hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১০

অধ্যায়- ২ : জিহাদের উদ্দেশ্য

সকল মতবাদের উপর আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করা :

هُوَ الَّذِيْۤ اَرْسَلَ رَسُوْلَهٗ بِالْهُدٰى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهٗ عَلَى الدِّيْنِ كُلِّهٖ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ

তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়াত এবং সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে এটাকে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করা হয়; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। (সূরা সাফ- ৯)

يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِئُوْا نُوْرَ اللهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَى اللهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُوْنَ ‐ هُوَ الَّذِيْۤ اَرْسَلَ رَسُوْلَهٗ بِالْهُدٰى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهٗ عَلَى الدِّيْنِ كُلِّهٖ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর জ্যোতি (দ্বীনকে) নিভিয়ে দিতে চায়। (কিন্তু) কাফিররা অপ্রীতিকর মনে করলেও আল্লাহ তাঁর জ্যোতি পূর্ণ করা ব্যতীত অন্য কিছু চান না। আর মুশরিকরা অপ্রীতিকর মনে করলেও অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর (তাঁর দ্বীনকে) বিজয়ী করার জন্যই তিনি পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীনসহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। (সূরা তাওবা- ৩২, ৩৩)

পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে ভারসাম্য ঠিক রাখা :

وَلَوْلَا دَفْعُ اللهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الْاَرْضُ وَلٰكِنَّ اللهَ ذُوْ فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِيْنَ

যদি আল্লাহ মানুষের একদলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে অবশ্যই পৃথিবী বিশৃঙ্খলাপূর্ণ হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ বিশ্বজগতের উপর অনুগ্রহশীল। (সূরা বাক্বারা- ২৫১)

وَلَوْلَا دَفْعُ اللّٰهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَّصَلَوَاتٌ وَّمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيْهَا اسْمُ اللهِ كَثِيْرًاؕ وَلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَّنْصُرُهٗؕ اِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيْزٌ

আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিস্টান সংসারবিরাগীদের উপাসনালয়, গির্জা এবং ইয়াহুদিদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেসব স্থানে আল্লাহর নাম অধিক হারে স্মরণ করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাকেই সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী। (সূরা হজ্জ- ৪০)

ঈমানদারগণকে পরিশুদ্ধ করা এবং কাফিরদেকে ধ্বংস করা :

وَلِيُمَحِّصَ اللهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِيْنَ

এর মাধ্যমে মূলত তিনি ঈমানদার বান্দাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে এবং কাফিরদেরকে ধ্বংস করতে চান।

(সূরা আলে ইমরান- ১৪১)

কারা আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করে তা পরীক্ষা করা :

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللهُ الَّذِيْنَ جَاهَدُوْا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِيْنَ

তোমরা কি ধারণা করছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের মধ্য হতে যারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদের ব্যাপারে অবগত হবেন না এবং ধৈর্যশীলদের ব্যাপারেও জেনে নেবেন না। (সূরা আলে ইমরান- ১৪২)

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتّٰى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِيْنَ مِنْكُمْ وَالصَّابِرِيْنَ

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যাতে তোমাদের অবস্থা যাচাই করে নিতে পারি এবং দেখে নিতে পারি যে, তোমাদের মধ্যে কারা মুজাহিদ ও ধৈর্যশীল। (সূরা মুহাম্মাদ- ৩১)

খাঁটি মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য করা :

لِيَمِيْزَ اللّٰهُ الْخَبِيْثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَيَجْعَلَ الْخَبِيْثَ بَعْضَهٗ عَلٰى بَعْضٍ فَيَرْكُمَهٗ جَمِيْعًا فَيَجْعَلَهٗ فِيْ جَهَنَّمَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الْخَاسِرُوْنَ

যাতে করে আল্লাহ অপবিত্রকে পবিত্র থেকে পৃথক করতে পারেন। অতঃপর অপবিত্রগুলো একটিকে অপরটির উপর রেখে স্তুপাকার করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন- মূলত তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা আনফাল- ৩৭)

ব্যাখ্যা : ইসলাম ও কুফরের দ্বন্দ্ব একটি মাপকাঠিস্বরূপ। এর মাধ্যমে খাঁটি মুমিন ও নকল ঈমানের দাবীদারদের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি নিজেকে মনপ্রাণ দিয়ে ইসলামকে বিজয়ী করার সংগ্রামে নিয়োজিত করে এবং এ পথে যে কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হয় না, সে-ই প্রকৃত মুমিন। পক্ষান্তরে এ সংঘাতে যে ব্যক্তি ইসলামের বিজয়ের জন্য জান-মালের কুরবানী করতে কুণ্ঠিত হয়, তার কার্যকলাপ এ সত্যটিকে সুস্পষ্ট করে দেয় যে, তার অন্তরে ঈমান নেই।

