hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৭০

অধ্যায়- ৭ : আমলনামা হাজির করা হবে

মানুষের সকল কার্যকলাপ লিখা হচ্ছে :

وَكُلَّ شَيْءٍ اَحْصَيْنَاهُ كِتَابًا

আমি সবকিছুই লিখিতভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছি। (সূরা নাবা- ২৯)

ব্যাখ্যা : মানুষের সমস্ত কথা ও কাজ, তাদের সবরকমের উঠাবসা ও চলাফেরা এমনকি তাদের চিন্তা, মনোভাব, সংকল্প ও উদ্দেশ্যাবলির পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড আল্লাহ তৈরি করে রেখেছেন। সেই রেকর্ড থেকে কোনকিছুই বাদ যায় না।

সম্মানিত ফেরেশতারা তা লিখছেন :

وَاِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِيْنَ – كِرَامًا كَاتِبِيْنَ – يَعْلَمُوْنَ مَا تَفْعَلُوْنَ

নিশ্চয় তোমাদের উপর নিযুক্ত রয়েছে সংরক্ষকগণ এবং সম্মানিত লেখকগণ। তোমরা যা কর তারা সে সম্পর্কে অবগত আছেন। (সূরা ইনফিতার, ১০-১২)

اِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِيْنِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيْدٌ

দু’জন গ্রহণকারী (ফেরেশতা) তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। (সূরা ক্বাফ- ১৭)

একটি কথাও লেখা থেকে বাদ পড়ে না :

مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ

মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য অতন্দ্র প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। (সূরা ক্বাফ- ১৮)

ব্যাখ্যা : দু’জন করে ফেরেশতা প্রত্যেক মানুষের জন্য নিয়োজিত আছে, যারা তার প্রত্যেকটি কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করছে। কোন কাজ ও কথাই তাদের রেকর্ড থেকে বাদ পড়ে না। আল্লাহর আদালতে যখন মানুষকে পেশ করা হবে তখন কে কী করে এসেছে সে বিষয়ে আল্লাহ নিজ থেকেই অবহিত থাকবেন। তাছাড়া সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য এ দু’জন ফেরেশতাও উপস্থিত থাকবেন। তারা তার কাজকর্মের লিখিত প্রমাণাদি এনে সামনে পেশ করবেন। যে পরিবেশে মানুষ অবস্থান করে ও কাজকর্ম করে তাতে চতুর্দিকের প্রতিটি অণু-পরমাণুর উপর তার কণ্ঠস্বর, ছবি ও গতিবিধির ছাপ পড়ে যাচ্ছে। মানুষের নিজ দেহ এবং তার চারপাশের প্রতিটি জিনিস ফেরেশতাদের জন্য টেপ ও ফিল্মস্বরূপ। তারা এসব টেপ ও ফিল্মের উপর প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি ছবি অতি সূক্ষ্ম ও খুঁটিনাটি বিষয়সহ অবিকল ধারণ করতে পারে। পৃথিবীতে ব্যক্তি যেসব কাজ করত কিয়ামতের দিন তাকে তার নিজ কানে নিজ কণ্ঠস্বরে সেগুলো শুনিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া নিজ চোখে তার সকল কর্মকান্ডের এমন ছবি তাকে দেখিয়ে দিতে পারে, যা অস্বীকার করা তার পÿÿ সম্ভব হবে না।

এতে ছোট-বড় সবকিছু লিখা হচ্ছে :

وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوْهُ فِى الزُّبُرِ – وَكُلُّ صَغِيْرٍ وَّكَبِيْرٍ مُّسْتَطَرٌ

তাদের সমস্ত কার্যকলাপ আমলনামায় লিখিত আছে, ছোট-বড় সবকিছুই লিপিবদ্ধ। (সূরা ক্বামার- ৫২, ৫৩)

মানুষের গোপন কথা এবং কাজও লেখা হয় :

اَمْ يَحْسَبُوْنَ اَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْؕ بَلٰى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُوْنَ

তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও তাদের কানাকানির খবর রাখি না? হ্যাঁ, অবশ্যই রাখি। আমার ফেরেশতারা তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে রাখছে। (সূরা যুখরুফ- ৮০)

اِنَّ رُسُلَنَا يَكْتُبُوْنَ مَا تَمْكُرُوْنَ

তোমরা যে অপকৌশল কর অবশ্যই তা আমার ফেরেশতাগণ লিখে রাখে। (সূরা ইউনুস- ২১)

মানুষের কৃতকর্মের প্রতিক্রিয়াও লেখা হয় :

وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوْا وَاٰثَارَهُمْؕ وَكُلَّ شَيْءٍ اَحْصَيْنَاهُ فِۤيْ اِمَامٍ مُّبِيْنٍ

আমি লিপিবদ্ধ করে রাখি, যা তারা পূর্বে প্রেরণ করে এবং যা তারা পশ্চাতে রেখে যায়। আমি প্রত্যেক বিষয়ই স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষণ করে রেখেছি। (সূরা ইয়াসীন-১২)

