১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৪১
অধ্যায়- ২ : ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি
ধনসম্পদের ভান্ডার আল্লাহর হাতে :
وَاِنْ مِّنْ شَيْءٍ اِلَّا عِنْدَنَا خَزَآئِنُهٗؗ وَمَا نُنَزِّلُهٗۤ اِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُوْمٍ
আমারই নিকট আছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার, আর আমি সেটা নির্দিষ্ট পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি। (সূরা হিজর- ২১)
তিনি যাকে ইচ্ছা কম বা বেশি দান করেন :
قُلْ اِنَّ رَبِّيْ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَّشَآءُ وَيَقْدِرُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ
বলো, আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা রিযিক বর্ধিত করেন অথবা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। (সূরা সাবা- ৩৬)
ধনসম্পদ দুনিয়ার সৌন্দর্য :
اَلْمَالُ وَالْبَنُوْنَ زِيْنَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
ধনসম্পদ ও সমত্মানসমত্মতি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য মাত্র। (সূরা কাহফ- ৪৬)
আল্লাহ ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করেন :
وَيُمْدِدْكُمْ بِاَمْوَالٍ وَّبَنِيْنَ
তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির দ্বারা। (সূরা নূহ- ১২)
ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ :
اِنَّمَاۤ اَمْوَالُكُمْ وَاَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌؕ وَاللهُ عِنْدَهٗۤ اَجْرٌ عَظِيْمٌ
নিশ্চয় তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (তোমাদের জন্য) পরীক্ষাস্বরূপ। আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপ্রতিদান। (সূরা তাগাবুন- ১৫)
ব্যাখ্যা : যে জিনিসটি সাধারণত মানুষের ঈমানী চেতনা ও আন্তরিকতায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং যে জন্য মানুষ প্রায়ই মুনাফিকী ও খেয়ানতে লিপ্ত হয় সেটি হচ্ছে, তার অর্থনৈতিক ও সন্তান-সন্ততির স্বার্থের প্রতি সীমাতিরিক্ত আগ্রহ। এ কারণে বলা হয়েছে, এ অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মোহে অন্ধ হয়ে তোমরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাও, অথচ এগুলো তো তোমাদের জন্য দুনিয়ার পরীক্ষাগৃহে পরীক্ষার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। যাকে তোমরা পুত্র বা কন্যা বলে জান, প্রকৃতপক্ষে সে তো পরীক্ষার একটি বিষয়। আর যাকে তোমরা সম্পত্তি বা ব্যবসা বলে থাক, তাও পরীক্ষার একটি বিষয় মাত্র। এ জিনিসগুলো তোমাদের হাতে সোপর্দ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা অধিকার ও দায়-দায়িত্বের প্রতি কতদূর লক্ষ্য রেখে কাজ কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যতটুকু অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন ততটুকু আদায় কর কি না- তা আল্লাহ দেখতে চান।
ভালো কাজে ব্যবহার না করলে সম্পদ ও সন্তান কোন উপকারে আসবে না :
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَّلَا بَنُوْنَ – اِلَّا مَنْ اَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ
সেদিন ধনসম্পদ ও সমত্মানসমত্মতি কোন কাজে আসবে না। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধ অমত্মঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে (কেবল সেই উপকৃত হবে)। (সূরা শু‘আরা- ৮৮, ৮৯)
وَمَاۤ اَمْوَالُكُمْ وَلَاۤ اَوْلَادُكُمْ بِالَّتِيْ تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفٰۤى اِلَّا مَنْ اٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًاؗ فَاُولٰٓئِكَ لَهُمْ جَزَآءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوْا وَهُمْ فِى الْغُرُفَاتِ اٰمِنُوْنَ
তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয়, যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দেবে; তবে যারা ঈমান আনয়ন করে ও সৎকর্ম করে, তারাই তাদের কর্মের জন্য বহুগুণ পুরস্কার পাবে; আর তারা প্রাসাদসমূহে নিরাপদে বসবাস করবে। (সূরা সাবা- ৩৭)
