১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪১৯
অধ্যায়- ২ : মেয়াদ শেষে প্রত্যেককেই ধ্বংস করা হয়েছে
প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে :
وَلِكُلِّ اُمَّةٍ اَجَلٌۚ فَاِذَا جَآءَ اَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُوْنَ سَاعَةً وَّلَا يَسْتَقْدِمُوْنَ
প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা মুহূর্তকাল সময়টুকুও দেরি করতে পারবে না এবং তাড়াহুড়াও করতে পারবে না। (সূরা আ‘রাফ- ৩৪)
সময় শেষে কেউই টিকে থাকতে পারেনি :
وَمَاۤ اَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ اِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَّعْلُوْمٌ – مَا تَسْبِقُ مِنْ اُمَّةٍ اَجَلَهَا وَمَا يَسْتَأْخِرُوْنَ
আমি যে কোন জনপদকে ধ্বংস করেছি তার জন্য ছিল একটি নির্দিষ্ট লিপিবদ্ধ কাল। কোন জাতি তার নির্দিষ্ট কালকে ত্বরান্বিত করতে পারে না এবং বিলম্বিতও করতে পারে না। (সূরা হিজর- ৪, ৫)
পরিশেষে তারা কেবল পরিতাপই করেছে :
قَالُوْا يَا وَيْلَنَاۤ اِنَّا كُنَّا ظَالِمِيْنَ – - فَمَا زَالَتْ تِّلْكَ دَعْوَاهُمْ حَتّٰى جَعَلْنَاهُمْ حَصِيْدًا خَامِدِيْنَ
তারা বলল, ‘হায় আমাদের দুর্ভোগ! নিশ্চয় আমরা ছিলাম যালিমদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তাদের এ আর্তনাদ চলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাদেরকে কর্তিত শস্য ও নিভে যাওয়া আগুনের মতো করে দিলাম (অর্থাৎ তাদেরকে গুরুত্বহীন করে দিলাম)। (সূরা আম্বিয়া- ১৪, ১৫)
فَمَا كَانَ دَعْوَاهُمْ اِذْ جَآءَهُمْ بَأْسُنَاۤ اِلَّاۤ اَنْ قَالُوْاۤ اِنَّا كُنَّا ظَالِمِيْنَ
অতঃপর যখন আমার শাস্তি তাদের উপর পতিত হয়েছিল, তখন তাদের কথা শুধু এটাই ছিল যে, নিশ্চয় আমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (সূরা আ‘রাফ- ৫)
ব্যাখ্যা : সংশোধনের সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর কারো সচেতন হওয়া এবং নিজের ভুল স্বীকার করা অর্থহীন। যে ব্যক্তি বা জাতি গাফলতিতে লিপ্ত ও ভোগের নেশায় মত্ত হয়ে স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দেয়া সুযোগ হারিয়ে বসে এবং আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করার পর যারা সচেতন হয় তাদের চেয়ে বড় মূর্খ আর কেউ নেই। আল্লাহ একবার কাউকে পাকড়াও করার পর তার আর মুক্তি লাভের কোন পথই থাকে না। মানবজাতির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা হাজার বার ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে মানুষ বার বার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে আসছে। সচেতন হওয়ার জন্য সে শেষ মুহূর্তেরই অপেক্ষা করতে থাকে, যখন আক্ষেপ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
তারা হঠাৎ করে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে :
وَكَمْ مِّنْ قَرْيَةٍ اَهْلَكْنَاهَا فَجَآءَهَا بَأْسُنَا بَيَاتًا اَوْ هُمْ قَآئِلُوْنَ
আমি কত জনপদকে ধ্বংস করেছি! আমার শাস্তি তাদের উপর পতিত হয়েছিল রাতে অথবা দ্বিপ্রহরে, যখন তারা বিশ্রামরত অবস্থায় ছিল। (সূরা আ‘রাফ- ৪)
তারা তাদের বাড়িঘরসহ ধ্বংস হয়েছে :
قَدْ مَكَرَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَاَتَى اللهُ بُنْيَانَهُمْ مِنَ الْقَوَاعِدِ فَخَرَّ عَلَيْهِمُ السَّقْفُ مِنْ فَوْقِهِمْ وَاَتَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُوْنَ
তাদের পূর্ববর্তীগণও চক্রান্ত করেছিল, ফলে আল্লাহ তাদের ইমারতের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন, এতে ইমারতের ছাদ তাদের উপর ধসে পড়ল। আর তাদের প্রতি এমন দিক হতে শাস্তি আসল, যা ছিল তাদের ধারণাতীত। (সূরা নাহল- ২৬)
