১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২২
অধ্যায়- ১৭ : আল্লাহর আইন ও বিধান মেনে চলা মানুষের দায়িত্ব
আল্লাহই একমাত্র বিধানদাতা :
وَهُوَ اللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَؕ لَهُ الْحَمْدُ فِى الْاُوْلٰى وَالْاٰخِرَةِ ؗ وَلَهُ الْحُكْمُ وَاِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ
তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই। দুনিয়া ও আখিরাতে সমস্ত প্রশংসা তাঁরই, বিধান তাঁরই; আর তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা ক্বাসাস- ৭০)
اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ يَقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِيْنَ
কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহরই। তিনি সত্য বিবৃত করেন; আর ফায়সালাকারীদের মধ্যে তিনিই সর্বর্র্র্শ্রেষ্ঠ। (সূরা আন‘আম- ৫৭)
যিনি স্রষ্টা তিনিই হবেন আইনদাতা :
اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْاَ مْرُؕ تَبَارَكَ اللهُ رَبُّ الْعَالَمِيْنَ
জেনে রেখো, সৃজন ও আদেশ তাঁরই; যিনি মহিমাময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ। (সূরা আ‘রাফ- ৫৪)
ব্যাখ্যা : যখন কোন ব্যক্তি এ কথা মেনে নেয় যে, একমাত্র আল্লাহই পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা, তখন অনিবার্যভাবে তাকে এ কথাও মেনে নিতে হবে যে, ইলাহ্ ও রবও একমাত্র আল্লাহই। ইবাদাত ও আনুগত্যের হকদারও একমাত্র তিনিই। একমাত্র তাঁরই পবিত্রতা ও প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা করা যাবে না। নিজের সৃষ্টির জন্য আইন প্রণেতা ও শাসক তিনি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। একজন হবেন স্রষ্টা, অন্যজন হবে মা‘বুদ, তৃতীয়জন হবে সংকট নিরসনকারী, চতুর্থজন ক্ষমতাসীন ও আনুগত্যের অধিকারী- এটা সম্পূর্ণ বুদ্ধিবিরোধী কথা। এ কথা সে-ই বলতে পারে, যে মূর্খতার সাগরে ডুবে আছে। কোন জ্ঞানী ব্যক্তি এসব কথা মেনে নিতে পারে না। হালাল ও হারাম নির্ধারণ করার অধিকারও একমাত্র আললাহ ছাড়া অন্য কারো নেই। কেননা সকল প্রকার আইন প্রণয়ন করার অধিকার একমাত্র তাঁরই। সুতরাং অন্য যে ব্যক্তিই বৈধতা ও অবৈধতার ফায়সালা করার সাহস দেখাবে, সে-ই সীমালঙ্ঘন করবে।
বান্দার কল্যাণ কিসের মধ্যে নিহিত তা আল্লাহই ভালো জানেন :
وَالَّذِيْ اَوْحَيْنَاۤ اِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِؕ اِنَّ اللهَ بِعِبَادِهٖ لَخَبِيْرٌۢ بَصِيْرٌ
আর যে কিতাব আমি ওহীরূপে আপনার প্রতি নাযিল করেছি তা সম্পূর্ণ সত্য, তা পূর্ববর্তী কিতাবের সমর্থক। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে সবকিছু জানেন ও দেখেন। (সূরা ফাতির- ৩১)
ব্যাখ্যা : বান্দার কল্যাণ কিসের মধ্যে রয়েছে এবং তার পথপ্রদর্শনের উপযোগী নীতি কোনটি- এখানে এ সত্যগুলো সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়াই হচ্ছে আল্লাহর এ গুণাবলি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য। এ বিষয়গুলো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না। কারণ বান্দার প্রকৃতি ও চাহিদা একমাত্র তিনিই জানেন এবং তার প্রকৃত প্রয়োজন ও কল্যাণের প্রতি একমাত্র তিনিই দৃষ্টি রাখেন। বান্দা নিজেকে ততবেশি জানে না, যতবেশি তার স্রষ্টা তাকে জানেন। তাই সত্য একমাত্র সেটিই হতে পারে, যা তিনি ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় আইন জারি করেন :
اِنَّ اللهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيْدُ
নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন। (সূরা মায়েদা- ১)
ব্যাখ্যা : আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী একচ্ছত্র শাসক। তিনি নিজের ইচ্ছানুযায়ী যে কোন হুকুম দেয়ার পূর্ণ ইখতিয়ার রাখেন। তাঁর বিধানের ব্যাপারে আপত্তি জানানোর অধিকার কোন মানুষের নেই। তাঁর সমস্ত বিধান জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যুক্তি, ন্যায়নীতি ও কল্যাণের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত।
اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ اَمَرَ اَلَّا تَعْبُدُوْاۤ اِلَّاۤ اِيَّاهُؕ ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ
বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করতে। এটাই শাশ্বত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়। (সূরা ইউসুফ- ৪০)
সবকিছুর উপরই আল্লাহর আদেশ জারি হয় :
اَللهُ الَّذِيْ خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَّمِنَ الْاَ رْضِ مِثْلَهُنَّؕ يَتَنَزَّلُ الْاَ مْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوْاۤ اَنَّ اللهَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ وَّاَنَّ اللهَ قَدْ اَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا
আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্তাকাশ এবং তাদের অনুরূপ অসংখ্য জমিন। উভয়ের মাঝখানে তার নির্দেশ জারি হয়; যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। (সূরা তালাক্ব- ১২)
সবকিছুই আল্লাহর আদেশের অনুগত :
وَلَهٗ مَنْ فِى السَّمَاوَاتِ وَ الْاَ رْضِ كُلٌّ لَّهٗ قَانِتُوْنَ
আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর; আর সকলেই তাঁর অনুগত। (সূরা রূম- ২৬)
আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করার কেউ নেই :
وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهٖؕ وَهُوَ سَرِيْعُ الْحِسَابِ
আল্লাহ আদেশ করেন, তাঁর আদেশ উল্টে দেয়ার কেউ নেই। আর তিনি হিসাব গ্রহণে খুবই তৎপর। (সূরা রা‘দ- ৪১)
আল্লাহই সকল ক্ষমতার উৎস :
اَنَّ الْقُوَّةَ لِلّٰهِ جَمِيْعًا
সমুদয় শক্তি আল্লাহরই। (সূরা বাক্বারা- ১৬৫)
اِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيْزُ
নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী। (সূরা হুদ- ৬৬)
مَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهٖؕ اِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيْزٌ
তারা আল্লাহকে যথার্থ মর্যাদা দিতে পারেনি, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমতাবান ও মহাপরাক্রমশালী। (সূরা হজ্জ- ৭৪)
ব্যাখ্যা : عَزِيْزٌ (‘আযীয) শব্দের অর্থ পরাক্রমশালী বা সবার উপর বিজয়ী। কারো ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেন তা নিশ্চিতভাবেই কার্যকর হয়। তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউ বিজয়ী হতে পারে না। কিংবা কেউ তাঁর পাকড়াও থেকে বাঁচতেও পারে না। তাই তাঁর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেউ যদি সফলতার আশা করে, তাহলে তা তার নিজের বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়।
আল্লাহর বিধান কেউ না মানলে সে নিজেরই ক্ষতি করবে :
وَمَنْ يَّتَوَلَّ فَاِنَّ اللهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيْدُ
আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয় (সে জেনে রাখুক যে) নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত। (সূরা হাদীদ- ২৪)
وَلِلّٰهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْاَ رْضِ وَاللهُ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। (সূরা আলে ইমরান- ১৮৯)
اِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ اللهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْؕ وَلَا يَرْضٰى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَۚ وَاِنْ تَشْكُرُوْا يَرْضَهُ لَكُمْ
যদি তোমরা কুফরী কর, তবে (জেনে রেখো) আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না। (পক্ষান্তরে) যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে (জেনে রেখো) তিনি তোমাদের জন্য এটাই পছন্দ করেন। (সূরা যুমার- ৭)