ব্যাখ্যা : বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে এবং দু’টিই সঠিক। (এক) ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করার মতো জিনিস নয়। বরং ঈমান ও সৎকাজ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। (দুই) ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি একমাত্র ঐ মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমে পরিণত হতে পারে, যে নিজের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং নিজের সন্তানকে কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে উত্তম শিক্ষা ও অনুশীলন দান করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপযুক্ত বান্দা হিসেবে গড়ে তুলার চেষ্টা করে।
আল্লাহর কাছে পার্থিব ধনসম্পদের কোন মূল্য নেই :
وَلَوْلَاۤ اَنْ يَّكُوْنَ النَّاسُ اُمَّةً وَّاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَنْ يَّكْفُرُ بِالرَّحْمٰنِ لِبُيُوْتِهِمْ سُقُفًا مِّنْ فِضَّةٍ وَّمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُوْنَ – وَلِبُيُوْتِهِمْ اَبْوَابًا وَّسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِئُوْنَ – وَزُخْرُفًاؕ وَاِنْ كُلُّ ذٰلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَاؕ وَالْاٰخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِيْنَ
(সত্য অস্বীকারে) মানুষ এক উম্মতে পরিণত হয়ে পড়বে- এ আশঙ্কা না থাকলে যারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে, তাদেরকে আমি তাদের গৃহের জন্য রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি বানিয়ে দিতাম, যার উপর দিয়ে তারা ওঠা (নামা) করত। আর তাদের গৃহের জন্য দরজা ও (বিশ্রামের জন্য) পালঙ্ক দিতাম, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসত। আর এসবই স্বর্ণনির্মিত (করে দিতে পারতাম)। কিন্তু এগুলো তো শুধু পার্থিব জীবনের ভোগ সম্ভার। আর মুত্তাক্বীদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে আখিরাত (এর কল্যাণ)। (সূরা যুখরুফ, ৩৩-৩৫)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ এই সোনা-রূপা যা কারো লাভ করা তোমাদের দৃষ্টিতে চরম নিয়ামতপ্রাপ্তি এবং সম্মান ও মর্যাদার চরম শিখরে আরোহণ করার নামান্তর, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে এতই নগণ্য যে, যদি সমস্ত মানুষের কুফরীর প্রতি ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা না থাকত, তাহলে তিনি প্রত্যেক কাফিরের বাড়িঘর সোনা-রূপা দিয়ে তৈরি করে দিতেন। আর এ নিকৃষ্ট বস্তুটি কখন থেকে মানুষের মর্যাদার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? এ সম্পদ তো এমনসব মানুষের কাছেও আছে, যাদের ঘৃণ্য কাজকর্মের বিষাক্ত ছোবলে গোটা সমাজ বিষাক্ত হয়ে পড়ে। আর একেই তোমরা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড বানিয়ে রেখেছ?
ধনসম্পদ মর্যাদার মাপকাঠি নয় :
اَيَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهٖ مِنْ مَّالٍ وَّبَنِيْنَ – نُسَارِعُ لَهُمْ فِى الْخَيْرَاتِ بَلْ لَّا يَشْعُرُوْنَ
তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্যস্বরূপ যে ধনসম্পদ ও সমত্মানসমত্মতি দান করি তা দ্বারা তাদের সকল প্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না। (সূরা মু’মিনূন- ৫৫, ৫৬)
ব্যাখ্যা : যখন কোন ব্যক্তি অধিক পরিমাণে নিয়ামত লাভ করতে থাকে তখন সে অজ্ঞতার কারণে মনে করে যে, সে তার যোগ্যতার ভিত্তিতেই তা লাভ করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের এ ধারণাটি সঠিক নয়। কেননা দুনিয়াতে তাদেরকে যা কিছুই দেয়া হচ্ছে তা মূলত তার যোগ্যতার বলে নয় বরং পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে বহু সৎকর্মশীল ব্যক্তি বিপদাপদে ডুবে আছে, অথচ তাদের সৎকর্মশীল হওয়া অস্বীকার করা যায় না। আবার বহু দুশ্চরিত্রের লোক আরামে জীবন কাটাচ্ছে। এখন কোন জ্ঞানবান ব্যক্তি একজনের বিপদাপদ এবং আরেকজনের আরাম-আয়েশকে এ কথার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না যে, আল্লাহ সৎকর্মশীল মানুষদের পছন্দ করেন না এবং দুষ্কর্মশীল মানুষদের পছন্দ করেন।
ধনসম্পদ আনন্দ বা সুখের প্রকৃত কারণ নয় :
لِكَيْلَا تَاْسَوْا عَلٰى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوْا بِمَاۤ اٰتَاكُمْؕ وَاللهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ
এটা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা হতাশ হয়ে না পড় এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য গৌরবে ফেটে না পড়। (কেননা) আল্লাহ ঔদ্ধত্য ও অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না । (সূরা হাদীদ- ২৩)
আল্লাহর প্রেমিকরা সম্পদের মোহে পড়ে না :
فَلَمَّا جَآءَ سُلَيْمَانَ قَالَ اَتُمِدُّوْنَنِ بِمَالٍ فَمَاۤ اٰتَانِيَ اللهُ خَيْرٌ مِّمَّاۤ اٰتَاكُمْ بَلْ اَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُوْنَ
অতঃপর যখন সে (দূত) সুলায়মানের নিকট আসল তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি আমাকে ধনসম্পদ দিয়ে সাহায্য করছ? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে উৎকৃষ্ট; অথচ তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে উৎফুল্ল বোধ কর। (সূরা নামল- ৩৬)
নবীগণ দ্বীন প্রচারের কাজে কোন সম্পদ চাইতেন না :
وَيَا قَوْمِ لَاۤ اَسْاَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًاؕ اِنْ اَجْرِيَ اِلَّا عَلَى اللهِ
হে আমার সম্প্রদায়! এটার (দাওয়াতের) উপর আমি তোমাদের নিকট কোন বিনিময়ও চাই না। আমার প্রতিদান তো আল্লাহর নিকট গচ্ছিত। (সূরা হুদ- ২৯)
আল্লাহ অসৎপন্থায় সম্পদ অর্জন করতে নিষেধ করেছেন :
وَلَا تَاْكُلُوْاۤ اَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوْا بِهَاۤ اِلَى الْحُكَّامِ لِتَاْكُلُوْا فَرِيْقًا مِّنْ اَمْوَالِ النَّاسِ بِالْاِثْمِ وَاَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ
তোমরা একে অপরের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকের নিকট এজন্য উপস্থাপন করো না, যাতে তোমরা জেনে-বুঝে অন্যায়ভাবে মানুষের মালের কিছু অংশ খেতে পার। (সূরা বাক্বারা- ১৮৮)
وَاِنْ مِّنْ شَيْءٍ اِلَّا عِنْدَنَا خَزَآئِنُهٗؗ وَمَا نُنَزِّلُهٗۤ اِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُوْمٍ
আমারই নিকট আছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার, আর আমি সেটা নির্দিষ্ট পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি। (সূরা হিজর- ২১)
তিনি যাকে ইচ্ছা কম বা বেশি দান করেন :
قُلْ اِنَّ رَبِّيْ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَّشَآءُ وَيَقْدِرُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ
বলো, আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা রিযিক বর্ধিত করেন অথবা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। (সূরা সাবা- ৩৬)
ধনসম্পদ দুনিয়ার সৌন্দর্য :
اَلْمَالُ وَالْبَنُوْنَ زِيْنَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
ধনসম্পদ ও সমত্মানসমত্মতি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য মাত্র। (সূরা কাহফ- ৪৬)
আল্লাহ ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করেন :
وَيُمْدِدْكُمْ بِاَمْوَالٍ وَّبَنِيْنَ
তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির দ্বারা। (সূরা নূহ- ১২)
ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ :
اِنَّمَاۤ اَمْوَالُكُمْ وَاَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌؕ وَاللهُ عِنْدَهٗۤ اَجْرٌ عَظِيْمٌ
নিশ্চয় তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (তোমাদের জন্য) পরীক্ষাস্বরূপ। আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপ্রতিদান। (সূরা তাগাবুন- ১৫)
ব্যাখ্যা : যে জিনিসটি সাধারণত মানুষের ঈমানী চেতনা ও আন্তরিকতায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং যে জন্য মানুষ প্রায়ই মুনাফিকী ও খেয়ানতে লিপ্ত হয় সেটি হচ্ছে, তার অর্থনৈতিক ও সন্তান-সন্ততির স্বার্থের প্রতি সীমাতিরিক্ত আগ্রহ। এ কারণে বলা হয়েছে, এ অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মোহে অন্ধ হয়ে তোমরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাও, অথচ এগুলো তো তোমাদের জন্য দুনিয়ার পরীক্ষাগৃহে পরীক্ষার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। যাকে তোমরা পুত্র বা কন্যা বলে জান, প্রকৃতপক্ষে সে তো পরীক্ষার একটি বিষয়। আর যাকে তোমরা সম্পত্তি বা ব্যবসা বলে থাক, তাও পরীক্ষার একটি বিষয় মাত্র। এ জিনিসগুলো তোমাদের হাতে সোপর্দ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা অধিকার ও দায়-দায়িত্বের প্রতি কতদূর লক্ষ্য রেখে কাজ কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যতটুকু অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন ততটুকু আদায় কর কি না- তা আল্লাহ দেখতে চান।