তাদের ঘরবাড়ি জনশূণ্য হয়ে পড়ে থাকল :
فَكَاَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ اَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ فَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلٰى عُرُوْشِهَا وَبِئْرٍ مُّعَطَّلَةٍ وَّقَصْرٍ مَّشِيْدٍ
আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ, যেগুলোর বাসিন্দারা ছিল যালিম। এসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল এবং কত কূপ ও কত সুদৃঢ় প্রাসাদও পরিত্যক্ত হয়েছিল। (সূরা হজ্জ- ৪৫)
অনেক শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তারা ধ্বংস হয়েছে :
اَوَلَمْ يَسِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَيَنْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِيْنَ كَانُوْا مِنْ قَبْلِهِمْؕ كَانُوْا هُمْ اَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَّاٰثَارًا فِى الْاَرْضِ فَاَخَذَهُمُ اللهُ بِذُنُوْبِهِمْؕ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ وَّاقٍ
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে এবং কীর্তিতে প্রবল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলেন; আর তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য কেউ ছিল না।
(সূরা মু’মিন- ২১)
তাদের কোন সাহায্যকারী পাওয়া যায়নি :
وَكَاَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ هِيَ اَشَدُّ قُوَّةً مِّنْ قَرْيَتِكَ الَّتِيْۤ اَخْرَجَتْكَۚ اَهْلَكْنَاهُمْ فَلَا نَاصِرَ لَهُمْ
(হে রাসূল!) তারা আপনাকে আপনার যে এলাকা থেকে বের করে দিয়েছে এর চেয়ে শক্তিশালী কত এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। আমি তাদেরকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছি যে, তাদেরকে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। (সূরা মুহাম্মাদ- ১৩)
তাদের ধনসম্পদ কোন কাজে আসেনি :
اَفَلَمْ يَسِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَيَنْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْؕ كَانُوْاۤ اَكْثَرَ مِنْهُمْ وَاَشَدَّ قُوَّةً وَّاٰثَارًا فِى الْاَرْضِ فَمَاۤ اَغْنٰى عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি ও দেখেনি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারপরও তারা যা করত তা তাদের কোন কাজে আসেনি। (সূরা মু’মিন- ৮২)
তাদের ধ্বংসাবশেষ এখনো আছে :
وَعَادًا وَّثَمُوْدَاْ وَقَدْ تَّبَيَّنَ لَكُمْ مِّنْ مَّسَاكِنِهِمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ اَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيْلِ وَكَانُوْا مُسْتَبْصِرِيْنَ
আমি আদ ও সামূদ জাতিকে ধ্বংস করেছিলাম, তাদের বাড়িঘরই তোমাদের জন্য এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান তাদের কাজকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করে দিয়েছিল এবং তাদেরকে সৎপথ অবলম্বনে বাধা দিয়েছিল, যদিও তারা ছিল বিচক্ষণ। (সূরা আনকাবূত- ৩৮)
এভাবে যালিমদের শিকড় কেটে দেয়া হয়েছে :
فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْاؕ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
অতঃপর যালিম সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হলো; সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। (সূরা আন‘আম- ৪৫)
তাদের ধ্বংসের বিষয়টি কাহিনীতে পরিণত হয়েছে :
ثُمَّ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا تَتْرٰىؕ كُلَّ مَا جَآءَ اُمَّةً رَّسُوْلُهَا كَذَّبُوْهُ فَاَتْبَعْنَا بَعْضَهُمْ بَعْضًا وَّجَعَلْنَاهُمْ اَحَادِيْثَۚ فَبُعْدًا لِّقَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُوْنَ
অতঃপর আমি একের পর এক আমার রাসূল প্রেরণ করেছি। যখনই কোন জাতির নিকট তার রাসূল এসেছে তখনই তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে একের পর এক ধ্বংস করলাম এবং তাদেরকে কাহিনীর বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করে দিলাম। কাজেই যে জাতি ঈমান আনয়ন করে না, তারা ধ্বংস হোক। (সূরা মু’মিনূন- ৪৪)
বিভিন্ন জাতিকে বিভিন্নভাবে ধ্বংস করা হয়েছে :
فَكُلًّا اَخَذْنَا بِذَنْۢبِه ۚ فَمِنْهُمْ مَّنْ اَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًاۚ وَمِنْهُمْ مَّنْ اَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُۚ وَمِنْهُمْ مَّنْ خَسَفْنَا بِهِ الْاَرْضَۚ وَمِنْهُمْ مَّنْ اَغْرَقْنَاۚ وَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلٰكِنْ كَانُوْاۤ اَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ
তাদের প্রত্যেককেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম, তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রবল বাতাস, তাদের কাউকে আঘাত করেছিল বিকট শব্দ, কাউকে আমি দাবিয়ে দিয়েছিলাম জমিনে, আবার কাউকে নিমজ্জিত করেছিলাম পানিতে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল। (সূরা আনকাবূত- ৪০)
পরকালের শাস্তি আরো কঠোর হবে :
كَذَّبَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَاَتَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُوْنَ – فَاَذَاقَهُمُ اللهُ الْخِزْيَ فِى الْحَيَاةِ الدُّنْيَاۚ وَلَعَذَابُ الاٰخِرَةِ اَكْبَرُۘ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ
তাদের পূর্ববর্তীরাও অস্বীকার করেছিল, ফলে তাদের উপর এমনভাবে আযাব এসেছিল যা তারা ভাবতেও পারেনি। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে পার্থিব জীবনেই অপমানের স্বাদ ভোগ করালেন, আর পরকালের শাস্তি তো আরো কঠিন। (কতই না ভালো হতো) যদি তারা জানত! (সূরা যুমার- ২৫, ২৬)
নবীদের সাথে শত্রুতা করে কেউই টিকে থাকতে পারেনি :
وَاِنْ كَادُوْا لَيَسْتَفِزُّوْنَكَ مِنَ الْاَرْضِ لِيُخْرِجُوْكَ مِنْهَا وَاِذًا لَّا يَلْبَثُوْنَ خِلَافَكَ اِلَّا قَلِيْلًا – سُنَّةَ مَنْ قَدْ اَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنْ رُّسُلِنَا وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيْلًا
তারা তোমাকে দেশ হতে উৎখাত করার চূড়ান্ত চেষ্টা করেছিল, যাতে করে তারা তোমাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করতে পারে। (আর যদি তারা তোমাকে বহিষ্কার করেই ফেলত) তাহলে তোমার পর তারাও সেখানে অল্পকাল টিকে থাকতে পারত। আমার রাসূলগণের মধ্যে তোমার পূর্বে যাদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম। আর তুমি আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন পাবে না। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৬, ৭৭)
ধ্বংসপ্রাপ্ত কয়েকটি জাতির নাম :
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوْحٍ وَّعَادٌ وَّفِرْعَوْنُ ذُو الْاَوْتَادِ – وَثَمُوْدُ وَقَوْمُ لُوْطٍ وَّاَصْحَابُ الْاَيْكَةِؕ اُوْلٰٓئِكَ الْاَحْزَابُ – اِنْ كُلٌّ اِلَّا كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ عِقَابِ
এদের পূর্বেও রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল নূহ, আদ এবং বহু পেরেকের মালিক ফিরাউনের সম্প্রদায়। আরো অস্বীকার করেছিল সামূদ, লূতের সম্প্রদায় ও আইকার অধিবাসীরা। তারা ছিল বিশাল বাহিনী। এরা প্রত্যেকেই রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল। সুতরাং আমার শাস্তি (তাদের উপর) বাস্তবায়িত হয়েছিল। (সূরা সোয়াদ, ১২-১৪)
সমৃদ্ধশালীদের পাপই ছিল জনপদ ধ্বংসের বড় কারণ :
