hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬০৬

অধ্যায়- ৩৪ : মুসলিমদের প্রতি সান্ত্বনা ও পরামর্শ দান

পরাজয়ের পর মুমিনদের প্রতি সান্ত্বনা :

وَلَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَاَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ

তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং চিন্তিত হয়ো না। যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।

(সূরা আলে ইমরান- ১৩৯)

اَوَلَمَّاۤ اَصَابَتْكُمْ مُّصِيْبَةٌ قَدْ اَصَبْتُمْ مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ اَنّٰى هٰذَاؕ قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اَنْفُسِكُمْؕ اِنَّ اللهَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ

হ্যাঁ, যখন তোমাদের উপর বিপদ উপস্থিত হলো, বস্তুত তোমরাও তাদের প্রতি অনুরূপ দ্বিগুণ বিপদ উপস্থিত করেছিলে। তোমরা বলছিলে, এটা কোথা হতে এল? বলো, ওটা তোমাদের নিজেদের নিকট হতেই এসেছে; নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ের উপর সর্বশক্তিমান। (সূরা আলে ইমরান- ১৬৫)

ব্যাখ্যা : ওহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের বিষয়টি নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ অবশ্যই যথার্থভাবে অবগত ছিলেন এবং তাঁদের কোন প্রকার বিভ্রান্তির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে সাধারণ মুসলিমরা মনে করছিলেন, আল্লাহর রাসূল যখন আমাদের সঙ্গে আছেন এবং আল্লাহও আমাদেরকে সাহায্য করছেন, তখন কোন অবস্থাতেই কাফিররা আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে বিপরীত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। ফলে তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ কী হলো? আমরা আল্লাহর দ্বীনের জন্য লড়তে গেলাম, আর তাঁর প্রতিশ্রুতি ও সাহায্য আমাদের সঙ্গে ছিল এবং তাঁর রাসূলও সশরীরে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন- এরপরও আমরা পরাজিত হলাম? আর এমন লোকদের হাতে পরাজিত হলাম, যারা আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে এসেছিল। মুসলিমদের এ হতাশা দূর করার জন্য এ আয়াত নাযিল হয়।

ইতোপূর্বে মুমিনরা এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন :

وَكَاَيِّنْ مِّنْ نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهٗ رِبِّيُّوْنَ كَثِيْرٌۚ فَمَا وَهَنُوْا لِمَاۤ اَصَابَهُمْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ وَمَا ضَعُفُوْا وَمَا اسْتَكَانُوْاؕ وَاللهُ يُحِبُّ الصَّابِرِيْنَ

এমন অনেক নবী ছিলেন, যাদের সহযোগে প্রভুভক্ত লোকেরা যুদ্ধ করেছিল এবং আল্লাহর পথে যা সংঘটিত হয়েছিল তাতে তারা নিরুৎসাহ হয়নি, শক্তিহীন হয়ে যায়নি এবং বিচলিতও হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান- ১৪৬)

ব্যাখ্যা : অর্থাৎ একদিকে নিজেদের সৈন্য সংখ্যা ও যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জামের স্বল্পতা এবং অন্যদিকে কাফিরদের বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও সাজ-সরঞ্জামের প্রাচুর্য দেখেও তারা বাতিলের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি।

মুনাফিক ও ইয়াহুদিদের চক্রান্তে না পড়ার নির্দেশ :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنْ تُطِيْعُوا الَّذِيْنَ كَفَرُوْا يَرُدُّوْكُمْ عَلٰۤى اَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوْا خَاسِرِيْنَ – بَلِ اللهُ مَوْلَاكُمْۚ وَهُوَ خَيْرُ النَّاصِرِيْنَ

হে মুমিনগণ! যারা অবিশ্বাস করেছে যদি তোমরা তাদের অনুসরণ কর, তবে তারা তোমাদেরকে পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রত্যাবর্তিত হবে। বরং আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠতম সাহায্যকারী। (সূরা আলে ইমরান- ১৪৯, ১৫০)