হক ও বাতিল পন্থীদের চিহ্নিত করা :

وَلَوْ يَشَآءُ اللهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلٰكِنْ لِّيَبْلُوَاْ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ

আর যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো তোমাদের একজনকে অপরজনের দ্বারা পরীক্ষা করে নিতে চান। (সূরা মুহাম্মাদ- ৪)

বাতিলপন্থীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা :

كُلَّمَاۤ اَوْقَدُوْا نَارًا لِّلْحَرْبِ اَطْفَاَهَا اللّٰهُ وَيَسْعَوْنَ فِى الْاَرْضِ فَسَادًاؕ وَاللّٰهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِيْنَ

যখনি তারা যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছে, তখনি আল্লাহ তা নিভিয়ে দিয়েছেন। তারা এ জমিনে (বার বার) বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে; আর আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালোবাসেন না। (সূরা মায়েদা- ৬৪)

لِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُوْنَ

তিনি সত্যকে সত্য ও অসত্যকে অসত্য প্রতিপন্ন করে থাকেন, যদিও অপরাধীরা এটাকে অপছন্দ করে।

(সূরা আনফাল- ৮)

মুমিনদের হাতে শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত করা :

قَاتِلُوْهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِاَيْدِيْكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُوْرَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِيْنَ

তোমরা তাদের সাথে লড়াই করো, কেননা আল্লাহ তোমাদের হাত দ্বারাই তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং তাদেরকে অপমাণিত করবেন। আর তাদের উপর তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তিনি মুমিন সম্প্রদায়ের অন্তরকে প্রশান্ত করবেন। (সূরা তাওবা- ১৪)

ফিতনা দূর করে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করা :

وَقَاتِلُوْهُمْ حَتّٰى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَّيَكُوْنَ الدِّيْنُ كُلُّهٗ لِلّٰهِ فَاِنِ انْتَهَوْا فَاِنَّ اللهَ بِمَا يَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ

তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকো, যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি তারা বিরত হয়, তবে তারা যা করে আল্লাহ সে ব্যাপারে সম্যক দ্রষ্টা। (সূরা আনফাল- ৩৯)

وَقَاتِلُوْهُمْ حَتّٰى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَّيَكُوْنَ الدِّيْنُ لِلّٰهِ فَاِنِ انْتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ اِلَّا عَلَى الظَّالِمِيْنَ

ফিতনা দূরীভূত হয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করে যাও। অতঃপর যদি তারা বিরত হয়, তবে অত্যাচারী ছাড়া কারো উপর বাড়াবাড়ি করা যাবে না। (সূরা বাক্বারা- ১৯৩)

ব্যাখ্যা : সমাজে যখন মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন সমাজের এ অবস্থাকে ফিতনা বলা হয়। এ ফিতনার জায়গায় এমন একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করা ইসলামী জিহাদের লক্ষ্য, যেখানে মানুষ একমাত্র আল্লাহর বিধানের অনুগত থাকবে।

শত্রুদের পরাজিত করা :

فَاِذَا لَقِيْتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَضَرْبَ الرِّقَابِؕ حَتّٰۤى اِذَاۤ اَثْخَنْتُمُوْهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَۗ فَاِمَّا مَنًّا ۢبَعْدُ وَاِمَّا فِدَآءً حَتّٰى تَضَعَ الْحَرْبُ اَوْزَارَهَا

যখন তোমরা কাফিরদের মুখোমুখি হবে তখন (তাদের) গর্দানে আঘাত করবে। এমনকি যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে ফেলবে, তখন (বন্দীদেরকে) কষে বাঁধবে। অতঃপর হয় তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবে, নতুবা তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করবে। (তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে) যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে। (সূরা মুহাম্মাদ- ৪)

قَاتِلُوا الَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَلَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللّٰهُ وَرَسُوْلُهٗ وَلَا يَدِيْنُوْنَ دِيْنَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتَابَ حَتّٰى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَّدٍ وَّهُمْ صَاغِرُوْنَ

ইতোপূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি ঈমান আনয়ন করে না, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল যা কিছু হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন তা হারাম বলে স্বীকার করে না, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও; যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে জিয্ইয়া (কর) দিতে শুরু করে। (সূরা তাওবা- ২৯)