ভালো কাজে ব্যবহার না করলে সম্পদ ও সন্তান কোন উপকারে আসবে না :
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَّلَا بَنُوْنَ – اِلَّا مَنْ اَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ
সেদিন ধনসম্পদ ও সমত্মানসমত্মতি কোন কাজে আসবে না। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধ অমত্মঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে (কেবল সেই উপকৃত হবে)। (সূরা শু‘আরা- ৮৮, ৮৯)
وَمَاۤ اَمْوَالُكُمْ وَلَاۤ اَوْلَادُكُمْ بِالَّتِيْ تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفٰۤى اِلَّا مَنْ اٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًاؗ فَاُولٰٓئِكَ لَهُمْ جَزَآءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوْا وَهُمْ فِى الْغُرُفَاتِ اٰمِنُوْنَ
তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয়, যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দেবে; তবে যারা ঈমান আনয়ন করে ও সৎকর্ম করে, তারাই তাদের কর্মের জন্য বহুগুণ পুরস্কার পাবে; আর তারা প্রাসাদসমূহে নিরাপদে বসবাস করবে। (সূরা সাবা- ৩৭)
ব্যাখ্যা : বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে এবং দু’টিই সঠিক। (এক) ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করার মতো জিনিস নয়। বরং ঈমান ও সৎকাজ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। (দুই) ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি একমাত্র ঐ মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমে পরিণত হতে পারে, যে নিজের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং নিজের সন্তানকে কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে উত্তম শিক্ষা ও অনুশীলন দান করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপযুক্ত বান্দা হিসেবে গড়ে তুলার চেষ্টা করে।
আল্লাহর কাছে পার্থিব ধনসম্পদের কোন মূল্য নেই :
وَلَوْلَاۤ اَنْ يَّكُوْنَ النَّاسُ اُمَّةً وَّاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَنْ يَّكْفُرُ بِالرَّحْمٰنِ لِبُيُوْتِهِمْ سُقُفًا مِّنْ فِضَّةٍ وَّمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُوْنَ – وَلِبُيُوْتِهِمْ اَبْوَابًا وَّسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِئُوْنَ – وَزُخْرُفًاؕ وَاِنْ كُلُّ ذٰلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَاؕ وَالْاٰخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِيْنَ
(সত্য অস্বীকারে) মানুষ এক উম্মতে পরিণত হয়ে পড়বে- এ আশঙ্কা না থাকলে যারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে, তাদেরকে আমি তাদের গৃহের জন্য রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি বানিয়ে দিতাম, যার উপর দিয়ে তারা ওঠা (নামা) করত। আর তাদের গৃহের জন্য দরজা ও (বিশ্রামের জন্য) পালঙ্ক দিতাম, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসত। আর এসবই স্বর্ণনির্মিত (করে দিতে পারতাম)। কিন্তু এগুলো তো শুধু পার্থিব জীবনের ভোগ সম্ভার। আর মুত্তাক্বীদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে আখিরাত (এর কল্যাণ)। (সূরা যুখরুফ, ৩৩-৩৫)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ এই সোনা-রূপা যা কারো লাভ করা তোমাদের দৃষ্টিতে চরম নিয়ামতপ্রাপ্তি এবং সম্মান ও মর্যাদার চরম শিখরে আরোহণ করার নামান্তর, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে এতই নগণ্য যে, যদি সমস্ত মানুষের কুফরীর প্রতি ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা না থাকত, তাহলে তিনি প্রত্যেক কাফিরের বাড়িঘর সোনা-রূপা দিয়ে তৈরি করে দিতেন। আর এ নিকৃষ্ট বস্তুটি কখন থেকে মানুষের মর্যাদার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? এ সম্পদ তো এমনসব মানুষের কাছেও আছে, যাদের ঘৃণ্য কাজকর্মের বিষাক্ত ছোবলে গোটা সমাজ বিষাক্ত হয়ে পড়ে। আর একেই তোমরা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড বানিয়ে রেখেছ?