ব্যাখ্যা : মানুষের আমলনামায় যা থাকবে তা হলো : (এক) প্রত্যেক ব্যক্তি ভালো-মন্দ যা কিছু করে, তা আল্লাহর দফতরে লিখে নেয়া হয়। (দুই) মৃত্যুর পর নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর ও সমগ্র মানবজাতির উপর ভালো-মন্দ যা কিছু রেখে গেছে, সে সবের পূর্ণ রেকর্ডর্র্র্র্র্ ততক্ষণ পর্যন্ত হতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তার তৈরি করা ভালো-মন্দকাজগুলো দুনিয়ায় চলতে থাকবে। আল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তিকে সব অবস্থায় নিজেই সরাসরি দেখছেন এবং তার সমস্ত গতিবিধি ও কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। আল্লাহর নিযুক্ত তত্ত্বাবধায়কও প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে রয়েছেন এবং তারা তার জীবনের সমস্ত কার্যক্রমের রেকর্ডও সংরক্ষণ করছেন। এমন অকল্পনীয় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধীনে থেকে যারা এ কথা মনে করে জীবন যাপন করে যে, তাদেরকে লাগামহীন উটের মতো দুনিয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং তাদের কার্যকলাপের জন্য কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না- তারা আসলে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।

নেককারদের আমলনামা থাকে ইল্লিয়্যীনে :

كَلَّاۤ اِنَّ كِتَابَ الْاَبْرَارِ لَفِيْ عِلِّيِّيْنَ – وَمَاۤ اَدْرَاكَ مَا عِلِّيُّوْنَ – كِتَابٌ مَّرْقُوْمٌ – يَشْهَدُهُ الْمُقَرَّبُوْنَ

নিশ্চয় পুণ্যবানদের আমলনামা থাকবে ইল্লিয়্যীনে। তুমি কি জান ইল্লিয়্যীন কী? (তা হচ্ছে) লিখিত কিতাব। (আল্লাহর) সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা তা প্রত্যক্ষ করবে। (সূরা মুতাফফিফীন, ১৮-২১)

পাপীদের আমলনামা থাকে সিজ্জীনে :

كَلَّاۤ اِنَّ كِتَابَ الْفُجَّارِ لَفِيْ سِجِّيْنٍ – وَمَاۤ اَدْرَاكَ مَا سِجِّيْنٌ – كِتَابٌ مَّرْقُوْمٌ

কখনই না, নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা থাকবে সিজ্জীনে। সিজ্জীন কী তা কি তুমি জান? তা হচ্ছে লিখিত কিতাব। (সূরা মুতাফফিফীন, ৭-৯)

কিয়ামতের দিন আমলনামা খোলা হবে :

وَاِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ

যখন আমলনামাসমূহ প্রকাশ করা হবে। (সূরা তাকভীর- ১০)

وَنُخْرِجُ لَهٗ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَّلْقَاهُ مَنْشُوْرًا

কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত অবস্থায়। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১৩)

মানুষকে আমলনামার দিকে ডাকা হবে :

كُلُّ اُمَّةٍ تُدْعٰۤى اِلٰى كِتَابِهَاؕ اَلْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ

প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের আমলনামার দিকে আহবান করা হবে। (বলা হবে) আজ তোমাদেরকে তারই বিনিময় দেয়া হবে, যা তোমরা করতে। (সূরা জাসিয়া- ২৮)

আমলনামা সবকিছু সঠিকভাবে তুলে ধরবে :

هٰذَا كِتَابُنَا يَنْطِقُ عَلَيْكُمْ بِالْحَقِّؕ اِنَّا كُنَّا نَسْتَنْسِخُ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ

এই হলো আমার কিতাব, এটা তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে সঠিকভাবে। তোমরা যা করতে অবশ্যই আমি তা লিপিবদ্ধ করিয়েছিলাম। (সূরা জাসিয়া- ২৯)

ব্যাখ্যা : কলম দিয়ে কাগজের উপর লেখাই লিখে রাখার একমাত্র পদ্ধতি নয়। মানুষের কথা ও কাজ লিপিবদ্ধ করা এবং পুনরায় তা হুবহু পূর্বের মতো করে উপস্থাপনের আরো পদ্ধতি এ পৃথিবীতে মানুষ নিজেই উদ্ভাবন করেছে। ভবিষ্যতে মানুষের করায়ত্ব হবে এরূপ আরো কী কী সম্ভাবনা আছে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কী কী পন্থায় আল্লাহ মানুষের এক একটি কথা ও কর্ম, তার প্রতিটি তৎপরতা, কামনা-বাসনা ও ধ্যান-ধারণার প্রতিটি বিষয় লিপিবদ্ধ করছেন এবং কীভাবে তিনি প্রত্যেক ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও জাতির গোটা জীবনের সকল কর্মকান্ড অবিকল তার সামনে পেশ করবেন তা আল্লাহই ভালো জানেন।

আমলনামা পড়ে মানুষ নিজেই নিজের হিসাব বুঝে ফেলবে :

اِقْرَاْ كِتَابَكَؕ كَفٰى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيْبًا

তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১৪)

পাপীরা আমলনামা দেখে ভয় পাবে এবং পরিতাপ করবে :

وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِيْنَ مُشْفِقِيْنَ مِمَّا فِيْهِ وَيَقُوْلُوْنَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَّلَا كَبِيْرَةً اِلَّاۤ اَحْصَاهَاۚ وَوَجَدُوْا مَا عَمِلُوْا حَاضِرًاؕ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ اَحَدًا

আমলনামা উপস্থিত করা হবে এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে অপরাধীদেরকে আতঙ্কগ্রসত্ম অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! যা ছোট-বড় কোনকিছুই বাদ দেয় না; বরং তা সবকিছুরই হিসাব রেখেছে।’ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; আর তোমার প্রতিপালক কারো উপর যুলুম করবেন না। (সূরা কাহফ- ৪৯)