hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৩

অধ্যায়- ১ : ঈমানের গুরুত্ব

ঈমান মজবুত অবলম্বন :

فَمَنْ يَّكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنْ ۢبِاللهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰى لَا انْفِصَامَ لَهَا

সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, সে যেন এমন এক মজবুত রশি আঁকড়ে ধরল, যা কখনো ছিড়বে না। (সূরা বাক্বারা- ২৫৬)

يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِى الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِى الْاٰخِرَةِؕ وَيُضِلُّ اللهُ الظَّالِمِيْنَۚ وَيَفْعَلُ اللهُ مَا يَشَآءُ

যারা শাশ্বত বাণীর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যালিমদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন। আর আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন। (সূরা ইবরাহীম- ২৭)

ঈমান পরকালের ব্যবসার মূল পুঁজি :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا هَلْ اَدُلُّكُمْ عَلٰى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابٍ اَلِيْمٍ ‐ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَرَسُولِهٖ وَتُجَاهِدُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ بِاَمْوَالِكُمْ وَاَنْفُسِكُمْ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ

হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন বাণিজ্যের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? (তা এই যে) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে! (সূরা সাফ- ১০, ১১)

ঈমান কল্যাণ ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি :

وَلَوْ اَنَّ اَهْلَ الْقُرٰۤى اٰمَنُوْا وَاتَّقُوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَالْاَرْضِۚ وَلٰكِنْ كَذَّبُوْا فَاَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ

যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করেছি। (সূরা আ‘রাফ- ৯৬)

ঈমান শাস্তি থেকে বাঁচার উপায় :

مَا يَفْعَلُ اللهُ بِعَذَابِكُمْ اِنْ شَكَرْتُمْ وَاٰمَنْتُمْؕ وَكَانَ اللهُ شَاكِرًا عَلِيْمًا

তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমান আনয়ন কর, তবে তোমাদেরকে শাস্তি দেয়াতে আল্লাহর কী লাভ? আর আল্লাহ তো পুরস্কারদাতা ও সর্বজ্ঞ। (সূরা নিসা - ১৪৭)

কুরআন ঈমানের পরিচয় দেয় :

وَكَذٰلِكَ اَوْحَيْنَاۤ اِلَيْكَ رُوْحًا مِّنْ اَمْرِنَاؕ مَا كُنْتَ تَدْرِيْ مَا الْكِتَابُ وَلَا الْاِيْمَانُ وَلٰكِنْ جَعَلْنَاهُ نُوْرًا نَّهْدِيْ بِه مَنْ نَّشَآءُ مِنْ عِبَادِنَاؕ وَاِنَّكَ لَتَهْدِيْۤ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ

আর এভাবেই আমি আমার নির্দেশে তোমার প্রতি ওহী করেছি রূহ তথা আল কুরআন। তুমি তো জানতে না যে, কিতাব কী এবং ঈমান কোন জিনিস। পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো, যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি। নিশ্চয় তুমি সরল পথের দিকেই পথপ্রদর্শন করে থাক। (সূরা শূরা - ৫২)

কুরআন পড়লে ঈমান বৃদ্ধি পায় :

اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَاِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ اٰيَاتُهٗ زَادَتْهُمْ اِيْمَانًا وَّعَلٰى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ

নিশ্চয় মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে কম্পিত হয় এবং তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হলে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি হয়। আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে থাকে। (সূরা আনফাল- ২)

وَاِذَا مَاۤ اُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْهُمْ مَّنْ يَّقُوْلُ اَيُّكُمْ زَادَتْهُ هٰذِه ۤ اِيْمَانًاۚ فَاَمَّا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فَزَادَتْهُمْ اِيْمَانًا وَّهُمْ يَسْتَبْشِرُوْنَ

যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এটা তোমাদের মধ্যে কারো ঈমান বৃদ্ধি করল কি? অতঃপর যারা ঈমান আনয়ন করেছে এতে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পায় এবং তারাই আনন্দিত হয়। (সূরা তাওবা - ১২৪)

ব্যাখ্যা : ঈমান বৃদ্ধির অর্থ প্রতিটি পরীক্ষার সময় আল্লাহ তাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং সঠিক পথে চলার সুযোগ দান করেন। তাদেরকে অসৎকাজ ও ভ্রান্তপথ থেকে রক্ষা করেন। ফলে তারা তাঁর পথনির্দেশনার মাধ্যমে সত্য ও সঠিক পথে এগিয়ে চলতে সক্ষম হয়।

কালিমায়ে তায়্যিবার উদাহরণ :

اَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ اَصْلُهَا ثَابِتٌ وَّفَرْعُهَا فِى السَّمَآءِ ‐ تُؤْتِۤيْ اُكُلَهَا كُلَّ حِيْنٍ ۢبِاِذْنِ رَبِّهَاۚ وَيَضْرِبُ اللهُ الْاَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ

তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কীভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? পবিত্র বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট বৃক্ষের সাথে, যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা ঊর্ধ্বে বিস্তৃত, যা প্রত্যেক মওসুমে তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে ফল দান করে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য এসব উপমা দিয়ে থাকেন, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। (সূরা ইবরাহীম - ২৪, ২৫)

ব্যাখ্যা : ‘কালিমায়ে তায়্যিবা’ এর শাব্দিক অর্থ পবিত্র কথা। কিন্তু এ শব্দের মাধ্যমে যে তাৎপর্য গ্রহণ করা হয়েছে তা হচ্ছে, এমন সত্য কথা এবং এমন পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস, যা পুরোপুরি সত্য ও সরলতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এ উক্তি ও আকীদা কুরআন মাজীদের দৃষ্টিতে অপরিহার্যভাবে এমন একটি কথা ও বিশ্বাস হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে তাওহীদের স্বীকৃতি, নবীগণ ও আসমানী কিতাবসমূহের স্বীকৃতি এবং আখিরাতের স্বীকৃতি। কারণ কুরআন এ বিষয়গুলোকেই মৌলিক ও সত্য হিসেবে পেশ করে। এটি একটি ফলপ্রসূ কালিমা। কোন ব্যক্তি বা জাতি এর ভিত্তিতে জীবনব্যবস্থা গড়ে তুললে প্রতি মুহূর্তে সে তার সুফল লাভ করতে থাকে। এ কালিমা চিন্তাধারায় পরিপক্কতা, স্বভাবে প্রশান্তি, মেজাজে ভারসাম্য, চরিত্রে পবিত্রতা, আত্মায় প্রফুল্লতা, শরীরে পরিচ্ছন্নতা, আচার-ব্যবহারে মাধুর্যতা, লেনদেনে সততা, কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, অঙ্গীকারে দৃঢ়তা, সামাজিক জীবন-যাপনে স্বচ্ছতা, কৃষ্টি-কালচারে ঔদার্য ও মহত্ব, সভ্যতায় ভারসাম্য, অর্থনীতিতে ন্যায়পরায়ণতা, রাজনীতিতে বিশ্বস্ততা, যুদ্ধে সৌজন্যতা, সন্ধিতে আন্তরিকতা এবং চুক্তিতে বিশ্বস্ততা সৃষ্টি করে। এটি এমন একটি পরশপাথর, যার প্রভাব কেউ যথাযথভাবে গ্রহণ করলে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। এ কালিমার বদৌলতে তারা দুনিয়ায় একটি স্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গী, শক্তিশালী চিন্তাধারা এবং একটি ব্যাপক জীবনদর্শন লাভ করে। জীবনের সকল সমস্যার সামাধানে তা এমন এক চাবির ন্যায় কাজ করে, যা দিয়ে সকল তালা খোলা যায়। এর সাহায্যে জীবন-যাপনের এমন কতগুলো মূলনীতি পাওয়া যায়, যা একদিকে হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে প্রশান্তি এনে দেয় এবং অন্যদিকে প্রচেষ্টা ও কর্মের পথে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ানোর এবং অস্থিরতার শিকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। তারপর যখন তারা মৃত্যুর সীমানা অতিক্রম করে পরলোকের সীমান্তে পা রাখে, তখন সেখানে তারা চিন্তিত হয় না। কারণ সেখানে তাদের প্রত্যাশানুযায়ী সবকিছু পেয়ে থাকে।