ধনসম্পদ মর্যাদার মাপকাঠি নয় :
اَيَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهٖ مِنْ مَّالٍ وَّبَنِيْنَ – نُسَارِعُ لَهُمْ فِى الْخَيْرَاتِ بَلْ لَّا يَشْعُرُوْنَ
তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্যস্বরূপ যে ধনসম্পদ ও সমত্মানসমত্মতি দান করি তা দ্বারা তাদের সকল প্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না। (সূরা মু’মিনূন- ৫৫, ৫৬)
ব্যাখ্যা : যখন কোন ব্যক্তি অধিক পরিমাণে নিয়ামত লাভ করতে থাকে তখন সে অজ্ঞতার কারণে মনে করে যে, সে তার যোগ্যতার ভিত্তিতেই তা লাভ করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের এ ধারণাটি সঠিক নয়। কেননা দুনিয়াতে তাদেরকে যা কিছুই দেয়া হচ্ছে তা মূলত তার যোগ্যতার বলে নয় বরং পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে বহু সৎকর্মশীল ব্যক্তি বিপদাপদে ডুবে আছে, অথচ তাদের সৎকর্মশীল হওয়া অস্বীকার করা যায় না। আবার বহু দুশ্চরিত্রের লোক আরামে জীবন কাটাচ্ছে। এখন কোন জ্ঞানবান ব্যক্তি একজনের বিপদাপদ এবং আরেকজনের আরাম-আয়েশকে এ কথার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না যে, আল্লাহ সৎকর্মশীল মানুষদের পছন্দ করেন না এবং দুষ্কর্মশীল মানুষদের পছন্দ করেন।
ধনসম্পদ আনন্দ বা সুখের প্রকৃত কারণ নয় :
لِكَيْلَا تَاْسَوْا عَلٰى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوْا بِمَاۤ اٰتَاكُمْؕ وَاللهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ
এটা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা হতাশ হয়ে না পড় এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য গৌরবে ফেটে না পড়। (কেননা) আল্লাহ ঔদ্ধত্য ও অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না । (সূরা হাদীদ- ২৩)
আল্লাহর প্রেমিকরা সম্পদের মোহে পড়ে না :
فَلَمَّا جَآءَ سُلَيْمَانَ قَالَ اَتُمِدُّوْنَنِ بِمَالٍ فَمَاۤ اٰتَانِيَ اللهُ خَيْرٌ مِّمَّاۤ اٰتَاكُمْ بَلْ اَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُوْنَ
অতঃপর যখন সে (দূত) সুলায়মানের নিকট আসল তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি আমাকে ধনসম্পদ দিয়ে সাহায্য করছ? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে উৎকৃষ্ট; অথচ তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে উৎফুল্ল বোধ কর। (সূরা নামল- ৩৬)
নবীগণ দ্বীন প্রচারের কাজে কোন সম্পদ চাইতেন না :
وَيَا قَوْمِ لَاۤ اَسْاَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًاؕ اِنْ اَجْرِيَ اِلَّا عَلَى اللهِ
হে আমার সম্প্রদায়! এটার (দাওয়াতের) উপর আমি তোমাদের নিকট কোন বিনিময়ও চাই না। আমার প্রতিদান তো আল্লাহর নিকট গচ্ছিত। (সূরা হুদ- ২৯)
আল্লাহ অসৎপন্থায় সম্পদ অর্জন করতে নিষেধ করেছেন :
وَلَا تَاْكُلُوْاۤ اَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوْا بِهَاۤ اِلَى الْحُكَّامِ لِتَاْكُلُوْا فَرِيْقًا مِّنْ اَمْوَالِ النَّاسِ بِالْاِثْمِ وَاَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ
তোমরা একে অপরের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকের নিকট এজন্য উপস্থাপন করো না, যাতে তোমরা জেনে-বুঝে অন্যায়ভাবে মানুষের মালের কিছু অংশ খেতে পার। (সূরা বাক্বারা- ১৮৮)