hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪১৩

অধ্যায়- ১১ : জাহান্নামে প্রবেশের অবস্থা

জাহান্নামীদেরকে ধাক্কা মেরে জাহান্নামের দিকে নেয়া হবে :

يَوْمَ يُدَعُّوْنَ اِلٰى نَارِ جَهَنَّمَ دَعًّا – هٰذِهِ النَّارُ الَّتِيْ كُنْتُمْ بِهَا تُكَذِّبُوْنَ

অপরাধীদেরকে জাহান্নামের দিকে ধাক্কা মেরে নেয়া হবে আর বলা হবে, এ হলো সেই আগুন যাকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে। (সূরা তূর- ১৩, ১৪)

وَنَسُوْقُ الْمُجْرِمِيْنَ اِلٰى جَهَنَّمَ وِرْدًا

আমি পাপীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নেব। (সূরা মারইয়াম– ৮৬)

وَمَنْ كَفَرَ فَاُمَتِّعُهٗ قَلِيْلًا ثُمَّ اَضْطَرُّهٗۤ اِلٰى عَذَابِ النَّارِؕ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ

যারা কুফরী করে তাদেরকে আমি দুনিয়াতে কিছু ভোগের সামগ্রী দিয়ে থাকি। পরে তাদেরকে জাহান্নামের আযাবের দিকে টেনে–হেঁচড়ে নিয়ে যাব। এ প্রত্যাবর্তন কতই না নিকৃষ্ট! (সূরা বাক্বারা– ১২৬)

وَسِيْقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْاۤ اِلٰى جَهَنَّمَ زُمَرًاؕ حَتّٰۤى اِذَا جَآءُوْهَا فُتِحَتْ اَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَاۤ اَلَمْ يَاْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنْكُمْ يَتْلُوْنَ عَلَيْكُمْ اٰيَاتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُوْنَكُمْ لِقَآءَ يَوْمِكُمْ هٰذَاؕ قَالُوْا بَلٰى وَلٰكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكَافِرِيْنَ

কাফিরদেরকে দলে দলে জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নেয়া হবে; এমনকি যখন তারা জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে তখন তার দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে প্রশ্ন করবে, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য হতে কোন রাসূল আসেননি? যারা তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাতেন এবং তোমাদেরকে এ দিনের আগমন সম্পর্কে সতর্ক করতেন? তারা বলবে- হ্যাঁ, অবশ্যই এসেছিলেন। তবে কাফিরদের উপর আযাবের কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে। (সূরা যুমার– ৭১)

অপমানের কারণে পার্শ্ব চোখে তাকাবে :

وَتَرَاهُمْ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا خَاشِعِيْنَ مِنَ الذُّلِّ يَنْظُرُوْنَ مِنْ طَرْفٍ خَفِيٍّ

তুমি তাদেরকে দেখতে পাবে যে, তাদেরকে জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় তারা অপমানে অবনত অবস্থায় গোপনে পার্শ্ব চোখে তাকাচ্ছে। (সূরা শূরা- ৪৫)

ব্যাখ্যা : মানুষের স্বভাব হচ্ছে, যখন কোন ভয়ানক দৃশ্য তার সামনে থাকে এবং সে বুঝতে পারে যে, চোখের সামনে যা দেখা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই সে তার কবলে পড়তে যাচ্ছে, তখন প্রথমেই ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। এরপরও যদি রেহাই না পায় তখন দেখার চেষ্টা করে বিপদটা কেমন এবং এখনো তার থেকে কত দূরে আছে। কিন্তু মাথা উঁচু করে ভালোভাবে দেখার সাহস তার থাকে না। তাই সে বার বার একটু একটু করে চোখ খুলে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে এবং ভয়ে আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। এ আয়াতে জাহান্নামের দিকে অগ্রসরমান লোকদের এ ধরনের অবস্থায়ই চিহ্নিত করা হয়েছে।

লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে :

ثُمَّ جَعَلْنَا لَهٗ جَهَنَّمَۚ يَصْلَاهَا مَذْمُوْمًا مَّدْحُوْرًا

আমি অবাধ্যদের জন্য জাহান্নাম তৈরি করে রেখেছি। তারা সেখানে লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় প্রবেশ করবে। (সূরা বনী ইসরাইল– ১৮)

اِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِيْ سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دَاخِرِيْنَ

যারা অহংকার করে আমার ইবাদাত থেকে দূরে থাকে, তারা অপমানিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মু’মিনু ৬০)

চুল ও পা ধরে জাহান্নামে ফেলা হবে :

يُعْرَفُ الْمُجْرِمُوْنَ بِسِيْمَاهُمْ فَيُؤْخَذُ بِالنَّوَاصِيْ وَالْاَقْدَامِ

পাপীদেরকে তাদের চিহ্ন দেখে চেনা যাবে। আর তাদের মাথার চুল ও পা ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সূরা আর রহমানু ৪১)

উপুড় করে জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে :

يَوْمَ يُسْحَبُوْنَ فِى النَّارِ عَلٰى وُجُوْهِهِمْؕ ذُوْقُوْا مَسَّ سَقَرَ

সেদিন তাদের চেহারা নিচ দিকে দিয়ে (উপুড় করে) জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে আর বলা হবে জাহান্নামের স্বাদ ভোগ করো। (সূরা ক্বামার– ৪৮)

اَلْقِيَا فِيْ جَهَنَّمَ كُلَّ كَفَّارٍ عَنِيْدٍ – مَنَّاعٍ لِّلْخَيْرِ مُعْتَدٍ مُّرِيْبٍ