ব্যাখ্যা : মানুষের কুফরীর কারণে আল্লাহর প্রভুত্বের সামান্যতম ক্ষতিও হতে পারে না। মানুষ তাকে মানলেও তিনি আল্লাহ, না মানলেও তিনি আল্লাহ; তিনি সর্বদা আছেন এবং থাকবেন। নিজের ক্ষমতায় তাঁর কর্তৃত্ব চলছে। মানুষের মানা বা না মানাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। আর তিনি কারো প্রতি মুখাপেক্ষীও নন। তিনি নিজের কোন স্বার্থের জন্য নয়, বরং বান্দার স্বার্থের জন্যই কুফরী করা পছন্দ করেন না। কেননা কুফরী তাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর। এখানে আল্লাহ তা‘আলা এ কথাটিই বলছেন যে, তোমরা কুফরী করতে চাইলে করো। আমি জোর করে তাতে বাধা দিয়ে তোমাদেরকে মুমিন বানাব না। তবে তোমরা বান্দা হয়ে স্রষ্টার সাথে কুফরী করবে- তা আমার পছন্দ নয়। কারণ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর।
আল্লাহর দাসত্ব করাই মানুষের মূল কাজ :
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ
আমি জিন ও মানুষকে এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে। (সূরা যারিয়াত- ৫৬)
ব্যাখ্যা : আল্লাহ জিন ও মানুষের দাসত্বের মুখাপেক্ষী নন যে, তারা দাসত্ব করলে তাঁর প্রভুত্ব চলবে আর মুখ ফিরিয়ে নিলে তিনি আর আল্লাহ থাকতে পারবেন না। বরং তাঁর দাসত্ব করা মানুষের প্রকৃতির দাবি। এ উদ্দেশ্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে :
وَاعْتَصِمُوْا بِاللهِؕ هُوَ مَوْلَاكُمْۚ فَنِعْمَ الْمَوْلٰى وَنِعْمَ النَّصِيْرُ
আল্লাহকে অবলম্বন করো, তিনিই তোমাদের অভিভাবক। অভিভাবক হিসেবে তিনি কতই না উত্তম এবং তিনি কতই না উত্তম সাহায্যকারী! (সূরা হজ্জ- ৭৮)
ব্যাখ্যা : আল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে অর্থাৎ সকল প্রকার পথনির্দেশনা ও জীবন-যাপনের বিধান তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে, তাঁরই আনুগত্য করতে হবে, তাঁকেই ভয় করতে হবে, আশা-আকাঙ্ক্ষার সকল বিষয় তাঁর সাথেই জড়িত করতে হবে, সাহায্যের জন্য তাঁর কাছেই হাত পাততে হবে এবং তাঁর উপরই নির্ভরশীল হয়ে জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে ।
وَهُوَ اللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَؕ لَهُ الْحَمْدُ فِى الْاُوْلٰى وَالْاٰخِرَةِ ؗ وَلَهُ الْحُكْمُ وَاِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ
তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই। দুনিয়া ও আখিরাতে সমস্ত প্রশংসা তাঁরই, বিধান তাঁরই; আর তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা ক্বাসাস- ৭০)
اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ يَقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِيْنَ
কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহরই। তিনি সত্য বিবৃত করেন; আর ফায়সালাকারীদের মধ্যে তিনিই সর্বর্র্র্শ্রেষ্ঠ। (সূরা আন‘আম- ৫৭)
যিনি স্রষ্টা তিনিই হবেন আইনদাতা :
اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْاَ مْرُؕ تَبَارَكَ اللهُ رَبُّ الْعَالَمِيْنَ
জেনে রেখো, সৃজন ও আদেশ তাঁরই; যিনি মহিমাময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ। (সূরা আ‘রাফ- ৫৪)
ব্যাখ্যা : যখন কোন ব্যক্তি এ কথা মেনে নেয় যে, একমাত্র আল্লাহই পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা, তখন অনিবার্যভাবে তাকে এ কথাও মেনে নিতে হবে যে, ইলাহ্ ও রবও একমাত্র আল্লাহই। ইবাদাত ও আনুগত্যের হকদারও একমাত্র তিনিই। একমাত্র তাঁরই পবিত্রতা ও প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা করা যাবে না। নিজের সৃষ্টির জন্য আইন প্রণেতা ও শাসক তিনি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। একজন হবেন স্রষ্টা, অন্যজন হবে মা‘বুদ, তৃতীয়জন হবে সংকট নিরসনকারী, চতুর্থজন ক্ষমতাসীন ও আনুগত্যের অধিকারী- এটা সম্পূর্ণ বুদ্ধিবিরোধী কথা। এ কথা সে-ই বলতে পারে, যে মূর্খতার সাগরে ডুবে আছে। কোন জ্ঞানী ব্যক্তি এসব কথা মেনে নিতে পারে না। হালাল ও হারাম নির্ধারণ করার অধিকারও একমাত্র আললাহ ছাড়া অন্য কারো নেই। কেননা সকল প্রকার আইন প্রণয়ন করার অধিকার একমাত্র তাঁরই। সুতরাং অন্য যে ব্যক্তিই বৈধতা ও অবৈধতার ফায়সালা করার সাহস দেখাবে, সে-ই সীমালঙ্ঘন করবে।