শহীদদের ব্যাপারে মুনাফিকদের মতো কথা বলা নিষেধ :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَقَالُوْا لِاِخْوَانِهِمْ اِذَا ضَرَبُوْا فِى الْاَرْضِ اَوْ كَانُوْا غُزًّى لَّوْ كَانُوْا عِنْدَنَا مَا مَاتُوْا وَمَا قُتِلُوْاۚ لِيَجْعَلَ اللهُ ذٰلِكَ حَسْرَةً فِيْ قُلُوْبِهِمْؕ وَاللهُ يُحْيِيْ وَيُمِيْتُؕ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ

হে মুমিনগণ! যারা অবিশ্বাস করেছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। যখন তাদের ভাইয়েরা পৃথিবীতে বিচরণ করে অথবা যুদ্ধে নিহত হয় তখন তারা বলে, যদি ওরা আমাদের নিকট থাকত তবে মৃত্যুমুখে পতিত হতো না অথবা নিহত হতো না। এভাবেই আল্লাহ তাদের অন্তরে দুঃখ সঞ্চার করেন এবং আল্লাহই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। আর তোমরা যা করছ, আল্লাহ সে ব্যাপারে প্রত্যক্ষকারী। (সূরা আলে ইমরান- ১৫৬)

শহীদদের ব্যাপারে মুনাফিকদের সমালোচনার জবাব :

اَلَّذِيْنَ قَالُوْا لِاِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوْا لَوْ اَطَاعُوْنَا مَا قُتِلُوْاؕ قُلْ فَادْرَءُوْا عَنْ اَنْفُسِكُمُ الْمَوْتَ اِنْ كُنْتُمْ صَادِقِيْنَ

যারা ঘরে বসে স্বীয় ভাইদের সম্পর্কে বলছিল, যদি তারা আমাদের কথা মানত তবে তারা নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে নিজেদেরকে মৃত্যু হতে রক্ষা করো। (সূরা আলে ইমরান- ১৬৮)

আল্লাহ শহীদদেরকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন :

وَلَئِنْ قُتِلْتُمْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ اَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ – وَلَئِنْ مُّتُّمْ اَوْ قُتِلْتُمْ لَاِلَى اللهِ تُحْشَرُوْنَ

আর যদি তোমরা আল্লাহর পথে নিহত অথবা মৃত্যুমুখে পতিত হও, তবে আল্লাহর পক্ষ হতে রয়েছে ক্ষমা। আর তারা যা সঞ্চয় করেছে তদপেক্ষা তাঁর করুণাই অতি উত্তম। তাছাড়া যদি তোমরা মৃত্যুবরণ কর বা নিহত হও, তবে অবশ্যই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে একত্রিত করা হবে। (সূরা আলে ইমরান- ১৫৭, ১৫৮)

وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ قُتِلُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ اَمْوَاتًاؕ بَلْ اَحْيَآءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُوْنَ – فَرِحِيْنَ بِمَاۤ اٰتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهٖ وَيَسْتَبْشِرُوْنَ بِالَّذِيْنَ لَمْ يَلْحَقُوْا بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ اَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ – يَسْتَبْشِرُوْنَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللهِ وَفَضْلٍ وَّاَنَّ اللهَ لَا يُضِيْعُ اَجْرَ الْمُؤْمِنِيْنَ

যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে মৃত হিসেবে ধারণা করো না; বরং তারা জীবিত, তারা তাদের প্রতিপালক হতে জীবিকাপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ হতে যা দান করেছেন তাতেই তারা সন্তুষ্ট। আর যারা এখনো তাদের পেছনে রয়ে গেছে এবং যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হতে পারেনি, তাদের ব্যাপারেও এরা খুশি; কেননা এমন ধরনের লোকদের জন্য এখানে কোন ভয় নেই এবং তারা (সেদিন কোন রকম) চিন্তাও করবে না। তারা আল্লাহর পক্ষ হতে অনুগ্রহ ও নিয়ামত লাভ করার কারণে আনন্দিত হয়। নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। (সূরা আলে ইমরান, ১৬৯-১৭১)