hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৭০

অধ্যায়- ১ : ইবরাহীম (আঃ) এর মর্যাদা

ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত :

اِنَّهٗ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِيْنَ

নিশ্চয় তিনি ছিলেন আমার মুমিন বান্দাদের একজন। (সূরা সাফ্ফাত– ১১১)

তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ নবী :

وَاذْكُرْ فِى الْكِتَابِ اِبْرَاهِيْمَؕ اِنَّهٗ كَانَ صِدِيّقًا نَّبِيًّا

স্মরণ করো, এ কিতাবে উল্লেখিত ইবরাহীমের কথা। সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী। (সূরা মারইয়াম– ৪১)

তিনি ছিলেন কৃতজ্ঞ বান্দা :

شَاكِرًا لِّاَنْعُمِهٖؕ اِجْتَبَاهُ وَهَدَاهُ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ

তিনি ছিলেন আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছিলেন এবং তাকে পরিচালিত করেছিলেন সরল পথে। (সূরা নাহল– ১২১)

ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহ অভিমুখী :

اِنَّ اِبْرَاهِيْمَ لَحَلِيْمٌ اَوَّاهٌ مُّنِيْبٌ

নিশ্চয় ইবরাহীম ছিলেন সহনশীল, কোমল হৃদয় এবং আল্লাহ অভিমুখী। (সূরা হুদু ৭৫)

ব্যাখ্যা : اَوَّاهٌ (আওওয়াহুন) এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যে কান্নাকাটি করে, ভয় পায় ও আক্ষেপ করে। আর حَلِيْمٌ (হালীম) এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যে নিজের মেজায সংযত রাখে; রাগে, শত্রুতায় ও বিরোধিতায় বেসামাল আচরণ করে না এবং অন্যদিকে ভালোবাসা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে যায় না।

আল্লাহ তাকে জ্ঞানবুদ্ধি দান করেছিলেন :

وَلَقَدْ اٰتَيْنَاۤ اِبْرَاهِيْمَ رُشْدَهٗ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهٖ عَالِمِيْنَ

আমি তো ইতোপূর্বে ইবরাহীমকে সৎপথের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং আমি তার সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত ছিলাম। (সূরা আম্বিয়া– ৫১)

ব্যাখ্যা : رُشْدٌ (রুশ্দ) এর অর্থ হচ্ছে, সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করে সঠিক পথ অবলম্বন করা এবং বেঠিক পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া। ‘রুশ্দ’ শব্দটি কেবলমাত্র সত্যনিষ্ঠা নয় বরং এমন সত্যজ্ঞানের ভাব প্রকাশ করে, যা সঠিক চিন্তা ও ভারসাম্যপূর্ণ বুদ্ধি ব্যবহারের ফলশ্রুতিতে হয়ে থাকে।

ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহর বন্ধু :

وَاتَّخَذَ اللهُ اِبْرَاهِيْمَ خَلِيْلًا

আর আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। (সূরা নিসা– ১২৫)

তিনি আল্লাহর আদেশের অনুগত ছিলেন :

اِذْ قَالَ لَهٗ رَبُّهٗۤ اَسْلِمْ قَالَ اَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ

যখন তাঁর প্রতিপালক তাঁকে বললেন, তুমি আত্মসমর্পণ করো; তখন তিনি বলেছিলেন, আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। (সূরা বাক্বারা– ১৩১)

ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা :

وَمَنْ يَّرْغَبُ عَنْ مِّلَّةِ اِبْرَاهِيْمَ اِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهٗؕ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِى الدُّنْيَاۚ وَاِنَّهٗ فِى الْاٰخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِيْنَ

যে নিজেকে নির্বোধ বানিয়ে নিয়েছে সে ব্যতীত কে ইবরাহীমের ধর্ম হতে বিমুখ হবে। নিশ্চয় আমি তাকে এ পৃথিবীতে মনোনীত করেছিলাম, নিশ্চয় সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা বাক্বারা– ১৩০)

তাঁর অন্তর ছিল বিশুদ্ধ ও নিষ্কলুষ :

اِذْ جَآءَ رَبَّهٗ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ

স্মরণ করো, যখন তিনি বিশুদ্ধচিত্তে তার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন। (সূরা সাফ্ফাত– ৮৪)

اِنَّ اِبْرَاهِيْمَ لَاَوَّاهٌ حَلِيْمٌ

নিশ্চয় ইবরাহীম ছিলেন কোমল হৃদয় ও সহনশীলতার অধিকারী। (সূরা তাওবা– ১১৪)

তিনি সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন :

وَاِذِ ابْتَلٰۤى اِبْرَاهِيْمَ رَبُّهٗ بِكَلِمَاتٍ فَاَتَمَّهُنَّ

স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ইবরাহীমকে কতিপয় বাক্য দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করেছিলেন। (সূরা বাক্বারা– ১২৪)

আল্লাহ তাঁকে জাতির নেতৃত্ব দান করেছিলেন :

قَالَ اِنِّيْ جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ اِمَامًاؕ قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِيْؕ قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِى الظَّالِمِيْنَ

আল্লাহ বললেন, নিশ্চয় আমি তোমাকে মানবমন্ডলীর নেতা বানাব। তখন তিনি বলেছিলেন, আমার বংশধরগণ হতেও (নেতা বানাবেন)। আল্লাহ বললেন, আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীদের প্রতি প্রযোজ্য হবে না। (সূরা বাক্বারা– ১২৪)

তিনি ইয়াহুদি বা নাসারা ছিলেন না :

اَمْ تَقُوْلُوْنَ اِنَّ اِبْرَاهِيْمَ وَاِسْمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ وَيَعْقُوْبَ وَالْاَسْبَاطَ كَانُوْا هُوْدًا اَوْ نَصَارٰىؕ قُلْ اَاَنْتُمْ اَعْلَمُ اَمِ اللهُ

তোমরা কি বলছ যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাদের বংশধর ইয়াহুদি কিংবা খ্রিস্টান ছিলেন? বলো, তোমরাই বেশি জান নাকি আল্লাহ? (সূরা বাক্বারা– ১৪০)

তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম :

مَا كَانَ اِبْرَاهِيْمُ يَهُوْدِيًّا وَّلَا نَصْرَانِيًّا وَّلٰكِنْ كَانَ حَنِيْفًا مُّسْلِمًا

ইবরাহীম ইয়াহুদি বা নাসারা কিছুই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। (সূরা আলে ইমরানু ৬৭)

তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না :

قُلْ صَدَقَ اللهُ فَاتَّبِعُوْا مِلَّةَ اِبْرَاهِيْمَ حَنِيْفًاؕ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ

বলো, আল্লাহ সত্য বলেছেন। সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাতের অনুসরণ করো। আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। (সূরা আলে ইমরানু ৯৫)

তিনি ছিলেন মুসলিম জাতির পিতা :

مِلَّةَ اَبِيْكُمْ اِبْرَاهِيْمَؕ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِيْنَ مِنْ قَبْلُ وَفِيْ هٰذَا

এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত। তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ এবং এ কিতাবেও। (সূরা হজ্জ– ৭৮)

তিনি একাই এক উম্মতের দায়িত্ব পালন করেন :

اِنَّ اِبْرَاهِيْمَ كَانَ اُمَّةً قَانِتًا لِّلّٰهِ حَنِيْفًاؕ وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ

ইবরাহীম ছিলেন এক ‘ উম্মত’, আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

(সূরা নাহল– ১২০)

ব্যাখ্যা : অর্থাৎ তিনি একাই ছিলেন একটি উম্মতের সমান। যখন দুনিয়ায় কোন মুসলিম ছিল না তখন একদিকে তিনি একাই ছিলেন ইসলামের পতাকাবাহী, অন্যদিকে সারা দুনিয়ার মানুষ ছিল কুফরীর পতাকাবাহী। আল্লাহর এ একক বান্দা তখন এমন কাজ করেন, যা করার জন্য একটি উম্মতের প্রয়োজন ছিল।

তাঁর বংশে অনেক নবী জন্ম লাভ করেছেন :

وَلَقَدْ اَرْسَلْنَا نُوْحًا وَّاِبْرَاهِيْمَ وَجَعَلْنَا فِيْ ذُرِّيَّتِهِمَا النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ فَمِنْهُمْ مُّهْتَدٍۚ وَكَثِيْرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُوْنَ

আমি নূহ ও ইবরাহীমকে (রাসূলরূপে) প্রেরণ করেছিলাম এবং আমি তাদের দু’জনের বংশে নবুওয়াত ও কিতাবের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের (বংশধরের) খুব অল্পই সৎপথ অবলম্বন করেছিল এবং অধিকাংশই ছিল ফাসিক। (সূরা হাদীদু ২৬)

ইবরাহীম (আঃ) এর বংশে নবুওয়াত ও রাজত্ব দেয়া হয়েছে :

اَمْ يَحْسُدُوْنَ النَّاسَ عَلٰى مَاۤ اٰتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهٖۚ فَقَدْ اٰتَيْنَاۤ اٰلَ اِبْرَاهِيْمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَاٰتَيْنَاهُمْ مُّلْكًا عَظِيْمًا

অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন সেজন্য কি তারা তাদের সাথে ঈর্ষা করে? আমি ইবরাহীমের বংশধরকেও তো কিতাব ও হেকমত প্রদান করেছিলাম এবং তাদেরকে বিশাল রাজত্ব দান করেছিলাম। (সূরা নিসা– ৫৪)

ইবরাহীম (আঃ) এর ঘনিষ্ঠ লোক উম্মতে মুহাম্মাদী :

اِنَّ اَوْلَى النَّاسِ بِاِبْرَاهِيْمَ لَلَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُ وَهٰذَا النَّبِيُّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَاللهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِيْنَ

মানুষের মধ্যে ইবরাহীমের নিকট সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তারা, যারা তার অনুসরণ করেছে এবং এই নবী ও ঈমানদারগণ। আর আল্লাহ মুমিনদের বন্ধু। (সূরা আলে ইমরানু ৬৮)