hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬১৫

অধ্যায়- ৪৩ : খায়বারের অভিযান

ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বদা ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত ইয়াহুদি সম্প্রদায় মদিনা হতে বিতাড়িত হয়ে সিরিয়া সীমামেত্মর নিকটবর্তী খায়বার নামক স্থানে বসতি স্থাপন করে। বনু নাযীর এবং বনু কুরাইযা গোত্রের ইয়াহুদিরা মুসলিমদেরকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে মুনাফিক দলের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং গাতফান ও অন্যান্য বেদুঈন গোত্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা খন্দকের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বেদুঈন গোত্রের সহযোগিতায় ৪০০০ সৈন্যের একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে। এ সংবাদ শুনে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে (৭ম হিজরী, মুহাররাম মাস) মুহাম্মাদ ﷺ ইয়াহুদিদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য ২০০ অশ্বারোহীসহ ১৬০০ মুসলিম যোদ্ধা নিয়ে খায়বারের দিকে যাত্রা করেন। অতঃপর তিনি সেখানে পৌঁছে তাদেরকে অবরোধ করেন। খায়বার অভিযান ছিল ইসলামের সর্বপ্রথম আক্রমণাত্মক অভিযান। খায়বার মুসলিমদের প্রথম বিজিত ভূখন্ড। এ যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অমুসলিমদেরকে জিম্মী করা হয়। খায়বার যুদ্ধে ইয়াহুদি বীর মোরাহহাবসহ ৯২ জন ইয়াহুদি নিহত হয়। প্রচুর ধনসম্পদ ও অস্ত্র-শস্ত্র মুসলিমদের হস্তগত হয়। ঐতিহাসিক ইয়াকূবীর মতে, বিশ হাজারের শক্তিশালী ইয়াহুদি বাহিনী মাত্র ১৬০০ মুজাহিদদের আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে মদিনা রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে সন্ধির প্রস্তাব জানায়। খায়বার বিজয়ের ফলে ইয়াহুদিদের বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটে। ফলে তারা পরবর্তীতে মুসলিমদেরকে প্রকাশ্য হামলা করতে সাহস হারিয়ে ফেলে, কোরা উপত্যকার শস্য-শ্যামল তায়মা ও ফাদাক অঞ্চল মুসলিমদের অধিকারে আসে। ফাদাকের ভূমি মহানবী ﷺ এর পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য নির্ধারিত হয়। তাদের দুর্গসমূহে অনেক স্বর্ণ ও রৌপ্য পাওয়া যায়। কিন্তু মহানবী ﷺ সেগুলো হতে কোনকিছুই গ্রহণ না করে তাদের নিকট হতে কিছু পশু গ্রহণ করে তাদেরকে ছেড়ে দেন। মহানবী ﷺ এহেন বিশ্বাসঘাতক মারাত্মক শত্রুদেরকে পরাজিত করেও তাদের সাথে নিম্নলিখিত শর্তে সন্ধিতে আবদ্ধ হলেন-

১. তারা তাদের স্বধর্ম পূর্বের ন্যায় স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে। তাতে কোন বিধি-নিষেধ আনা হবে না।

২. তাদেরকে কোন প্রকার কর দিতে হবে না।

৩. তাদেরকে মুসলিমদের ন্যায় যুদ্ধক্ষেত্রে যোগদান করতে হবে না।

৪. উৎপন্ন ফসলের অর্ধেকাংশ রাজস্ব হিসেবে মদিনাতে পাঠাতে হবে।

৫. পূর্বের মতো সম্পূর্ণভাবে তাদের বাড়িঘর ও জমিজমা তাদের অধিকারে থাকবে।

হুদায়বিয়ার পরে এটা ছিল নগদ বিজয় :

فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوْا فَجَعَلَ مِنْ دُوْنِ ذٰلِكَ فَتْحًا قَرِيْبًا

তিনি ঐ কথা জানতেন, যা তোমরা জানতে না। তাই তিনি (স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগে) তোমাদেরকে এ নিকটবর্তী বিজয় দান করেছেন। (সূরা ফাতহ- ২৭)

এ বিজয়ে তারা প্রচুর গনিমত লাভ করে :

وَمَغَانِمَ كَثِيْرَةً يَّاْخُذُوْنَهَاؕ وَكَانَ اللهُ عَزِيْزًا حَكِيْمًا

তাদেরকে অনেক গনিমতের মাল দান করলেন, যা (শীঘ্রই) তারা লাভ করবে। আল্লাহ মহাশক্তিশালী ও সুকৌশলী। (সূরা ফাতহ- ১৯)

যারা হুদায়বিয়ায় যায়নি তারা এ থেকে বঞ্চিত হয় :

سَيَقُوْلُ الْمُخَلَّفُوْنَ اِذَا انْطَلَقْتُمْ اِلٰى مَغَانِمَ لِتَاْخُذُوْهَا ذَرُوْنَا نَتَّبِعْكُمْۚ يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّبَدِّلُوْا كَلَامَ اللهِؕ قُلْ لَّنْ تَتَّبِعُوْنَا كَذٰلِكُمْ قَالَ اللهُ مِنْ قَبْلُ فَسَيَقُوْلُوْنَ بَلْ تَحْسُدُوْنَنَاؕ بَلْ كَانُوْا لَا يَفْقَهُوْنَ اِلَّا قَلِيْلًا

যখন তোমরা গনিমতের মাল হাসিল করতে যাবে, তখন পেছনে পড়ে থাকা লোকেরা (বেদুঈনরা) অবশ্যই তোমাদেরকে বলবে, আমাদেরকেও তোমাদের সাথে যেতে দাও। তারা আল্লাহর বিধান বদলে দিতে চায়। তাদেরকে বলে দিন, তোমরা কখনো আমাদের সাথে যেতে পারবে না, আল্লাহ আগেই এ কথা বলে দিয়েছেন। তখন তারা বলবে, না; বরং তোমরাই আমাদের সাথে হিংসা করছ (যদিও হিংসার কোন কথা নয়), বরং এরা সঠিক কথা কমই বুঝে। (সূরা ফাতহ- ১৫)

তবে পরবর্তী জিহাদে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয় :

قُلْ لِّلْمُخَلَّفِيْنَ مِنَ الْاَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ اِلٰى قَوْمٍ اُولِيْ بَاْسٍ شَدِيْدٍ تُقَاتِلُوْنَهُمْ اَوْ يُسْلِمُوْنَۚ فَاِنْ تُطِيْعُوْا يُؤْتِكُمُ اللهُ اَجْرًا حَسَنًاۚ وَاِنْ تَتَوَلَّوْا كَمَا تَوَلَّيْتُمْ مِّنْ قَبْلُ يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا اَلِيْمًا

(হে রাসূল!) পেছনে থেকে যাওয়া আরবদেরকে বলে দিন, শীঘ্রই তোমাদেরকে এমনসব লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ডাকা হবে, যারা খুবই শক্তিশালী। তোমাদেরকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে অথবা তারা আত্মসমর্পণ করবে। তখন যদি তোমরা জিহাদের হুকুম পালন কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম বিনিময় দেবেন। আর যদি তোমরা আগের মতোই পেছনে পড়ে থাক, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে কষ্টদায়ক শাস্তি দান করবেন। (সূরা ফাতহ- ১৬)