১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১২৮
অধ্যায়- ৮ : ইসলামী শাসকদের জন্য জুলকারনাইনের দৃষ্টান্ত
আল্লাহ যুলকারনাইনের কিছু বিষয় বর্ণনা করেছেন :
وَيَسْاَلُوْنَكَ عَنْ ذِى الْقَرْنَيْنِؕ قُلْ سَاَتْلُوْا عَلَيْكُمْ مِّنْهُ ذِكْرًا
লোকেরা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বলো, অচিরেই আমি তোমাদের নিকট তার বিষয়ে বর্ণনা করব। (সূরা কাহফ- ৮৩)
আল্লাহ তাকে বাদশাহী দিয়েছিলেন :
اِنَّا مَكَّنَّا لَهٗ فِى الْاَرْضِ وَاٰتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا
আমি তো তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম। (সূরা কাহফ- ৮৪)
তিনি পশ্চিম দিকে অভিযান চালিয়ে এক জাতির কাছে গেলেন :
فَاَتْبَعَ سَبَبًا ‐ حَتّٰۤى اِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِيْ عَيْنٍ حَمِئَةٍ وَّوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًاؕ قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ اِمَّاۤ اَنْ تُعَذِّبَ وَاِمَّاۤ اَنْ تَتَّخِذَ فِيْهِمْ حُسْنَا
অতঃপর সে এক পথ অবলম্বন করল। চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌঁছল, তখন সেখানে সে সূর্যকে সাগরের কালো পানিতে ডুবতে দেখল এবং তার পাশে এক সম্প্রদায়কেও বসবাস করতে দেখতে পেল। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা এদের ব্যাপারটা সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার। সূরা কাহফ- ৮৫, ৮৬)
তিনি অত্যাচারীদেরকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন :
قَالَ اَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهٗ ثُمَّ يُرَدُّ اِلٰى رَبِّهٖ فَيُعَذِّبُهٗ عَذَابًا نُّكْرًا
সে বলল, যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে আরো কঠিন শাস্তি দেবেন। (সূরা কাহফ- ৮৭)
ভালো লোকদের সাথে ভালো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন :
وَاَمَّا مَنْ اٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهٗ جَزَآءَنِ الْحُسْنٰىۚ وَسَنَقُوْلُ لَهٗ مِنْ اَمْرِنَا يُسْرًا
তবে যে ঈমান আনয়ন করবে এবং সৎকাজ করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান; আর আমিও তার সাথে আমার কাজকর্ম সম্পাদনের সময় বিনম্র ও সহজ ব্যবহার করব। (সূরা কাহফ- ৮৮)
পূর্ব দিকে আরেকটি অভিযানে এক অসভ্য জাতির দেখা পেলেন :
ثُمَّ اَتْبَعَ سَبَبًا ‐ حَتّٰۤى اِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلٰى قَوْمٍ لَّمْ نَجْعَلْ لَّهُمْ مِّنْ دُوْنِهَا سِتْرًا
অতঃপর সে এক পথ ধরল, চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছল তখন সে দেখল যে, সেটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যতাপ হতে কোন অন্তরাল সৃষ্টি করিনি।
(সূরা কাহফ- ৮৯, ৯০)
অপর অভিযান চালিয়ে দু’টি পাহাড়ের মাঝখানে গেলেন :
ثُمَّ اَتْبَعَ سَبَبًا ‐ حَتّٰۤى اِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُوْنِهِمَا قَوْمًا لَّا يَكَادُوْنَ يَفْقَهُوْنَ قَوْلًا
অতঃপর সে এক পথ ধরল, চলতে চলতে সে যখন দু’টি পর্বতের মধ্যস্থলে পৌঁছল তখন সেখানে সে এক সম্প্রদায়কে পেল, যাদের কোন কথাই সে বুঝতে পারছিল না। (সূরা কাহফ- ৯২, ৯৩)
সেখানকার অধিবাসীরা তার কাছে ইয়াজুজ-মাজুজের ব্যাপারে অভিযোগ করল :
قَالُوْا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ اِنَّ يَاْجُوْجَ وَمَاْجُوْجَ مُفْسِدُوْنَ فِى الْاَرْضِ
তারা বলল, হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। (সূরা কাহফ- ৯৪)
তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একটি দেয়াল নির্মাণের আবেদন করল :
فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلٰۤى اَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا
আমরা কি আপনাকে খরচ দেব, যাতে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে এক প্রাচীর গড়ে দেবেন? (সূরা কাহফ- ৯৪)
তিনি পারিশ্রমিক ছাড়াই দেয়াল নির্মাণ করে দিলেন :
قَالَ مَا مَكَّنِيْ فِيْهِ رَبِّيْ خَيْرٌ فَاَعِيْنُوْنِيْ بِقُوَّةٍ اَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا ‐ اٰتُوْنِيْ زُبَرَ الْحَدِيْدِ حَتّٰۤى اِذَا سَاوٰى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انْفُخُوْاؕ حَتّٰۤى اِذَا جَعَلَهٗ نَارًا قَالَ اٰتُوْنِۤيْ اُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا
সে বলল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তাই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যস্থলে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে দেব। তোমরা আমার নিকট লোহার পাতসমূহ নিয়ে আসো। অতঃপর যখন মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান (পূর্ণ হয়ে লৌহ স্তুপগুলো দু’টি পাহাড়ের) সমান হলো তখন সে বলল, তোমরা ফুঁক দিতে থাকো। অতঃপর যখন তা আগুনকে (উত্তপ্ত) করল তখন সে বলল, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আসো, আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। (সূরা কাহফ- ৯৫, ৯৬)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ শাসনকর্তা হিসেবে প্রজাদেরকে লুটপাটকারীদের হাত থেকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। এ কাজের জন্য তোমাদের উপর আলাদা করে কোন কর বসানো আমার কাজ নয়। আল্লাহ যে অর্থভান্ডার আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এ কাজ সম্পাদনের জন্য তা-ই যথেষ্ট। তবে শারীরিক শ্রম দিয়ে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে।
ফলে ইয়াজুজ-মাজুজ আটকা পড়ল :
فَمَا اسْطَاعُوْاۤ اَنْ يَّظْهَرُوْهُ وَمَا اسْتَطَاعُوْا لَهٗ نَقْبًا ‐ قَالَ هٰذَا رَحْمَةٌ مِّنْ رَّبِّيْ
এরপর তারা সেটা অতিক্রম করতে পারল না এবং ভেদও করতে পারল না। তখন সে বলল, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। (সূরা কাহফ- ৯৭, ৯৮)
কিয়ামতের দিন এই দেয়াল ভেঙ্গে যাবে :
فَاِذَا جَآءَ وَعْدُ رَبِّيْ جَعَلَهٗ دَكَّآءَۚ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّيْ حَقًّا
যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন; আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য। (সূরা কাহফ- ৯৮)
তখন এরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে :
حَتّٰۤى اِذَا فُتِحَتْ يَاْجُوْجُ وَمَاْجُوْجُ وَهُمْ مِّنْ كُلِّ حَدَبٍ يَّنْسِلُوْنَ
এমনকি এক সময় ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্তি দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চভূমি হতে ছুটে আসতে থাকবে। (সূরা আম্বিয়া- ৯৬)
পরে সবাই আল্লাহর সামনে হাজির হবে :
وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَّمُوْجُ فِيْ بَعْضٍ وَّنُفِخَ فِى الصُّوْرِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا
সেদিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেব এ অবস্থায় যে, একদল আরেক দলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হবে এবং শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সকলকেই একত্র করব। (সূরা কাহফ- ৯৯)
যুলকারনাইনের কাহিনীর শিক্ষা : এ ঘটনা দ্বারা মানুষকে এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, তোমরা তো নিজেদের সামান্য ক্ষমতার দাপটে অহংকারী হয়ে যাও। অথচ যুলকারনাইনকে দেখো! তিনি এত বড় শাসক, এত জবরদস্ত বিজেতা, এত বিপুল উপায়-উপকরণের মালিক হয়েও নিজের পরিচয় ভুলে যাননি। তিনি নিজের স্রষ্টার সামনে সবসময় মাথা নত করে থাকতেন। অন্যদিকে তোমরা নিজেদের এ সামান্য পার্থিব সহায়-সম্পদকে চিরস্থায়ী মনে করে বসেছ। কিন্তু তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে মজবুত ও সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করেও মনে করতেন সর্বাবস্থায় একমাত্র আল্লাহর উপরই নির্ভর করা যেতে পারে, প্রাচীরের উপর নয়। আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন এ প্রাচীর শত্রুদের পথ রোধ করতে থাকবে এবং যখনই তাঁর ইচ্ছা ভিন্নতর হবে তখনই এ প্রাচীর ভেঙ্গে যাবে। তিনি নিছক একজন বিজেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন তাওহীদ ও আখিরাত বিশ্বাসী। তিনি তার রাজ্যে ইনসাফ ও দানশীলতার নীতি কার্যকর করেছিলেন। তিনি অন্যান্য মানুষের মতো সংকীর্ণ মনের অধিকারী ছিলেন না। সামান্য নেতৃত্ব লাভ করে মানুষ যেমন মনে করে- আমি অদ্বিতীয় এবং আমার মতো আর কেউ নেই, তিনি তেমনটি মনে করতেন না।
وَيَسْاَلُوْنَكَ عَنْ ذِى الْقَرْنَيْنِؕ قُلْ سَاَتْلُوْا عَلَيْكُمْ مِّنْهُ ذِكْرًا
লোকেরা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বলো, অচিরেই আমি তোমাদের নিকট তার বিষয়ে বর্ণনা করব। (সূরা কাহফ- ৮৩)
আল্লাহ তাকে বাদশাহী দিয়েছিলেন :
اِنَّا مَكَّنَّا لَهٗ فِى الْاَرْضِ وَاٰتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا
আমি তো তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম। (সূরা কাহফ- ৮৪)
তিনি পশ্চিম দিকে অভিযান চালিয়ে এক জাতির কাছে গেলেন :
فَاَتْبَعَ سَبَبًا ‐ حَتّٰۤى اِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِيْ عَيْنٍ حَمِئَةٍ وَّوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًاؕ قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ اِمَّاۤ اَنْ تُعَذِّبَ وَاِمَّاۤ اَنْ تَتَّخِذَ فِيْهِمْ حُسْنَا
অতঃপর সে এক পথ অবলম্বন করল। চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌঁছল, তখন সেখানে সে সূর্যকে সাগরের কালো পানিতে ডুবতে দেখল এবং তার পাশে এক সম্প্রদায়কেও বসবাস করতে দেখতে পেল। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা এদের ব্যাপারটা সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার। সূরা কাহফ- ৮৫, ৮৬)
তিনি অত্যাচারীদেরকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন :
قَالَ اَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهٗ ثُمَّ يُرَدُّ اِلٰى رَبِّهٖ فَيُعَذِّبُهٗ عَذَابًا نُّكْرًا
সে বলল, যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে আরো কঠিন শাস্তি দেবেন। (সূরা কাহফ- ৮৭)
ভালো লোকদের সাথে ভালো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন :
وَاَمَّا مَنْ اٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهٗ جَزَآءَنِ الْحُسْنٰىۚ وَسَنَقُوْلُ لَهٗ مِنْ اَمْرِنَا يُسْرًا
তবে যে ঈমান আনয়ন করবে এবং সৎকাজ করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান; আর আমিও তার সাথে আমার কাজকর্ম সম্পাদনের সময় বিনম্র ও সহজ ব্যবহার করব। (সূরা কাহফ- ৮৮)
পূর্ব দিকে আরেকটি অভিযানে এক অসভ্য জাতির দেখা পেলেন :
ثُمَّ اَتْبَعَ سَبَبًا ‐ حَتّٰۤى اِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلٰى قَوْمٍ لَّمْ نَجْعَلْ لَّهُمْ مِّنْ دُوْنِهَا سِتْرًا
অতঃপর সে এক পথ ধরল, চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছল তখন সে দেখল যে, সেটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যতাপ হতে কোন অন্তরাল সৃষ্টি করিনি।
(সূরা কাহফ- ৮৯, ৯০)
অপর অভিযান চালিয়ে দু’টি পাহাড়ের মাঝখানে গেলেন :
ثُمَّ اَتْبَعَ سَبَبًا ‐ حَتّٰۤى اِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُوْنِهِمَا قَوْمًا لَّا يَكَادُوْنَ يَفْقَهُوْنَ قَوْلًا
অতঃপর সে এক পথ ধরল, চলতে চলতে সে যখন দু’টি পর্বতের মধ্যস্থলে পৌঁছল তখন সেখানে সে এক সম্প্রদায়কে পেল, যাদের কোন কথাই সে বুঝতে পারছিল না। (সূরা কাহফ- ৯২, ৯৩)
সেখানকার অধিবাসীরা তার কাছে ইয়াজুজ-মাজুজের ব্যাপারে অভিযোগ করল :
قَالُوْا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ اِنَّ يَاْجُوْجَ وَمَاْجُوْجَ مُفْسِدُوْنَ فِى الْاَرْضِ
তারা বলল, হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। (সূরা কাহফ- ৯৪)
তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একটি দেয়াল নির্মাণের আবেদন করল :
فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلٰۤى اَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا
আমরা কি আপনাকে খরচ দেব, যাতে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে এক প্রাচীর গড়ে দেবেন? (সূরা কাহফ- ৯৪)
তিনি পারিশ্রমিক ছাড়াই দেয়াল নির্মাণ করে দিলেন :
قَالَ مَا مَكَّنِيْ فِيْهِ رَبِّيْ خَيْرٌ فَاَعِيْنُوْنِيْ بِقُوَّةٍ اَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا ‐ اٰتُوْنِيْ زُبَرَ الْحَدِيْدِ حَتّٰۤى اِذَا سَاوٰى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انْفُخُوْاؕ حَتّٰۤى اِذَا جَعَلَهٗ نَارًا قَالَ اٰتُوْنِۤيْ اُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا
সে বলল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তাই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যস্থলে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে দেব। তোমরা আমার নিকট লোহার পাতসমূহ নিয়ে আসো। অতঃপর যখন মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান (পূর্ণ হয়ে লৌহ স্তুপগুলো দু’টি পাহাড়ের) সমান হলো তখন সে বলল, তোমরা ফুঁক দিতে থাকো। অতঃপর যখন তা আগুনকে (উত্তপ্ত) করল তখন সে বলল, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আসো, আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। (সূরা কাহফ- ৯৫, ৯৬)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ শাসনকর্তা হিসেবে প্রজাদেরকে লুটপাটকারীদের হাত থেকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। এ কাজের জন্য তোমাদের উপর আলাদা করে কোন কর বসানো আমার কাজ নয়। আল্লাহ যে অর্থভান্ডার আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এ কাজ সম্পাদনের জন্য তা-ই যথেষ্ট। তবে শারীরিক শ্রম দিয়ে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে।
ফলে ইয়াজুজ-মাজুজ আটকা পড়ল :
فَمَا اسْطَاعُوْاۤ اَنْ يَّظْهَرُوْهُ وَمَا اسْتَطَاعُوْا لَهٗ نَقْبًا ‐ قَالَ هٰذَا رَحْمَةٌ مِّنْ رَّبِّيْ
এরপর তারা সেটা অতিক্রম করতে পারল না এবং ভেদও করতে পারল না। তখন সে বলল, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। (সূরা কাহফ- ৯৭, ৯৮)
কিয়ামতের দিন এই দেয়াল ভেঙ্গে যাবে :
فَاِذَا جَآءَ وَعْدُ رَبِّيْ جَعَلَهٗ دَكَّآءَۚ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّيْ حَقًّا
যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন; আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য। (সূরা কাহফ- ৯৮)
তখন এরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে :
حَتّٰۤى اِذَا فُتِحَتْ يَاْجُوْجُ وَمَاْجُوْجُ وَهُمْ مِّنْ كُلِّ حَدَبٍ يَّنْسِلُوْنَ
এমনকি এক সময় ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্তি দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চভূমি হতে ছুটে আসতে থাকবে। (সূরা আম্বিয়া- ৯৬)
পরে সবাই আল্লাহর সামনে হাজির হবে :
وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَّمُوْجُ فِيْ بَعْضٍ وَّنُفِخَ فِى الصُّوْرِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا
সেদিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেব এ অবস্থায় যে, একদল আরেক দলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হবে এবং শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সকলকেই একত্র করব। (সূরা কাহফ- ৯৯)
যুলকারনাইনের কাহিনীর শিক্ষা : এ ঘটনা দ্বারা মানুষকে এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, তোমরা তো নিজেদের সামান্য ক্ষমতার দাপটে অহংকারী হয়ে যাও। অথচ যুলকারনাইনকে দেখো! তিনি এত বড় শাসক, এত জবরদস্ত বিজেতা, এত বিপুল উপায়-উপকরণের মালিক হয়েও নিজের পরিচয় ভুলে যাননি। তিনি নিজের স্রষ্টার সামনে সবসময় মাথা নত করে থাকতেন। অন্যদিকে তোমরা নিজেদের এ সামান্য পার্থিব সহায়-সম্পদকে চিরস্থায়ী মনে করে বসেছ। কিন্তু তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে মজবুত ও সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করেও মনে করতেন সর্বাবস্থায় একমাত্র আল্লাহর উপরই নির্ভর করা যেতে পারে, প্রাচীরের উপর নয়। আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন এ প্রাচীর শত্রুদের পথ রোধ করতে থাকবে এবং যখনই তাঁর ইচ্ছা ভিন্নতর হবে তখনই এ প্রাচীর ভেঙ্গে যাবে। তিনি নিছক একজন বিজেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন তাওহীদ ও আখিরাত বিশ্বাসী। তিনি তার রাজ্যে ইনসাফ ও দানশীলতার নীতি কার্যকর করেছিলেন। তিনি অন্যান্য মানুষের মতো সংকীর্ণ মনের অধিকারী ছিলেন না। সামান্য নেতৃত্ব লাভ করে মানুষ যেমন মনে করে- আমি অদ্বিতীয় এবং আমার মতো আর কেউ নেই, তিনি তেমনটি মনে করতেন না।