প্রত্যেক অবাধ্য কাফিরদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো, যারা ভালো কাজে বাধা দেয়, সীমালঙ্ঘন করে এবং সন্দেহ পোষণ করে। (সূরা ক্বাফু ২৪, ২৫)

সকল কাফির ও মুনাফিককে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে :

اِنَّ اللهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِيْنَ وَالْكَافِرِيْنَ فِيْ جَهَنَّمَ جَمِيْعًا

আললাহ সকল কাফির ও মুনাফিককে জাহান্নামে সমবেত করবেন। (সূরা নিসা– ১৪০)

শয়তানকেও জাহান্নামে উপস্থিত করা হবে :

فَوَرَبِّكَ لَنَحْشُرَنَّهُمْ وَالشَّيَاطِيْنَ ثُمَّ لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا

তোমার রবের শপথ! আমি তাদেরকে এবং শয়তানদেরকে সমবেত করে নতজানু অবস্থায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করব। (সূরা মারইয়াম– ৬৮)

সকলকে পুলসিরাত পার হতে হবে :

وَاِنْ مِّنْكُمْ اِلَّا وَارِدُهَاۚ كَانَ عَلٰى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا

(জাহান্নামে তোমাদের মধ্যে) এমন একজনও থাকবে না, যাকে এর (পুলসিরাতের) উপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে না। এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। (সূরা মারইয়াম– ৭১)

ব্যাখ্যা : নবী ﷺ বলেন, জাহান্নামের উপর পুলসিরাত কায়েম হবে। তখন রাসূলদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম আমার উম্মতকে নিয়ে এটা পার হব। সেদিন রাসূলগণ ছাড়া অন্য কেউ কথা বলতে পারবে না। সেদিন রাসূলদের কথা হবে, হে আল্লাহ! নিরাপদ রাখুন! নিরাপদ রাখুন! (সহীহ বুখারী, হা/৮০৬)

জাহান্নামীদের চেহারায় অন্ধকার বিরাজ করবে :

وَالَّذِيْنَ كَسَبُوا السَّيِّئَاتِ جَزَآءُ سَيِّئَةٍ ۢبِمِثْلِهَا وَتَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌؕ مَا لَهُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ عَاصِمٍۚ كَاَنَّمَاۤ اُغْشِيَتْ وُجُوْهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ اللَّيْلِ مُظْلِمًاؕ اُولٰٓئِكَ اَصْحَابُ النَّارِۚ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ

যারা পাপ অর্জন করবে তারা পাপের পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করবে। অপমান তাদের উপর চেপে বসবে। আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন রক্ষাকারী থাকবে না। তাদের অবস্থা এমন হবে, যেন অন্ধকার রাতের একটি অংশ তাদের চেহারা আবৃত করে ফেলেছে। তারাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, তারা চিরকাল সেখানে থাকবে। (সূরা ইউনুস– ২৭)

জাহান্নাম ভর্তি হবে না :

يَوْمَ نَقُوْلُ لِجَهَنَّمَ هَلِ امْتَلَاْتِ وَتَقُوْلُ هَلْ مِنْ مَّزِيْدٍ

সেদিন আমি জাহান্নামকে বলব, তুমি কি ভর্তি হয়েছ? সে বলবে, আরো আছে কি? (সূরা ক্বাফু ৩০)

ব্যাখ্যা : এর দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি হচ্ছে, এখন আমার মধ্যে আর অধিক মানুষের স্থান নেই। অপরটি হচ্ছে, আরো যত অপরাধী আছে তাদের নিয়ে আসুন। প্রথম অর্থ গ্রহণ করলে এ কথা থেকে এ ধারণা পাওয়া যায় যে, অপরাধীদেরকে এমন গাদাগাদি করে জাহান্নামে রাখা হবে যে, সেখানে একটি সুঁচ পরিমাণ স্থানও আর অবশিষ্ট থাকবে না। তাই জাহান্নামকে যখন জিজ্ঞেস করা হবে, তোমার উদর কি পূর্ণ হয়েছে? তখন সে বিব্রত হয়ে জবাব দেবে- এখনো কি আরো মানুষ আছে? দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করলে এরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, সে সময় জাহান্নাম অপরাধীদের প্রতি এমন ভীষণভাবে রুষ্ট থাকবে যে, সে আরো কেউ আছে কি- এভাবে চাইতে থাকবে এবং সেদিন যেন কোন অপরাধী মুক্তি না পায় তা-ই কামনা করবে। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, জাহান্নামের মধ্যে যত লোকই নিক্ষিপ্ত হবে ততই বলবে আরো চাই, আরো চাই। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পা জাহান্নামের মুখে রাখবেন। এতে এক অংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে। তখন জাহান্নাম বলবে, হে আল্লাহ! আপনার ইজ্জতের কসম, যথেষ্ট হয়েছে। (সহীহ বুখারী, হা/৪৮৪৯)

একের পর এক জাহান্নামে প্রবেশ করতে থাকবে :

اُدْخُلُوْا فِۤيْ اُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْاِنْسِ فِى النَّارِ

আল্লাহ বলবেন, তোমরা ওদের সাথে প্রবেশ করো, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা তোমাদের আগে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। (সূরা আ‘রাফু ৩৮)

ব্যাখ্যা : সর্বাবস্থায় প্রত্যেকটি দল কোন না কোন দলের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী দল ছিল। কোন পূর্ববর্তী দল যদি বিপথগামী চিন্তা ও কর্ম রেখে গিয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীদের পথভ্রষ্ট হওয়ার কিছু দায়দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তায়। তাই বলা হয়েছে, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ শাস্তিই রয়েছে। একটি শাস্তি হচ্ছে, নিজে ভুলপথ অবলম্বনের এবং অপরটি অন্যদেরকে ভুলপথ দেখানোর।