وَاِذَاۤ اَرَدْنَاۤ اَنْ نُّهْلِكَ قَرْيَةً اَمَرْنَا مُتْرَفِيْهَا فَفَسَقُوْا فِيْهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيْرًا
যখন আমি কোন জনপদ ধ্বংস করতে চাই, তখন তার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎকর্ম করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেথায় অসৎকর্ম করে। ফলে তার প্রতি দন্ডাদেশ দেয়াটা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায়; অতঃপর আমি তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দেই। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১৬)
ব্যাখ্যা : ধ্বংস করার সংকল্পের অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ বিনা কারণেই কোন নিরপরাধ জনবসতি ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন। বরং এর অর্থ হচ্ছে, যখন কোন জনবসতি অসৎ পথে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন আল্লাহ তাকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এ আয়াতে যে সত্যটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে, একটি সমাজের সচ্ছল ও সম্পদশালী লোকদের বিকৃতিই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যখন কোন জাতির ধ্বংস হওয়ার সময় হয়, তখন তার ধনাঢ্য ও ক্ষমতাশীলরা ফাসিকী ও নৈতিকতা বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা যুলুম-নির্যাতন ও দুষ্কর্মে গা ভাসিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এ বিপর্যয়টি সমগ্র জাতিকে ধ্বংস করে। কাজেই ক্ষমতার লাগাম এবং অর্থনৈতিক সম্পদের চাবিকাঠি যাতে হীনমনা ও দুশ্চরিত্র ধনীদের হাতে চলে না যায় সেদিকে নজর রাখা উচিত। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাই এ অবস্থার পরিবর্তন না আনা হলে জাতি ধ্বংসের মুখোমুখি হবে- এতে কোন সন্দেহ নেই।
পুণ্যবান হলে কোন জাতিই ধ্বংস হতো না :
وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرٰى بِظُلْمٍ وَّاَهْلُهَا مُصْلِحُوْنَ
তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, তিনি অন্যায়ভাবে কোন জনপদ ধ্বংস করবেন, অথচ তার অধিবাসীরা পুণ্যবান। (সূরা হুদ- ১১৭)
অতীতের ইতিহাসে বিরাট শিক্ষা রয়েছে :
قُلْ سِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلُؕ كَانَ اَكْثَرُهُمْ مُّشْرِكِيْنَ
বলো, তোমরা দুনিয়াতে ভ্রমণ করো এবং লক্ষ্য করো, পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন (ভয়াবহ) হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক। (সূরা রূম- ৪২)
কোন জাতিই দুনিয়ায় আর ফিরে আসবে না :
وَحَرَامٌ عَلٰى قَرْيَةٍ اَهْلَكْنَاهَاۤ اَنَّهُمْ لَا يَرْجِعُوْنَ
আমি যেসব জনপদকে ধ্বংস করেছি তার সম্পর্কে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে যে, তারা আবার ফিরে আসবে। (সূরা আম্বিয়া- ৯৫)
কিয়ামতের আগে সকল জনপদ ধ্বংস হবে :
وَاِنْ مِّنْ قَرْيَةٍ اِلَّا نَحْنُ مُهْلِكُوْهَا قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ اَوْ مُعَذِّبُوْهَا عَذَابًا شَدِيْدًاؕ كَانَ ذٰلِكَ فِى الْكِتَابِ مَسْطُوْرًا
এমন কোন জনপদ নেই, যা আমি কিয়ামতের দিনের পূর্বে ধ্বংস করব না অথবা যাকে কঠোর শাস্তি দেব না, এটা তো কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৫৮)
পরিশেষে সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে :
وَكَاَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ اَمْلَيْتُ لَهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ ثُمَّ اَخَذْتُهَاۚ وَاِليَّ الْمَصِيْرُ
আমি অবকাশ দিয়েছি কত জনপদকে যখন তারা ছিল যালিম, অতঃপর তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি। আর শেষ প্রত্যাবর্তন তো আমার নিকটেই। (সূরা হজ্জ- ৪৮)
