hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৪

অধ্যায়- ২ : ঈমান আনার নির্দেশ

ঈমান আনার আহবান :

اٰمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِه وَاَنْفِقُوْا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُّسْتَخْلَفِيْنَ فِيْهِؕ فَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ وَاَنْفَقُوْا لَهُمْ اَجْرٌ كَبِيْرٌ ‐ وَمَا لَكُمْ لَا تُؤْمِنُوْنَ بِاللهِۚ وَالرَّسُوْلُ يَدْعُوْكُمْ لِتُؤْمِنُوْا بِرَبِّكُمْ وَقَدْ اَخَذَ مِيْثَاقَكُمْ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ

তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করো এবং তিনি তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন, তা হতে ব্যয় করো। অতএব তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছ না? অথচ রাসূল তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনতে আহবান করছেন এবং তিনি তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকারও গ্রহণ করেছেন। (আফসোস!) যদি তোমরা ঈমান আনয়ন করতে, (তবে কতই না ভালো হতো)। (সূরা হাদীদ- ৭, ৮)

فَاٰمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِه وَالنُّوْرِ الَّذِيْۤ اَنْزَلْنَاؕ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ

অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং যে নূর আমি অবতীর্ণ করেছি, তাতে বিশ্বাস স্থাপন করো। (জেনে রেখো) আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। (সূরা তাগাবুন- ৮)

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اٰمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهٖ وَالْكِتَابِ الَّذِيْ نَزَّلَ عَلٰى رَسُوْلِهٖ وَالْكِتَابِ الَّذِيْۤ اَنْزَلَ مِنْ قَبْلُؕ وَمَنْ يَّكْفُرْ بِاللهِ وَمَلَآئِكَتِهٖ وَكُتُبِهٖ وَرُسُلِهٖ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا ۢبَعِيْدًا

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর, তিনি তাঁর রাসূলের প্রতি যে কিতাব নাযিল করেছেন তার উপর এবং যে কিতাব তিনি পূর্বে নাযিল করেছেন তার উপর ঈমান আনয়ন করো। (জেনে রেখো) যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতকে অস্বীকার করবে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। (সূরা নিসা- ১৩৬)

ব্যাখ্যা : যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আবার ঈমান আনতে বলা হয়েছে। কারণ এখানে ‘ঈমান’ শব্দটি দু’টি আলাদা আলাদা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ঈমান আনার একটি অর্থ হচ্ছে- অস্বীকৃতির পরিবর্তে স্বীকৃতির পথ অবলম্বন করা। অস্বীকারকারীদের থেকে আলাদা হয়ে স্বীকৃতিদানকারীদের দলে শামিল হয়ে যাওয়া। এর দ্বিতীয় অর্থ হলো, সচেতনতার সাথে স্বীকৃতি দান করা। নিজের চিন্তা, রুচি, পছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গী, মনোভাব, চালচলন এবং নিজের বন্ধুত্ব, শত্রুতা, প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের সকল ক্ষেত্রকে সে যে আকীদার উপর ঈমান এনেছে সে অনুযায়ী পুরোপুরি ঢেলে সাজানো। প্রথম অর্থের দিক দিয়ে যেসব মুসলিম স্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয় এ আয়াতে তাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় অর্থের প্রেক্ষিতে তাদের কাছে দাবী করা হয়েছে যে, তোমরা প্রকৃত মুমিনে পরিণত হও।

ঈমানের বিস্তারিত রূপরেখা :

لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوْا وُجُوْهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلَآئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّيْنَۚ وَاٰتَى الْمَالَ عَلٰى حُبِّه ذَوِى الْقُرْبٰى وَالْيَتَامٰى وَالْمَسَاكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ وَالسَّآئِلِيْنَ وَفِى الرِّقَابِۚ وَاَقَامَ الصَّلَاةَ وَاٰتَى الزَّكَاةَۚ وَالْمُوْفُوْنَ بِعَهْدِهِمْ اِذَا عَاهَدُوْاۚ وَالصَّابِرِيْنَ فِى الْبَاْسَآءِ وَالضَّرَّآءِ وَحِيْنَ الْبَاْسِؕ اُوْلٰٓئِكَ الَّذِيْنَ صَدَقُوْاؕ وَاُوْلٰٓئِكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ

তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল পূর্ব অথবা পশ্চিম দিকে ঘুরাও তাতে কোন পুণ্য নেই; বরং পুণ্য তো সে ব্যক্তির জন্য, যে ব্যক্তি আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং তাঁরই ভালোবাসা অর্জনের জন্য আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, দরিদ্র, পথিক, ভিক্ষুক ও দাসত্ব মোচনের জন্য দান করে এবং যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে ও অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করে। আর যারা অভাবে, কষ্টে এবং যুদ্ধকালে ধৈর্যশীল, তারাই সত্যপরায়ণ এবং তারাই মুত্তাক্বী। (সূরা বাক্বারা - ১৭৭)

যেসব বিষয়ের উপর ঈমান আনতে হবে :

اٰمَنَ الرَّسُوْلُ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَّبِّه وَالْمُؤْمِنُوْنَؕ كُلٌّ اٰمَنَ بِاللهِ وَمَلَآئِكَتِه وَكُتُبِه وَرُسُلِه ؕ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِه ؕ وَقَالُوْا سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَاِلَيْكَ الْمَصِيْرُ

রাসূল ঐ বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছেন, যা তার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে এবং ঈমানদাররাও (সেসব বিষয়ের উপর ঈমান আনয়ন করেছে)। তাঁরা প্রত্যেকেই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছে। (তারা বলে) আমরা তাঁর রাসূলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং তারা আরো বলে যে, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। আর আপনার দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। (সূরা বাক্বারা- ২৮৫)

ব্যাখ্যা : এ আয়াতে ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতির সারসংক্ষেপ বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে- আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা ও তাঁর কিতাবসমূহকে মেনে নেয়া, তাঁর রাসূলদের মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য না করে তাঁদেরকে স্বীকার করে নেয়া এবং সবশেষে তাঁর সামনে আমাদেরকে উপস্থিত হতে হবে- এ বিষয়টি স্বীকার করে নেয়া। এ পাঁচটি বিষয় ইসলামের বুনিয়াদী আকীদার অন্তর্ভুক্ত। এ আকীদাগুলো মেনে নিলে একজন মুসলিমের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশগুলো আসবে সেগুলোকে মাথা পেতে গ্রহণ করে নেবে, সেগুলোর আনুগত্য করবে এবং নিজের ভালো কাজের জন্য অহংকার করে বেড়াবে না বরং আল্লাহর কাছে অবনত হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে থাকবে।

ঈমানের জন্য কতিপয় আহলে কিতাবের প্রেরণা :

وَاِذَا سَمِعُوْا مَاۤ اُنْزِلَ اِلَى الرَّسُوْلِ تَرٰۤى اَعْيُنَهُمْ تَفِيْضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوْا مِنَ الْحَقِّۚ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِيْنَ ‐ وَمَا لَنَا لَا نُؤْمِنُ بِاللهِ وَمَا جَآءَنَا مِنَ الْحَقِّ وَنَطْمَعُ اَنْ يُّدْخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ الْقَوْمِ الصَّالِحِيْنَ

রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে যখন তারা তা শ্রবণ করে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য তুমি তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে দেখবে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করো। আর আমাদের জন্য এমন কী কারণ থাকতে পারে যে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং আমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করব না? হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যাশা করি যে, আপনি আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। (সূরা মায়েদা- ৮৩, ৮৪)