hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫০২

অধ্যায়- ৭ : ইউসুফ (আঃ) কে জেলখানায় প্রেরণ

জুলায়খা ইউসুফ (আঃ) কে কারাগারে পাঠানোর হুমকি দিল :

وَلَئِنْ لَّمْ يَفْعَلْ مَاۤ اٰمُرُهٗ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُوْنًا مِّنَ الصَّاغِرِيْنَ

আমি তাকে যা আদেশ করেছি সে যদি তা না করে, তবে সে কারারুদ্ধ হবেই এবং সে হীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা ইউসুফু ৩২)

ইউসুফ (আঃ) পাপে না জড়িয়ে কারাগারকে বরণ করে নিলেন :

قَالَ رَبِّ السِّجْنُ اَحَبُّ اِلَيَّ مِمَّا يَدْعُوْنَنِيْۤ اِلَيْهِۚ وَاِلَّا تَصْرِفْ عَنِّيْ كَيْدَهُنَّ اَصْبُ اِلَيْهِنَّ وَاَكُنْ مِّنَ الْجَاهِلِيْنَ

ইউসুফ বলল, হে আমার প্রতিপালক! এ নারীগণ আমাকে যার প্রতি আহবান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার নিকট অধিক প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (সূরা ইউসুফু ৩৩)

আল্লাহ তাকে পাপ থেকে বাঁচালেন :

فَاسْتَجَابَ لَهٗ رَبُّهٗ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

অতঃপর তার প্রতিপালক তার আহবানে সাড়া দিলেন এবং তাকে তাদের ছলনা হতে রক্ষা করলেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। (সূরা ইউসুফু ৩৪)

ব্যাখ্যা : উনিশ/বিশ বছরের এক সুন্দর যুবক। বলিষ্ঠ ও সুঠাম দেহী। আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবাস জীবন, দেশান্তর ও দাসত্বের পর্যায় অতিক্রম করার পর ভাগ্য তাকে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির বাড়িতে টেনে এনেছে। এখানে এ বাড়ির যে বেগম সাহেবার সাথে সকাল-বিকাল উঠাবসা করতে হয়, প্রথমে সে-ই তার পেছনে লাগে। তারপর সারা শহরের অভিজাত পরিবারের মেয়েরা তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। তার ভাবাবেগকে উসকিয়ে দেয়ার এবং তার ধার্মিকতাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করার জন্য সবধরনের কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। পাপের অসংখ্য দরজা তার অপেক্ষায় খোলা আছে। এ অবস্থায় নজীরবিহীন পরহেযগারীর দৃষ্টান্ত স্থাপনের পরও তাঁর মনে কখনো এ মর্মে অহমিকা জাগেনি যে, বাহ! কত মজবুত আমার চরিত্র। এতো সুন্দরী ও যুবতী মেয়েরা আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিন্তু এরপরও আমার পদস্খলন হয়নি। বরং এর পরিবর্তে তিনি নিজের মানবিক দুর্বলতার কথা চিন্তা করে ভয়ে কেঁপে উঠেছেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন জানিয়ে বলেছেন, হে আমার রব! আমি একজন দুর্বল মানুষ। তুমি আমাকে সহায়তা দান করো এবং আমাকে বাঁচাও। যার ফলে জেলখানার ভেতরে বাইরে সবাই জানত, এ ব্যক্তি কোন অপরাধী নয় বরং একজন অত্যন্ত সদাচারী পুরুষ। কঠিন পরীক্ষায় তিনি নিজের আল্লাহভীতি ও আল্লাহর হুকুম মেনে চলার প্রমাণ পেশ করেছেন। এ কারণে শুধু কয়েদীরাই তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত না বরং কারাগারের পরিচালক এবং কর্মচারীরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করত।

ইউসুফ (আঃ) কে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো :

ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِّنْ ۢبَعْدِ مَا رَاَوُا الْاٰيَاتِ لَيَسْجُنُنَّهٗ حَتّٰى حِيْنٍ

নিদর্শনাবলি দেখার পর তাদের মনে হলো যে, তাকে কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করতেই হবে। (সূরা ইউসুফু ৩৫)

ব্যাখ্যা : কাউকে ইনসাফের শর্তানুযায়ী আদালতে অপরাধী প্রমাণ না করেই খেয়ালখুশীমতো গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া অত্যাচারী শাসকদের পুরাতন রীতি। এ ব্যাপারে আজকের শয়তানরাও চার হাজার বছর আগের শয়তানদের থেকে ভিন্ন নয়। তারা প্রত্যেকটি অন্যায় কাজের জন্য প্রথমে একটি আইন তৈরি করে নেয় এবং নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মানুষের উপর যুলুম অত্যাচার চালায় আর দুনিয়াবাসীকে বুঝানোর চেষ্টা করে যে, তার কারণে শুধু নিজের নয় বরং দেশ ও জাতির জন্যও ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তারা শুধু যালিমই নয়, সেই সাথে মিথ্যুক ও নির্লজ্জও বটে।

কারাগারে দু’জন যুবক ইউসুফ (আঃ) এর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল :

وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانِؕ قَالَ اَحَدُهُمَاۤ اِنِّۤيْ اَرَانِۤيْ اَعْصِرُ خَمْرًاۚ وَقَالَ الْاٰخَرُ اِنِّۤيْ اَرَانِۤيْ اَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِيْ خُبْزًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُؕ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيْلِهٖۚ اِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِيْنَ

তার সাথে আরো দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আঙ্গুর নিংড়িয়ে রস বের করছি। আর অপরজন বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আমার মাথার উপর রুটি বহন করছি এবং পাখী তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে তুমি এটার তাৎপর্য জানিয়ে দাও, আমরা তো তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ হিসেবেই দেখছি। (সূরা ইউসুফু ৩৬)

তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলার আশ্বাস দিলেন :

قَالَ لَا يَأْتِيْكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقَانِهٖۤ اِلَّا نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيْلِهٖ قَبْلَ اَنْ يَّأْتِيَكُمَاؕ ذٰلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِيْ رَبِّيْ

ইউসুফ বলল, তোমাদেরকে যে খাদ্য দেয়া হয় তা আসার পূর্বে আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের তাৎপর্য জানিয়ে দেব। আমি তোমাদেরকে যা বলব তা আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা হতেই বলব। (সূরা ইউসুফু ৩৭)