বান্দার কল্যাণ কিসের মধ্যে নিহিত তা আল্লাহই ভালো জানেন :
وَالَّذِيْ اَوْحَيْنَاۤ اِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِؕ اِنَّ اللهَ بِعِبَادِهٖ لَخَبِيْرٌۢ بَصِيْرٌ
আর যে কিতাব আমি ওহীরূপে আপনার প্রতি নাযিল করেছি তা সম্পূর্ণ সত্য, তা পূর্ববর্তী কিতাবের সমর্থক। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে সবকিছু জানেন ও দেখেন। (সূরা ফাতির- ৩১)
ব্যাখ্যা : বান্দার কল্যাণ কিসের মধ্যে রয়েছে এবং তার পথপ্রদর্শনের উপযোগী নীতি কোনটি- এখানে এ সত্যগুলো সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়াই হচ্ছে আল্লাহর এ গুণাবলি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য। এ বিষয়গুলো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না। কারণ বান্দার প্রকৃতি ও চাহিদা একমাত্র তিনিই জানেন এবং তার প্রকৃত প্রয়োজন ও কল্যাণের প্রতি একমাত্র তিনিই দৃষ্টি রাখেন। বান্দা নিজেকে ততবেশি জানে না, যতবেশি তার স্রষ্টা তাকে জানেন। তাই সত্য একমাত্র সেটিই হতে পারে, যা তিনি ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় আইন জারি করেন :
اِنَّ اللهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيْدُ
নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন। (সূরা মায়েদা- ১)
ব্যাখ্যা : আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী একচ্ছত্র শাসক। তিনি নিজের ইচ্ছানুযায়ী যে কোন হুকুম দেয়ার পূর্ণ ইখতিয়ার রাখেন। তাঁর বিধানের ব্যাপারে আপত্তি জানানোর অধিকার কোন মানুষের নেই। তাঁর সমস্ত বিধান জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যুক্তি, ন্যায়নীতি ও কল্যাণের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত।
اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ اَمَرَ اَلَّا تَعْبُدُوْاۤ اِلَّاۤ اِيَّاهُؕ ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ
বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করতে। এটাই শাশ্বত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়। (সূরা ইউসুফ- ৪০)
সবকিছুর উপরই আল্লাহর আদেশ জারি হয় :
اَللهُ الَّذِيْ خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَّمِنَ الْاَ رْضِ مِثْلَهُنَّؕ يَتَنَزَّلُ الْاَ مْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوْاۤ اَنَّ اللهَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ وَّاَنَّ اللهَ قَدْ اَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا
আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্তাকাশ এবং তাদের অনুরূপ অসংখ্য জমিন। উভয়ের মাঝখানে তার নির্দেশ জারি হয়; যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। (সূরা তালাক্ব- ১২)
সবকিছুই আল্লাহর আদেশের অনুগত :
وَلَهٗ مَنْ فِى السَّمَاوَاتِ وَ الْاَ رْضِ كُلٌّ لَّهٗ قَانِتُوْنَ
আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর; আর সকলেই তাঁর অনুগত। (সূরা রূম- ২৬)
আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করার কেউ নেই :
وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهٖؕ وَهُوَ سَرِيْعُ الْحِسَابِ
আল্লাহ আদেশ করেন, তাঁর আদেশ উল্টে দেয়ার কেউ নেই। আর তিনি হিসাব গ্রহণে খুবই তৎপর। (সূরা রা‘দ- ৪১)
আল্লাহই সকল ক্ষমতার উৎস :
اَنَّ الْقُوَّةَ لِلّٰهِ جَمِيْعًا
সমুদয় শক্তি আল্লাহরই। (সূরা বাক্বারা- ১৬৫)
اِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيْزُ
নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী। (সূরা হুদ- ৬৬)
مَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهٖؕ اِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيْزٌ
তারা আল্লাহকে যথার্থ মর্যাদা দিতে পারেনি, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমতাবান ও মহাপরাক্রমশালী। (সূরা হজ্জ- ৭৪)
ব্যাখ্যা : عَزِيْزٌ (‘আযীয) শব্দের অর্থ পরাক্রমশালী বা সবার উপর বিজয়ী। কারো ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেন তা নিশ্চিতভাবেই কার্যকর হয়। তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউ বিজয়ী হতে পারে না। কিংবা কেউ তাঁর পাকড়াও থেকে বাঁচতেও পারে না। তাই তাঁর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেউ যদি সফলতার আশা করে, তাহলে তা তার নিজের বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়।
আল্লাহর বিধান কেউ না মানলে সে নিজেরই ক্ষতি করবে :
وَمَنْ يَّتَوَلَّ فَاِنَّ اللهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيْدُ
আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয় (সে জেনে রাখুক যে) নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত। (সূরা হাদীদ- ২৪)
وَلِلّٰهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْاَ رْضِ وَاللهُ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। (সূরা আলে ইমরান- ১৮৯)
اِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ اللهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْؕ وَلَا يَرْضٰى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَۚ وَاِنْ تَشْكُرُوْا يَرْضَهُ لَكُمْ
যদি তোমরা কুফরী কর, তবে (জেনে রেখো) আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না। (পক্ষান্তরে) যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে (জেনে রেখো) তিনি তোমাদের জন্য এটাই পছন্দ করেন। (সূরা যুমার- ৭)
ব্যাখ্যা : মানুষের কুফরীর কারণে আল্লাহর প্রভুত্বের সামান্যতম ক্ষতিও হতে পারে না। মানুষ তাকে মানলেও তিনি আল্লাহ, না মানলেও তিনি আল্লাহ; তিনি সর্বদা আছেন এবং থাকবেন। নিজের ক্ষমতায় তাঁর কর্তৃত্ব চলছে। মানুষের মানা বা না মানাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। আর তিনি কারো প্রতি মুখাপেক্ষীও নন। তিনি নিজের কোন স্বার্থের জন্য নয়, বরং বান্দার স্বার্থের জন্যই কুফরী করা পছন্দ করেন না। কেননা কুফরী তাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর। এখানে আল্লাহ তা‘আলা এ কথাটিই বলছেন যে, তোমরা কুফরী করতে চাইলে করো। আমি জোর করে তাতে বাধা দিয়ে তোমাদেরকে মুমিন বানাব না। তবে তোমরা বান্দা হয়ে স্রষ্টার সাথে কুফরী করবে- তা আমার পছন্দ নয়। কারণ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর।
আল্লাহর দাসত্ব করাই মানুষের মূল কাজ :
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ
আমি জিন ও মানুষকে এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে। (সূরা যারিয়াত- ৫৬)
ব্যাখ্যা : আল্লাহ জিন ও মানুষের দাসত্বের মুখাপেক্ষী নন যে, তারা দাসত্ব করলে তাঁর প্রভুত্ব চলবে আর মুখ ফিরিয়ে নিলে তিনি আর আল্লাহ থাকতে পারবেন না। বরং তাঁর দাসত্ব করা মানুষের প্রকৃতির দাবি। এ উদ্দেশ্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে :
وَاعْتَصِمُوْا بِاللهِؕ هُوَ مَوْلَاكُمْۚ فَنِعْمَ الْمَوْلٰى وَنِعْمَ النَّصِيْرُ
আল্লাহকে অবলম্বন করো, তিনিই তোমাদের অভিভাবক। অভিভাবক হিসেবে তিনি কতই না উত্তম এবং তিনি কতই না উত্তম সাহায্যকারী! (সূরা হজ্জ- ৭৮)
ব্যাখ্যা : আল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে অর্থাৎ সকল প্রকার পথনির্দেশনা ও জীবন-যাপনের বিধান তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে, তাঁরই আনুগত্য করতে হবে, তাঁকেই ভয় করতে হবে, আশা-আকাঙ্ক্ষার সকল বিষয় তাঁর সাথেই জড়িত করতে হবে, সাহায্যের জন্য তাঁর কাছেই হাত পাততে হবে এবং তাঁর উপরই নির্ভরশীল হয়ে জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে ।