১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫৩৬
অধ্যায়- ১৯ : মূসা (আঃ) এর পক্ষের এক মুমিন ব্যক্তির দাওয়াত
সে মূসা (আঃ) কে হত্যা করতে নিষেধ করল :
وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌۗ مِنْ اٰلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ اِيْمَانَهٗۤ اَتَقْتُلُوْنَ رَجُلًا اَنْ يَّقُوْلَ رَبِّيَ اللهُ وَقَدْ جَآءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَّبِّكُمْ
ফিরাউন বংশের এক ব্যক্তি যে মুমিন ছিল এবং নিজের ঈমান গোপন রাখত সে বলল, তোমরা কি ঐ ব্যক্তিকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে- আমার প্রতিপালক আল্লাহ? অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট এসেছে। (সূরা মু’মিনু ২৮)
সে জাতিকে আযাবের ভয় দেখাল :
وَاِنْ يَّكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهٗۚ وَاِنْ يَّكُ صَادِقًا يُّصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِيْ يَعِدُكُمْؕ اِنَّ اللهَ لَا يَهْدِيْ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ
যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যার প্রতিফল সে ভোগ করবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে তোমাদেরকে যে শাস্তির কথা বলে তার কিছু অংশ তোমাদের উপর আপতিত হবেই। আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (সূরা মু’মিনু ২৮)
পার্থিব ক্ষমতার বাস্তবতা তুলে ধরল :
يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِيْنَ فِى الْاَرْضِؗ فَمَنْ يَّنْصُرُنَا مِنْ ۢبَأْسِ اللهِ اِنْ جَآءَنَا
হে আমার সম্প্রদায়! আজকের কর্তৃত্ব তোমাদের হাতে, পৃথিবীতে এখন তোমরাই প্রবল। কিন্তু আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে? (সূরা মু’মিনু ২৯)
ফিরাউন নিজের সিদ্ধান্তকেই সঠিক মনে করল :
قَالَ فِرْعَوْنُ مَاۤ اُرِيْكُمْ اِلَّا مَاۤ اَرٰى وَمَاۤ اَهْدِيْكُمْ اِلَّا سَبِيْلَ الرَّشَادِ
ফিরাউন বলল, আমি যা বুঝি তোমাদেরকে তা–ই বলছি। আমি তোমাদেরকে সৎপথই দেখিয়ে থাকি।
(সূরা মু’মিনু ২৯)
মুমিন লোকটি পূর্বের ইতিহাস মনে করিয়ে দিল :
وَقَالَ الَّذِيْۤ اٰمَنَ يَا قَوْمِ اِنِّۤيْ اَخَافُ عَلَيْكُمْ مِّثْلَ يَوْمِ الْاَحْزَابِ ‐ مِثْلَ دَأْبِ قَوْمِ نُوْحٍ وَّعَادٍ وَّثَمُوْدَ وَالَّذِيْنَ مِنْ ۢبَعْدِهِمْ
মুমিন ব্যক্তিটি বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ আশঙ্কা করি। যেমন নূহ (আঃ) এর সম্প্রদায়, আদ, সামূদ এবং তাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। (সূরা মু’মিনু ৩০, ৩১)
কিয়ামত দিবসের ভয় দেখাল :
وَيَا قَوْمِ اِنِّۤيْ اَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ ‐ يَوْمَ تُوَلُّوْنَ مُدْبِرِيْنَۚ مَا لَكُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ عَاصِمٍؕ وَمَنْ يُّضْلِلِ اللهُ فَمَا لَهٗ مِنْ هَادٍ
হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য ফরিয়াদ (কিয়ামত) দিবসের আশঙ্কা করি। যেদিন তোমরা পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু আল্লাহর শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করার মতো কেউ থাকবে না। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। (সূরা মু’মিনু ৩২, ৩৩)
ইউসুফ (আঃ) এর কথা স্মরণ করিয়ে দিল :
وَلَقَدْ جَآءَكُمْ يُوْسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِيْ شَكٍّ مِّمَّا جَآءَكُمْ بِه ۚ حَتّٰۤى اِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَّبْعَثَ اللهُ مِنْ ۢبَعْدِه رَسُوْلًا ؕ كَذٰلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُّرْتَابٌ
ইতোপূর্বেও তোমাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন সহকারে ইউসুফ (আঃ) এসেছিলেন, কিন্তু সে যা নিয়ে এসেছিল তোমরা তাতে বার বার সন্দেহ পোষণ করতে। পরিশেষে যখন তাঁর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলে, এরপর আল্লাহ আর কখনো কাউকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করবেন না। এভাবে আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী ও সন্দেহ পোষণকারীদেরকে বিভ্রান্ত করেন। (সূরা মু’মিনু ৩৪)
আল্লাহর বিরুদ্ধে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার পরিণাম জানানো হলো :
اَلَّذِيْنَ يُجَادِلُوْنَ فِۤيْ اٰيَاتِ اللهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ اَتَاهُمْؕ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللهِ وَعِنْدَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاؕ كَذٰلِكَ يَطْبَعُ اللهُ عَلٰى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, (তাদের এ কর্ম) আল্লাহ এবং মুমিনদের নিকট অতিশয় ঘৃণিত। এভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়ে মোহর মেরে দেন। (সূরা মু’মিনু ৩৫)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ বিনা কারণে কারো মনে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয় না। যার মধ্যে অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি হয় লানতের এ মোহর কেবল তার মনেই লাগানো হয়। ‘তাকাববুর’ অর্থ ব্যক্তির মিথ্যা অহংকার, যার কারণে ন্যায় ও সত্যের সামনে মাথা নত করাকে সে তার মর্যাদার চেয়ে নীচু কাজ বলে মনে করে। স্বেচ্ছাচারিতা অর্থ আল্লাহর সৃষ্টির উপর যুলুম করা। এ যুলুমের অবাধ লাইসেন্স লাভের জন্য ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়াতের বাধ্যবাধকতা মেনে নেয়া থেকে দূরে থাকে।
ফিরাউন হামানকে প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ দিল :
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِيْ صَرْحًا لَّعَلِّيْۤ اَبْلُغُ الْاَسْبَابَ
ফিরাউন বলল, হে হামান! আমার জন্য তুমি এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি (মূসার প্রভুকে দেখার) মাধ্যম পাই। (সূরা মু’মিনু ৩৬)
সে মূসা (আঃ) এর প্রতিপালককে দেখার দুঃসাহস করল :
اَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَاَطَّلِعَ اِلٰۤى اِلٰهِ مُوْسٰى وَاِنِّيْ لَاَظُنُّهٗ كَاذِبًاؕ وَكَذٰلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوْٓءُ عَمَلِه وَصُدَّ عَنِ السَّبِيْلِؕ وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ اِلَّا فِيْ تَبَابٍ
যা (প্রাসাদটি) হবে আকাশে উঠার মাধ্যম, যাতে করে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। আমি তো তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। এভাবেই ফিরাউনের নিকট তার মন্দ কর্মগুলোকে শোভনীয় করা হয়েছিল এবং তাকে সরল পথ হতে প্রতিহত করা হয়েছিল। অতঃপর ফিরাউনের ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল। (সূরা মু’মিনু ৩৭)
মুমিন লোকটি জাতিকে তার অনুসরণের দাওয়াত দিল :
وَقَالَ الَّذِيْۤ اٰمَنَ يَا قَوْمِ اتَّبِعُوْنِ اَهْدِكُمْ سَبِيْلَ الرَّشَادِ
যে ব্যক্তি ঈমান এনেছিল সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমার অনুসরণ করো, আমি তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করব। (সূরা মু’মিনু ৩৮)
সে পার্থিব জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরল :
يَا قَوْمِ اِنَّمَا هٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌؗ وَاِنَّ الْاٰخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ
হে আমার সম্প্রদায়! নিশ্চয় পার্থিব জীবন (অস্থায়ী) উপভোগের বস্তু মাত্র। আর আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। (সূরা মু’মিনু ৩৯)
সে জান্নাতের ফযীলত বর্ণনা করল :
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزٰۤى اِلَّا مِثْلَهَاۚ وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُوْنَ فِيْهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ
যে ব্যক্তি মন্দ আমল করবে, সে শুধু তার অনুরূপ শাস্তি পাবে। আর পুরুষ কিংবা নারীদের মধ্যে যারা মুমিন হয়ে সৎ আমল করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর সেখানে তারা অসংখ্য রিযিকপ্রাপ্ত হবে। (সূরা মু’মিনু ৪০)
হৃদয়ের আবেগ দিয়ে বুঝাতে চেষ্ট করল :
وَيَا قَوْمِ مَا لِۤيْ اَدْعُوْكُمْ اِلَى النَّجَاةِ وَتَدْعُوْنَنِيْۤ اِلَى النَّارِ
হে আমার সম্প্রদায়! এ কেমন কথা! আমি তোমাদেরকে আহবান করছি মুক্তির দিকে, আর তোমরা আমাকে আহবান করছ জাহান্নামের দিকে। (সূরা মু’মিনু ৪১)
মুমিন লোকটি জাতির ভুল তুলে ধরল :
تَدْعُوْنَنِيْ لِاَكْفُرَ بِاللهِ وَاُشْرِكَ بِه مَا لَيْسَ لِيْ بِه عِلْمٌؗ وَاَنَاْ اَدْعُوْكُمْ اِلَى الْعَزِيْزِ الْغَفَّارِ
তোমরা কি আমাকে আল্লাহকে অস্বীকার করা এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করার দিকে আহবান করছ, যা সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান নেই? পক্ষান্তরে আমি তোমাদেরকে আহবান করছি মহাপরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল আল্লাহর দিকে। (সূরা মু’মিনু ৪২)
সে শিরকের অসারতা প্রমাণ করল :
لَا جَرَمَ اَنَّمَا تَدْعُوْنَنِيْۤ اِلَيْهِ لَيْسَ لَهٗ دَعْوَةٌ فِى الدُّنْيَا وَلَا فِى الْاٰخِرَةِ وَاَنَّ مَرَدَّنَاۤ اِلَى اللهِ وَاَنَّ الْمُسْرِفِيْنَ هُمْ اَصْحَابُ النَّارِ
নিশ্চয় তোমরা আমাকে ডাকছ এমন একজনের দিকে, যে দুনিয়া ও আখিরাতে কোথাও আহবানযোগ্য নয়। বস্তুত আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী। (সূরা মু’মিনু ৪৩)
অবশেষে সে আল্লাহর উপর ভরসা করল :
فَسَتَذْكُرُوْنَ مَاۤ اَقُوْلُ لَكُمْؕ وَاُفَوِّضُ اَمْرِيْۤ اِلَى اللهِؕ اِنَّ اللهَ بَصِيْرٌ ۢبِالْعِبَادِ
সুতরাং আমি তোমাদেরকে যা বলছি, তোমরা তা অচিরেই স্মরণ করবে এবং আমি আমার বিষয়টি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করছি। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখেন। (সূরা মু’মিনু ৪৪)
ব্যাখ্যা : এ আয়াতাংশ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ কথা বলার সময় উক্ত মুমিন ব্যক্তির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এ সত্য বলার অপরাধে সে ফিরাউনের গোটা রাজশক্তির রোষানলে পড়বে এবং তাকে শুধু তার সম্মান ও মর্যাদা হারাতে হবে তাই নয়, জীবনের আশাও ছেড়ে দিতে হবে।
আল্লাহ তাকে জাতির ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করলেন :
فَوَقَاهُ اللهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوْا وَحَاقَ بِاٰلِ فِرْعَوْنَ سُوْٓءُ الْعَذَابِ
অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। আর ফিরাউন সম্প্রদায়ের উপর পতিত হলো কঠিন আযাব। (সূরা মু’মিনু ৪৫)
ব্যাখ্যা : এ থেকে জানা যায়, ফিরাউনের সাম্রাজ্যে সে ব্যক্তি এতটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল যে, ভরা মজলিসে ফিরাউনের মুখের উপরে এ ধরনের সত্য কথা বলা সত্ত্বেও তাকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেয়ার সাহস হয়নি। এ কারণে তাকে হত্যা করার জন্য ফিরাউন ও তার সহযোগীদের গোপনে ষড়যন্ত্র করতে হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে দেননি।
وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌۗ مِنْ اٰلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ اِيْمَانَهٗۤ اَتَقْتُلُوْنَ رَجُلًا اَنْ يَّقُوْلَ رَبِّيَ اللهُ وَقَدْ جَآءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَّبِّكُمْ
ফিরাউন বংশের এক ব্যক্তি যে মুমিন ছিল এবং নিজের ঈমান গোপন রাখত সে বলল, তোমরা কি ঐ ব্যক্তিকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে- আমার প্রতিপালক আল্লাহ? অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট এসেছে। (সূরা মু’মিনু ২৮)
সে জাতিকে আযাবের ভয় দেখাল :
وَاِنْ يَّكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهٗۚ وَاِنْ يَّكُ صَادِقًا يُّصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِيْ يَعِدُكُمْؕ اِنَّ اللهَ لَا يَهْدِيْ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ
যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যার প্রতিফল সে ভোগ করবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে তোমাদেরকে যে শাস্তির কথা বলে তার কিছু অংশ তোমাদের উপর আপতিত হবেই। আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (সূরা মু’মিনু ২৮)
পার্থিব ক্ষমতার বাস্তবতা তুলে ধরল :
يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِيْنَ فِى الْاَرْضِؗ فَمَنْ يَّنْصُرُنَا مِنْ ۢبَأْسِ اللهِ اِنْ جَآءَنَا
হে আমার সম্প্রদায়! আজকের কর্তৃত্ব তোমাদের হাতে, পৃথিবীতে এখন তোমরাই প্রবল। কিন্তু আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে? (সূরা মু’মিনু ২৯)
ফিরাউন নিজের সিদ্ধান্তকেই সঠিক মনে করল :
قَالَ فِرْعَوْنُ مَاۤ اُرِيْكُمْ اِلَّا مَاۤ اَرٰى وَمَاۤ اَهْدِيْكُمْ اِلَّا سَبِيْلَ الرَّشَادِ
ফিরাউন বলল, আমি যা বুঝি তোমাদেরকে তা–ই বলছি। আমি তোমাদেরকে সৎপথই দেখিয়ে থাকি।
(সূরা মু’মিনু ২৯)
মুমিন লোকটি পূর্বের ইতিহাস মনে করিয়ে দিল :
وَقَالَ الَّذِيْۤ اٰمَنَ يَا قَوْمِ اِنِّۤيْ اَخَافُ عَلَيْكُمْ مِّثْلَ يَوْمِ الْاَحْزَابِ ‐ مِثْلَ دَأْبِ قَوْمِ نُوْحٍ وَّعَادٍ وَّثَمُوْدَ وَالَّذِيْنَ مِنْ ۢبَعْدِهِمْ
মুমিন ব্যক্তিটি বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ আশঙ্কা করি। যেমন নূহ (আঃ) এর সম্প্রদায়, আদ, সামূদ এবং তাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। (সূরা মু’মিনু ৩০, ৩১)
কিয়ামত দিবসের ভয় দেখাল :
وَيَا قَوْمِ اِنِّۤيْ اَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ ‐ يَوْمَ تُوَلُّوْنَ مُدْبِرِيْنَۚ مَا لَكُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ عَاصِمٍؕ وَمَنْ يُّضْلِلِ اللهُ فَمَا لَهٗ مِنْ هَادٍ
হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য ফরিয়াদ (কিয়ামত) দিবসের আশঙ্কা করি। যেদিন তোমরা পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু আল্লাহর শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করার মতো কেউ থাকবে না। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। (সূরা মু’মিনু ৩২, ৩৩)
ইউসুফ (আঃ) এর কথা স্মরণ করিয়ে দিল :
وَلَقَدْ جَآءَكُمْ يُوْسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِيْ شَكٍّ مِّمَّا جَآءَكُمْ بِه ۚ حَتّٰۤى اِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَّبْعَثَ اللهُ مِنْ ۢبَعْدِه رَسُوْلًا ؕ كَذٰلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُّرْتَابٌ
ইতোপূর্বেও তোমাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন সহকারে ইউসুফ (আঃ) এসেছিলেন, কিন্তু সে যা নিয়ে এসেছিল তোমরা তাতে বার বার সন্দেহ পোষণ করতে। পরিশেষে যখন তাঁর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলে, এরপর আল্লাহ আর কখনো কাউকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করবেন না। এভাবে আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী ও সন্দেহ পোষণকারীদেরকে বিভ্রান্ত করেন। (সূরা মু’মিনু ৩৪)
আল্লাহর বিরুদ্ধে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার পরিণাম জানানো হলো :
اَلَّذِيْنَ يُجَادِلُوْنَ فِۤيْ اٰيَاتِ اللهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ اَتَاهُمْؕ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللهِ وَعِنْدَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاؕ كَذٰلِكَ يَطْبَعُ اللهُ عَلٰى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, (তাদের এ কর্ম) আল্লাহ এবং মুমিনদের নিকট অতিশয় ঘৃণিত। এভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়ে মোহর মেরে দেন। (সূরা মু’মিনু ৩৫)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ বিনা কারণে কারো মনে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয় না। যার মধ্যে অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি হয় লানতের এ মোহর কেবল তার মনেই লাগানো হয়। ‘তাকাববুর’ অর্থ ব্যক্তির মিথ্যা অহংকার, যার কারণে ন্যায় ও সত্যের সামনে মাথা নত করাকে সে তার মর্যাদার চেয়ে নীচু কাজ বলে মনে করে। স্বেচ্ছাচারিতা অর্থ আল্লাহর সৃষ্টির উপর যুলুম করা। এ যুলুমের অবাধ লাইসেন্স লাভের জন্য ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়াতের বাধ্যবাধকতা মেনে নেয়া থেকে দূরে থাকে।
ফিরাউন হামানকে প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ দিল :
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِيْ صَرْحًا لَّعَلِّيْۤ اَبْلُغُ الْاَسْبَابَ
ফিরাউন বলল, হে হামান! আমার জন্য তুমি এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি (মূসার প্রভুকে দেখার) মাধ্যম পাই। (সূরা মু’মিনু ৩৬)
সে মূসা (আঃ) এর প্রতিপালককে দেখার দুঃসাহস করল :
اَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَاَطَّلِعَ اِلٰۤى اِلٰهِ مُوْسٰى وَاِنِّيْ لَاَظُنُّهٗ كَاذِبًاؕ وَكَذٰلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوْٓءُ عَمَلِه وَصُدَّ عَنِ السَّبِيْلِؕ وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ اِلَّا فِيْ تَبَابٍ
যা (প্রাসাদটি) হবে আকাশে উঠার মাধ্যম, যাতে করে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। আমি তো তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। এভাবেই ফিরাউনের নিকট তার মন্দ কর্মগুলোকে শোভনীয় করা হয়েছিল এবং তাকে সরল পথ হতে প্রতিহত করা হয়েছিল। অতঃপর ফিরাউনের ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল। (সূরা মু’মিনু ৩৭)
মুমিন লোকটি জাতিকে তার অনুসরণের দাওয়াত দিল :
وَقَالَ الَّذِيْۤ اٰمَنَ يَا قَوْمِ اتَّبِعُوْنِ اَهْدِكُمْ سَبِيْلَ الرَّشَادِ
যে ব্যক্তি ঈমান এনেছিল সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমার অনুসরণ করো, আমি তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করব। (সূরা মু’মিনু ৩৮)
সে পার্থিব জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরল :
يَا قَوْمِ اِنَّمَا هٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌؗ وَاِنَّ الْاٰخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ
হে আমার সম্প্রদায়! নিশ্চয় পার্থিব জীবন (অস্থায়ী) উপভোগের বস্তু মাত্র। আর আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। (সূরা মু’মিনু ৩৯)
সে জান্নাতের ফযীলত বর্ণনা করল :
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزٰۤى اِلَّا مِثْلَهَاۚ وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُوْنَ فِيْهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ
যে ব্যক্তি মন্দ আমল করবে, সে শুধু তার অনুরূপ শাস্তি পাবে। আর পুরুষ কিংবা নারীদের মধ্যে যারা মুমিন হয়ে সৎ আমল করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর সেখানে তারা অসংখ্য রিযিকপ্রাপ্ত হবে। (সূরা মু’মিনু ৪০)
হৃদয়ের আবেগ দিয়ে বুঝাতে চেষ্ট করল :
وَيَا قَوْمِ مَا لِۤيْ اَدْعُوْكُمْ اِلَى النَّجَاةِ وَتَدْعُوْنَنِيْۤ اِلَى النَّارِ
হে আমার সম্প্রদায়! এ কেমন কথা! আমি তোমাদেরকে আহবান করছি মুক্তির দিকে, আর তোমরা আমাকে আহবান করছ জাহান্নামের দিকে। (সূরা মু’মিনু ৪১)
মুমিন লোকটি জাতির ভুল তুলে ধরল :
تَدْعُوْنَنِيْ لِاَكْفُرَ بِاللهِ وَاُشْرِكَ بِه مَا لَيْسَ لِيْ بِه عِلْمٌؗ وَاَنَاْ اَدْعُوْكُمْ اِلَى الْعَزِيْزِ الْغَفَّارِ
তোমরা কি আমাকে আল্লাহকে অস্বীকার করা এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করার দিকে আহবান করছ, যা সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান নেই? পক্ষান্তরে আমি তোমাদেরকে আহবান করছি মহাপরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল আল্লাহর দিকে। (সূরা মু’মিনু ৪২)
সে শিরকের অসারতা প্রমাণ করল :
لَا جَرَمَ اَنَّمَا تَدْعُوْنَنِيْۤ اِلَيْهِ لَيْسَ لَهٗ دَعْوَةٌ فِى الدُّنْيَا وَلَا فِى الْاٰخِرَةِ وَاَنَّ مَرَدَّنَاۤ اِلَى اللهِ وَاَنَّ الْمُسْرِفِيْنَ هُمْ اَصْحَابُ النَّارِ
নিশ্চয় তোমরা আমাকে ডাকছ এমন একজনের দিকে, যে দুনিয়া ও আখিরাতে কোথাও আহবানযোগ্য নয়। বস্তুত আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী। (সূরা মু’মিনু ৪৩)
অবশেষে সে আল্লাহর উপর ভরসা করল :
فَسَتَذْكُرُوْنَ مَاۤ اَقُوْلُ لَكُمْؕ وَاُفَوِّضُ اَمْرِيْۤ اِلَى اللهِؕ اِنَّ اللهَ بَصِيْرٌ ۢبِالْعِبَادِ
সুতরাং আমি তোমাদেরকে যা বলছি, তোমরা তা অচিরেই স্মরণ করবে এবং আমি আমার বিষয়টি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করছি। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখেন। (সূরা মু’মিনু ৪৪)
ব্যাখ্যা : এ আয়াতাংশ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ কথা বলার সময় উক্ত মুমিন ব্যক্তির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এ সত্য বলার অপরাধে সে ফিরাউনের গোটা রাজশক্তির রোষানলে পড়বে এবং তাকে শুধু তার সম্মান ও মর্যাদা হারাতে হবে তাই নয়, জীবনের আশাও ছেড়ে দিতে হবে।
আল্লাহ তাকে জাতির ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করলেন :
فَوَقَاهُ اللهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوْا وَحَاقَ بِاٰلِ فِرْعَوْنَ سُوْٓءُ الْعَذَابِ
অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। আর ফিরাউন সম্প্রদায়ের উপর পতিত হলো কঠিন আযাব। (সূরা মু’মিনু ৪৫)
ব্যাখ্যা : এ থেকে জানা যায়, ফিরাউনের সাম্রাজ্যে সে ব্যক্তি এতটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল যে, ভরা মজলিসে ফিরাউনের মুখের উপরে এ ধরনের সত্য কথা বলা সত্ত্বেও তাকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেয়ার সাহস হয়নি। এ কারণে তাকে হত্যা করার জন্য ফিরাউন ও তার সহযোগীদের গোপনে ষড়যন্ত্র করতে হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে দেননি।