وَلِكُلِّ اُمَّةٍ اَجَلٌۚ فَاِذَا جَآءَ اَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُوْنَ سَاعَةً وَّلَا يَسْتَقْدِمُوْنَ
প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা মুহূর্তকাল সময়টুকুও দেরি করতে পারবে না এবং তাড়াহুড়াও করতে পারবে না। (সূরা আ‘রাফ- ৩৪)
সময় শেষে কেউই টিকে থাকতে পারেনি :
وَمَاۤ اَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ اِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَّعْلُوْمٌ – مَا تَسْبِقُ مِنْ اُمَّةٍ اَجَلَهَا وَمَا يَسْتَأْخِرُوْنَ
আমি যে কোন জনপদকে ধ্বংস করেছি তার জন্য ছিল একটি নির্দিষ্ট লিপিবদ্ধ কাল। কোন জাতি তার নির্দিষ্ট কালকে ত্বরান্বিত করতে পারে না এবং বিলম্বিতও করতে পারে না। (সূরা হিজর- ৪, ৫)
পরিশেষে তারা কেবল পরিতাপই করেছে :
قَالُوْا يَا وَيْلَنَاۤ اِنَّا كُنَّا ظَالِمِيْنَ – - فَمَا زَالَتْ تِّلْكَ دَعْوَاهُمْ حَتّٰى جَعَلْنَاهُمْ حَصِيْدًا خَامِدِيْنَ
তারা বলল, ‘হায় আমাদের দুর্ভোগ! নিশ্চয় আমরা ছিলাম যালিমদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তাদের এ আর্তনাদ চলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাদেরকে কর্তিত শস্য ও নিভে যাওয়া আগুনের মতো করে দিলাম (অর্থাৎ তাদেরকে গুরুত্বহীন করে দিলাম)। (সূরা আম্বিয়া- ১৪, ১৫)
فَمَا كَانَ دَعْوَاهُمْ اِذْ جَآءَهُمْ بَأْسُنَاۤ اِلَّاۤ اَنْ قَالُوْاۤ اِنَّا كُنَّا ظَالِمِيْنَ
অতঃপর যখন আমার শাস্তি তাদের উপর পতিত হয়েছিল, তখন তাদের কথা শুধু এটাই ছিল যে, নিশ্চয় আমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (সূরা আ‘রাফ- ৫)
ব্যাখ্যা : সংশোধনের সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর কারো সচেতন হওয়া এবং নিজের ভুল স্বীকার করা অর্থহীন। যে ব্যক্তি বা জাতি গাফলতিতে লিপ্ত ও ভোগের নেশায় মত্ত হয়ে স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দেয়া সুযোগ হারিয়ে বসে এবং আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করার পর যারা সচেতন হয় তাদের চেয়ে বড় মূর্খ আর কেউ নেই। আল্লাহ একবার কাউকে পাকড়াও করার পর তার আর মুক্তি লাভের কোন পথই থাকে না। মানবজাতির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা হাজার বার ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে মানুষ বার বার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে আসছে। সচেতন হওয়ার জন্য সে শেষ মুহূর্তেরই অপেক্ষা করতে থাকে, যখন আক্ষেপ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
তারা হঠাৎ করে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে :
وَكَمْ مِّنْ قَرْيَةٍ اَهْلَكْنَاهَا فَجَآءَهَا بَأْسُنَا بَيَاتًا اَوْ هُمْ قَآئِلُوْنَ
আমি কত জনপদকে ধ্বংস করেছি! আমার শাস্তি তাদের উপর পতিত হয়েছিল রাতে অথবা দ্বিপ্রহরে, যখন তারা বিশ্রামরত অবস্থায় ছিল। (সূরা আ‘রাফ- ৪)
তারা তাদের বাড়িঘরসহ ধ্বংস হয়েছে :
قَدْ مَكَرَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَاَتَى اللهُ بُنْيَانَهُمْ مِنَ الْقَوَاعِدِ فَخَرَّ عَلَيْهِمُ السَّقْفُ مِنْ فَوْقِهِمْ وَاَتَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُوْنَ
তাদের পূর্ববর্তীগণও চক্রান্ত করেছিল, ফলে আল্লাহ তাদের ইমারতের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন, এতে ইমারতের ছাদ তাদের উপর ধসে পড়ল। আর তাদের প্রতি এমন দিক হতে শাস্তি আসল, যা ছিল তাদের ধারণাতীত। (সূরা নাহল- ২৬)
তাদের ঘরবাড়ি জনশূণ্য হয়ে পড়ে থাকল :
فَكَاَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ اَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ فَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلٰى عُرُوْشِهَا وَبِئْرٍ مُّعَطَّلَةٍ وَّقَصْرٍ مَّشِيْدٍ
আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ, যেগুলোর বাসিন্দারা ছিল যালিম। এসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল এবং কত কূপ ও কত সুদৃঢ় প্রাসাদও পরিত্যক্ত হয়েছিল। (সূরা হজ্জ- ৪৫)
অনেক শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তারা ধ্বংস হয়েছে :
اَوَلَمْ يَسِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَيَنْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِيْنَ كَانُوْا مِنْ قَبْلِهِمْؕ كَانُوْا هُمْ اَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَّاٰثَارًا فِى الْاَرْضِ فَاَخَذَهُمُ اللهُ بِذُنُوْبِهِمْؕ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ وَّاقٍ
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে এবং কীর্তিতে প্রবল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলেন; আর তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য কেউ ছিল না।
(সূরা মু’মিন- ২১)
তাদের কোন সাহায্যকারী পাওয়া যায়নি :
وَكَاَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ هِيَ اَشَدُّ قُوَّةً مِّنْ قَرْيَتِكَ الَّتِيْۤ اَخْرَجَتْكَۚ اَهْلَكْنَاهُمْ فَلَا نَاصِرَ لَهُمْ
(হে রাসূল!) তারা আপনাকে আপনার যে এলাকা থেকে বের করে দিয়েছে এর চেয়ে শক্তিশালী কত এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। আমি তাদেরকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছি যে, তাদেরকে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। (সূরা মুহাম্মাদ- ১৩)
তাদের ধনসম্পদ কোন কাজে আসেনি :
اَفَلَمْ يَسِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَيَنْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْؕ كَانُوْاۤ اَكْثَرَ مِنْهُمْ وَاَشَدَّ قُوَّةً وَّاٰثَارًا فِى الْاَرْضِ فَمَاۤ اَغْنٰى عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ
তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি ও দেখেনি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারপরও তারা যা করত তা তাদের কোন কাজে আসেনি। (সূরা মু’মিন- ৮২)
তাদের ধ্বংসাবশেষ এখনো আছে :
وَعَادًا وَّثَمُوْدَاْ وَقَدْ تَّبَيَّنَ لَكُمْ مِّنْ مَّسَاكِنِهِمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ اَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيْلِ وَكَانُوْا مُسْتَبْصِرِيْنَ
আমি আদ ও সামূদ জাতিকে ধ্বংস করেছিলাম, তাদের বাড়িঘরই তোমাদের জন্য এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান তাদের কাজকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করে দিয়েছিল এবং তাদেরকে সৎপথ অবলম্বনে বাধা দিয়েছিল, যদিও তারা ছিল বিচক্ষণ। (সূরা আনকাবূত- ৩৮)
এভাবে যালিমদের শিকড় কেটে দেয়া হয়েছে :
فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْاؕ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
অতঃপর যালিম সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হলো; সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। (সূরা আন‘আম- ৪৫)
তাদের ধ্বংসের বিষয়টি কাহিনীতে পরিণত হয়েছে :
ثُمَّ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا تَتْرٰىؕ كُلَّ مَا جَآءَ اُمَّةً رَّسُوْلُهَا كَذَّبُوْهُ فَاَتْبَعْنَا بَعْضَهُمْ بَعْضًا وَّجَعَلْنَاهُمْ اَحَادِيْثَۚ فَبُعْدًا لِّقَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُوْنَ
অতঃপর আমি একের পর এক আমার রাসূল প্রেরণ করেছি। যখনই কোন জাতির নিকট তার রাসূল এসেছে তখনই তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে একের পর এক ধ্বংস করলাম এবং তাদেরকে কাহিনীর বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করে দিলাম। কাজেই যে জাতি ঈমান আনয়ন করে না, তারা ধ্বংস হোক। (সূরা মু’মিনূন- ৪৪)
বিভিন্ন জাতিকে বিভিন্নভাবে ধ্বংস করা হয়েছে :
فَكُلًّا اَخَذْنَا بِذَنْۢبِه ۚ فَمِنْهُمْ مَّنْ اَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًاۚ وَمِنْهُمْ مَّنْ اَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُۚ وَمِنْهُمْ مَّنْ خَسَفْنَا بِهِ الْاَرْضَۚ وَمِنْهُمْ مَّنْ اَغْرَقْنَاۚ وَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلٰكِنْ كَانُوْاۤ اَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ
তাদের প্রত্যেককেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম, তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রবল বাতাস, তাদের কাউকে আঘাত করেছিল বিকট শব্দ, কাউকে আমি দাবিয়ে দিয়েছিলাম জমিনে, আবার কাউকে নিমজ্জিত করেছিলাম পানিতে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল। (সূরা আনকাবূত- ৪০)
পরকালের শাস্তি আরো কঠোর হবে :
كَذَّبَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَاَتَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُوْنَ – فَاَذَاقَهُمُ اللهُ الْخِزْيَ فِى الْحَيَاةِ الدُّنْيَاۚ وَلَعَذَابُ الاٰخِرَةِ اَكْبَرُۘ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ
তাদের পূর্ববর্তীরাও অস্বীকার করেছিল, ফলে তাদের উপর এমনভাবে আযাব এসেছিল যা তারা ভাবতেও পারেনি। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে পার্থিব জীবনেই অপমানের স্বাদ ভোগ করালেন, আর পরকালের শাস্তি তো আরো কঠিন। (কতই না ভালো হতো) যদি তারা জানত! (সূরা যুমার- ২৫, ২৬)
নবীদের সাথে শত্রুতা করে কেউই টিকে থাকতে পারেনি :
وَاِنْ كَادُوْا لَيَسْتَفِزُّوْنَكَ مِنَ الْاَرْضِ لِيُخْرِجُوْكَ مِنْهَا وَاِذًا لَّا يَلْبَثُوْنَ خِلَافَكَ اِلَّا قَلِيْلًا – سُنَّةَ مَنْ قَدْ اَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنْ رُّسُلِنَا وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيْلًا
তারা তোমাকে দেশ হতে উৎখাত করার চূড়ান্ত চেষ্টা করেছিল, যাতে করে তারা তোমাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করতে পারে। (আর যদি তারা তোমাকে বহিষ্কার করেই ফেলত) তাহলে তোমার পর তারাও সেখানে অল্পকাল টিকে থাকতে পারত। আমার রাসূলগণের মধ্যে তোমার পূর্বে যাদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম। আর তুমি আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন পাবে না। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৬, ৭৭)
ধ্বংসপ্রাপ্ত কয়েকটি জাতির নাম :
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوْحٍ وَّعَادٌ وَّفِرْعَوْنُ ذُو الْاَوْتَادِ – وَثَمُوْدُ وَقَوْمُ لُوْطٍ وَّاَصْحَابُ الْاَيْكَةِؕ اُوْلٰٓئِكَ الْاَحْزَابُ – اِنْ كُلٌّ اِلَّا كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ عِقَابِ
এদের পূর্বেও রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল নূহ, আদ এবং বহু পেরেকের মালিক ফিরাউনের সম্প্রদায়। আরো অস্বীকার করেছিল সামূদ, লূতের সম্প্রদায় ও আইকার অধিবাসীরা। তারা ছিল বিশাল বাহিনী। এরা প্রত্যেকেই রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল। সুতরাং আমার শাস্তি (তাদের উপর) বাস্তবায়িত হয়েছিল। (সূরা সোয়াদ, ১২-১৪)
সমৃদ্ধশালীদের পাপই ছিল জনপদ ধ্বংসের বড় কারণ :
