারিত্রিক শক্তি এবং ঈমানী দূরদর্শিতার মাধ্যমে কাফিরদের মুকাবিলায় মজবুত পাথরের মতো অনমনীয় ও আপোষহীন ছিলেন। তারা অস্থিরমনা ছিলেন না যে, কাফিররা তাদেরকে যেদিকে ইচ্ছা ঘুরিয়ে দিতে পারবে। যে মহৎ উদ্দেশ্যে তারা জীবন বাজি রেখে মুহাম্মাদ ﷺ কে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত হয়েছেন তা থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা কাফিরদের ছিল না। তাদের মধ্যে যতটুকু কঠোরতা ছিল তা কাফিরদের জন্য, ঈমানদারদের জন্য নয়। ঈমানদারদের কাছে তারা বিনম্র, স্নেহশীল ও দুঃখের সাথি ছিলেন। নীতি ও উদ্দেশ্যের ঐক্য তাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল।
তারা রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন :
اِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ اَنَّكَ تَقُوْمُ اَدْنٰى مِنْ ثُلُثَيِ اللَّيْلِ وَنِصْفَهٗ وَثُلُثَهٗ وَطَآئِفَةٌ مِّنَ الَّذِيْنَ مَعَكَ
নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক জানেন যে, তুমি জাগরণ কর কখনো রাত্রির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ, কখনো অর্ধাংশ এবং কখনো এক তৃতীয়াংশ। আর তোমার সাথে যারা আছে তাদের একটি দলও (এ আমল করে)। (সূরা মুয্যাম্মিল- ২০)
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদাত করতেন :
تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَّبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللهِ وَرِضْوَانًا
যখন তুমি তাদেরকে দেখবে, তখন তাদেরকে রুকূ-সিজদা অবস্থায় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি তালাশে মগ্ন পাবে। (সূরা ফাতহ- ২৯)
তাদের চেহারাই তাদের পরিচয় বহন করত :
سِيْمَاهُمْ فِيْ وُجُوْهِهِمْ مِّنْ اَثَرِ السُّجُوْدِ
তাদের চেহারায় সিজদার আলামত রয়েছে, যা থেকে তাদেরকে (আলাদাভাবে) চেনা যায়। (সূরা ফাতহ- ২৯)
ব্যাখ্যা : সিজদা করতে করতে কোন কোন নামাযীর কপালে যে দাগ পড়ে এখানে তা বুঝানো হয়নি। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহভীরুতা, হৃদয়ের বিশালতা, মর্যাদা এবং মহৎ চরিত্রের প্রভাব, যা আল্লাহর সামনে মাথা নত করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই কোন মানুষের চেহারায় ফুটে ওঠে। মানুষের চেহারা একটি খোলা গ্রন্থের মতো- যার পাতায় মানুষের মনোজগতের অবস্থা সহজেই অবলোকন করা যেতে পারে। একজন অহংকারীর চেহারা একজন বিনম্র ও কোমল স্বভাবের মানুষের চেহারা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন দুশ্চরিত্রবান ব্যক্তির চেহারা একজন সচ্চরিত্রবান ব্যক্তির চেহারা থেকে আলাদা থাকে। আল্লাহ তা‘আলার এ উক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুহাম্মাদ ﷺ এর এসব সঙ্গী-সাথি এমন যে, যে কেউ তাদের চেহারা দেখা মাত্রই অনুধাবন করতে পারবে যে, তারা সৃষ্টির সেরা। কারণ তাদের চেহারায় আল্লাহভীরুতার দীপ্তি সমুজ্জল।
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করেছেন :
لِلْفُقَرَآءِ الْمُهَاجِرِيْنَ الَّذِيْنَ اُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ وَاَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللهِ وَرِضْوَانًا وَّيَنْصُرُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ
(এ সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই তো সত্যবাদী। (সূরা হাশর- ৮)
তারা একে অপরকে খুবই ভালোবাসতেন :
وَالَّذِيْنَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْاِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ اِلَيْهِمْ
যারা তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্ব থেকেই এ নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করে এসেছে এবং ঈমান এনেছে, তারা তাদের নিকট যারা হিজরত করে এসেছিল তাদেরকে ভালোবাসত। (সূরা হাশর- ৯)
ব্যাখ্যা : আরববাসীদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিলেন আল্লাহ তা‘আলা তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, স্নেহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। অথচ তারা বিভিন্ন গোত্র থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে শত শত বছর থেকে শত্রুতা চলে আসছিল। বিশেষ করে আওস ও খাযরাজ গোত্রের ব্যাপারে এটা ছিল সুস্পষ্ট। মাত্র দুই থেকে তিন বছরে তাদের মধ্যে এমন গভীর বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে, যা তাদেরকে একটি সীসা ঢালা প্রাচীরে পরিণত করে।
তারা নিজেদের প্রয়োজন বাদ দিয়ে অপরের প্রয়োজন মেটাতেন :
وَيُؤْثِرُوْنَ عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
আর তারা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। (সূরা হাশর- ৯)
শানে নুযূল : আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা এক আনসারী লোকের বাড়িতে এক অতিথি রাত কাটালেন। তখন তাঁর কাছে তাঁর ও সন্তানদের জন্য অল্প কিছু খাদ্য ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, বাচ্চাদের ঘুমিয়ে দাও, আলোটা বন্ধ করে দাও এবং তোমার নিকট যা কিছু আছে তাই অতিথির জন্য পেশ করো। রাবী বলেন, এ প্রেক্ষাপটে উক্ত আয়াতটি নাযিল হয়। (সহীহ মুসলিম, হা/৫২৫৫)
তাদের বিকাশ লাভের একটি দৃষ্টান্ত :
وَمَثَلُهُمْ فِى الْاِنْجِيْلِۚ كَزَرْعٍ اَخْرَجَ شَطْاَهٗ فَاٰزَرَهٗ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوٰى عَلٰى سُوْقِهٖ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيْظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ
আর ইঞ্জিলে তাদের উদাহরণ এভাবে দেয়া হয়েছে যে, যেন একটি বীজ বপন করা হলো, যা থেকে প্রথমে অঙ্কুর বের হলো, তারপর তা মজবুত হলো, তারপর পুষ্ট হলো, এরপর নিজের কান্ডের উপর খাড়া হয়ে গেল। (এ দৃশ্য) চাষীকে বিস্মিত করে দেয়, যাতে কাফিরদের (অন্তরে) জ্বালা সৃষ্টি হয়। (সূরা ফাতহ- ২৯)
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন:
رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। (সূরা তাওবা- ১০০)
তাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে :
وَاَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الْاَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَاۤ اَبَدًاؕ ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ
তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়ে গেছে এবং সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এটাই মহাসাফল্য। (সূরা তাওবা- ১০০)