hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫২

অধ্যায়- ৩ : ওহীর জ্ঞান গোপন রাখা যাবে না

আল্লাহর বিধান গোপন রাখলে অভিশাপ পড়বে :

اِنَّ الَّذِيْنَ يَكْتُمُوْنَ مَاۤ اَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدٰى مِنْ ۢ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِى الْكِتَابِ اُولٰٓئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُوْنَ

আমি যেসব উজ্জ্বল নিদর্শন ও হেদায়াত নাযিল করেছি সেগুলোকে কিতাবের মধ্যে মানুষের নিকট প্রকাশ করার পরও যারা ঐসব বিষয়গুলোকে গোপন করে, আল্লাহ তাদেরকে লানত করেন এবং লানতকারীগণও তাদেরকে লানত করে থাকে। (সূরা বাক্বারা- ১৫৯)

ব্যাখ্যা : ইয়াহুদি আলিমদের বড় অপরাধ ছিল এই যে, তারা আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান সর্বসাধারণের মাঝে প্রচার করার পরিবর্তে একটি সীমিত ধর্মীয় পেশাদার গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা ইয়াহুদি জনতাকেও এ জ্ঞানের স্পর্শ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। সাধারণত অজ্ঞতার কারণে জনগণ যখন ব্যাপকভাবে ভ্রষ্টতার শিকার হলো, তখন ইয়াহুদি আলিমসমাজ জনগণের চিন্তা ও কর্মের সংস্কার সাধনে নিয়োজিত হয়নি। বরং উল্টো জনগণের মধ্যে নিজেদের জনপ্রিয়তা অব্যাহত রাখার জন্য যে ভ্রষ্টতা ও শরীয়াত বিরোধী কর্ম জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত তাকে তারা নিজেদের কথা ও কাজের সাহায্যে অথবা নীরব সমর্থনের মাধ্যমে বৈধতার ছাড়পত্র দান করত। ফলে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হতো এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করত। এ কারণে মুসলিমদেরকে এ ধরনের প্রবণতা ও কর্মনীতি অবলম্বন না করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সমগ্র বিশ্ববাসীকে হেদায়াত করার গুরুদায়িত্ব যে উম্মতের উপর সোপর্দ করা হয়েছে, সে হেদায়াতকে কৃপণের ধনের মতো আগলে না রেখে বেশি করে সম্প্রসারিত করাই হচ্ছে আলিমগণের কর্তব্য।

ওহীর জ্ঞান গোপন রাখা বড় ধরনের যুলুম :

وَمَنْ اَظْلَمُ مِمَّنْ كَتَمَ شَهَادَةً عِنْدَهٗ مِنَ اللهِؕ وَمَا اللهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ

যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট হতে প্রাপ্ত সাক্ষ্য গোপন করছে, তার চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে হতে পারে? আর তোমরা যা করছ আল্লাহ তা হতে অমনোযোগী নন। (সূরা বাক্বারা- ১৪০)

আল্লাহ সত্যকে গোপন করতে নিষেধ করেছেন :

وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَاَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ

তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে বুঝে সত্যকে গোপন করো না। (সূরা বাক্বারা- ৪২)

সত্য গোপন করা ইয়াহুদিদের কাজ :

وَاِنَّ فَرِيْقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُوْنَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ

তাদের একদল জেনে বুঝে সত্যকে গোপন করেছে। (সূরা বাক্বারা- ১৪৬)

ব্যাখ্যা : সাধারণ লোকদের মধ্যে যত প্রকার কুসংস্কার প্রচলিত আছে এবং বাতিল রীতিনীতি ও অর্থহীন বিধি-নিষেধের যেসব নতুন নতুন শরীয়াত তৈরি হয়েছে- সেগুলোর জন্য দায়ী হচ্ছে সেই আলিমসমাজ, যাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান ছিল, কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছায়নি। তারপর অজ্ঞতার কারণে লোকদের মধ্যে যখন ভুল পদ্ধতির প্রচলন হতে থাকে তখনো তারা মুখ বন্ধ করে বসে থেকেছে এবং আল্লাহর কিতাবের বিধানের উপর আবরণ পড়ে থাকাটাই নিজেদের জন্য লাভজনক বলে মনে করেছে।

সত্য গোপনের জন্য আল্লাহ ইয়াহুদিদেরকে তিরস্কার করেছেন :

يَاۤ اَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَلْبِسُوْنَ الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوْنَ الْحَقَّ وَاَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ

হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করছ এবং সত্য গোপন করছ, অথচ তোমরা জান? (সূরা আলে ইমরান- ৭১)

কিতাবের শিক্ষা গোপন না করার জন্য আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছেন :

وَاِذْ اَخَذَ اللهُ مِيْثَاقَ الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهٗ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُوْنَهٗ فَنَبَذُوْهُ وَرَآءَ ظُهُوْرِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهٖ ثَمَنًا قَلِيْلًاؕ فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُوْنَ

আর যখন আল্লাহ কিতাবধারীদের থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, অবশ্যই তোমরা এটা লোকদের মধ্যে প্রকাশ করবে এবং (কোনকিছুই) গোপন করবে না। কিন্তু তারা এটাকে তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং অল্প মূল্যে বিক্রি করে দিল; অথচ তারা যা ক্রয় করেছিল তা খুবই নিকৃষ্টতর। (সূরা আলে ইমরান- ১৮৭)

পার্থিব স্বার্থে আল্লাহর বিধান গোপন রাখার ভয়াবহ পরিণতি :

اِنَّ الَّذِيْنَ يَكْتُمُوْنَ مَاۤ اَنْزَلَ اللهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُوْنَ بِهٖ ثَمَنًا قَلِيْلًا اُولٰٓئِكَ مَا يَأْكُلُوْنَ فِيْ بُطُوْنِهِمْ اِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيْهِمْۚ وَلَهُمْ عَذَابٌ اَلِيْمٌ ‐ اُولٰٓئِكَ الَّذِيْنَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدٰى وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِۚ فَمَاۤ اَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ

আল্লাহ কিতাবে যা নাযিল করেছেন যারা তা গোপন করে এবং অল্প মূল্যে বিক্রি করে দেয়, তারা নিজেদের পেটে আগুন ভর্তি করে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না; সুতরাং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তারাই সুপথের বিনিময়ে গোমরাহী এবং ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং কীভাবে তারা জাহান্নামের আযাব সহ্য করবে? (সূরা বাক্বারা- ১৭৪, ১৭৫)