وَاِذَاۤ اَرَدْنَاۤ اَنْ نُّهْلِكَ قَرْيَةً اَمَرْنَا مُتْرَفِيْهَا فَفَسَقُوْا فِيْهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيْرًا
যখন আমি কোন জনপদ ধ্বংস করতে চাই, তখন তার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎকর্ম করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেথায় অসৎকর্ম করে। ফলে তার প্রতি দন্ডাদেশ দেয়াটা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায়; অতঃপর আমি তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দেই। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১৬)
ব্যাখ্যা : ধ্বংস করার সংকল্পের অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ বিনা কারণেই কোন নিরপরাধ জনবসতি ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন। বরং এর অর্থ হচ্ছে, যখন কোন জনবসতি অসৎ পথে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন আল্লাহ তাকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এ আয়াতে যে সত্যটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে, একটি সমাজের সচ্ছল ও সম্পদশালী লোকদের বিকৃতিই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যখন কোন জাতির ধ্বংস হওয়ার সময় হয়, তখন তার ধনাঢ্য ও ক্ষমতাশীলরা ফাসিকী ও নৈতিকতা বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা যুলুম-নির্যাতন ও দুষ্কর্মে গা ভাসিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এ বিপর্যয়টি সমগ্র জাতিকে ধ্বংস করে। কাজেই ক্ষমতার লাগাম এবং অর্থনৈতিক সম্পদের চাবিকাঠি যাতে হীনমনা ও দুশ্চরিত্র ধনীদের হাতে চলে না যায় সেদিকে নজর রাখা উচিত। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাই এ অবস্থার পরিবর্তন না আনা হলে জাতি ধ্বংসের মুখোমুখি হবে- এতে কোন সন্দেহ নেই।
পুণ্যবান হলে কোন জাতিই ধ্বংস হতো না :
وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرٰى بِظُلْمٍ وَّاَهْلُهَا مُصْلِحُوْنَ
তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, তিনি অন্যায়ভাবে কোন জনপদ ধ্বংস করবেন, অথচ তার অধিবাসীরা পুণ্যবান। (সূরা হুদ- ১১৭)
অতীতের ইতিহাসে বিরাট শিক্ষা রয়েছে :
قُلْ سِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلُؕ كَانَ اَكْثَرُهُمْ مُّشْرِكِيْنَ
বলো, তোমরা দুনিয়াতে ভ্রমণ করো এবং লক্ষ্য করো, পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন (ভয়াবহ) হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক। (সূরা রূম- ৪২)
কোন জাতিই দুনিয়ায় আর ফিরে আসবে না :
وَحَرَامٌ عَلٰى قَرْيَةٍ اَهْلَكْنَاهَاۤ اَنَّهُمْ لَا يَرْجِعُوْنَ
আমি যেসব জনপদকে ধ্বংস করেছি তার সম্পর্কে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে যে, তারা আবার ফিরে আসবে। (সূরা আম্বিয়া- ৯৫)
কিয়ামতের আগে সকল জনপদ ধ্বংস হবে :
وَاِنْ مِّنْ قَرْيَةٍ اِلَّا نَحْنُ مُهْلِكُوْهَا قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ اَوْ مُعَذِّبُوْهَا عَذَابًا شَدِيْدًاؕ كَانَ ذٰلِكَ فِى الْكِتَابِ مَسْطُوْرًا
এমন কোন জনপদ নেই, যা আমি কিয়ামতের দিনের পূর্বে ধ্বংস করব না অথবা যাকে কঠোর শাস্তি দেব না, এটা তো কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৫৮)
পরিশেষে সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে :
وَكَاَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ اَمْلَيْتُ لَهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ ثُمَّ اَخَذْتُهَاۚ وَاِليَّ الْمَصِيْرُ
আমি অবকাশ দিয়েছি কত জনপদকে যখন তারা ছিল যালিম, অতঃপর তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি। আর শেষ প্রত্যাবর্তন তো আমার নিকটেই। (সূরা হজ্জ- ৪৮)