hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮৮

অধ্যায়- ৪ : মাতা-পিতার প্রতি আনুগত্যের সীমারেখা

আল্লাহর নাফরমানির ক্ষেত্রে মাতা-পিতার কথা শুনা যাবে না :

وَاِنْ جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِيْ مَا لَيْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا

তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করার জন্য যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের অনুসরণ করো না। (সূরা আনকাবূত- ৮)

ব্যাখ্যা : অবশ্যই এটা পিতামাতার অধিকার যে, ছেলে-মেয়েরা তাদের সেবা করবে, তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে এবং বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মেনে চলবে। কিন্তু তাদেরকে এ অধিকার দেয়া হয়নি যে, মানুষ নিজের জ্ঞানের বিরুদ্ধে তাদের অন্ধ অনুসরণ করবে। শুধুমাত্র পিতামাতার ধর্ম বলেই ছেলে বা মেয়ের সেই ধর্ম মেনে চলার কোন কারণ নেই। সন্তান যদি এ জ্ঞান লাভ করে যে, তার পিতামাতার ধর্ম ভুল ও মিথ্যা, তাহলে তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে সঠিক ধর্ম গ্রহণ করা উচিত। এমনকি তাদের উপর চাপ প্রয়োগের পরও যে পথের ভ্রান্তি তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে সে পথ থেকে সরে আসা উচিত। পিতামাতার সাথে যখন এ ধরনের ব্যবহার করতে হবে তখন দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তির সাথেও এ ব্যবহার করা উচিত। যতক্ষণ না কোন ব্যক্তির সত্য পথে থাকা সম্পর্কে জানা যাবে ততক্ষণ তার অনুসরণ করা বৈধ নয়। সন্তান যদি সঠিক পথ অবলম্বন করে থাকে এবং পিতামাতার বৈধ অধিকার আদায় করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি না করে থাকে; আর পিতামাতা যদি কেবল পথভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগী না হওয়ার কারণে তাকে নির্যাতন করে থাকে, তাহলে তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না।

বাহ্যিক আচরণ বজায় রেখে আল্লাহর কথাই মানতে হবে :

وَصَاحِبْهُمَا فِى الدُّنْيَا مَعْرُوْفًاؗ وَاتَّبِعْ سَبِيْلَ مَنْ اَنَابَ اِلَيَّ ۚ ثُمَّ اِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَاُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ

দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে এবং যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ করবে। অবশেষে তোমাদেরকে আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তা আমি তোমাদেরকে অবহিত করব। (সূরা লুক্বমান- ১৫)

পিতামাতা কুফরের প্রতি আকৃষ্ট হলে আন্তরিক বন্ধুত্ব রাখা যাবে না :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْاۤ اٰبَآءَكُمْ وَاِخْوَانَكُمْ اَوْلِيَآءَ اِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْاِيْمَانِؕ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ

হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতাগণ যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে পছন্দ করে, তবে তাদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে তারাই যালিম। (সূরা তাওবা- ২৩)

শানে নুযূল : রাসূল ﷺ এর প্রতি হিজরতের নির্দেশ হওয়ার সাথে সাথে কতিপয় সাহাবী স্বেচ্ছায় আনন্দের সঙ্গে মদিনায় হিজরত করলেন, কিন্তু কেউ কেউ নিজ মাতা-পিতা, স্ত্রী, পুত্র ও ধনসম্পদের আকর্ষণে হিজরত করেননি। তাদের সম্বন্ধে এ আয়াতটি নাযিল হয়।

অমুসলিম মা-বাবার জন্য মাগফিরাতের দু‘আ করা জায়েয নয় :

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْاۤ اُولِيْ قُرْبٰى مِنْ ۢبَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ اَنَّهُمْ اَصْحَابُ الْجَحِيْمِ

কোন নবী এবং ঈমানদারদের জন্য এটা উচিত নয় যে, তারা কোন মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়; তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হওয়ার পরও যে, তারা জাহান্নামবাসী। (সূরা তাওবা- ১১৩)

ইবরাহীম (আঃ) তাঁর মুশরিক পিতামাতার জন্য দু‘আ করেছেন :

وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ اِبْرَاهِيْمَ لِاَبِيْهِ اِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَّعَدَهَاۤ اِيَّاهُۚ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهٗۤ اَنَّهٗ عَدُوٌّ لِّلّٰهِ تَبَرَّاَ مِنْهُؕ اِنَّ اِبْرَاهِيْمَ لَاَوَّاهٌ حَلِيْمٌ

আর ইবরাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন এজন্য যে, তিনি তাকে এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু; তখন ইবরাহীম তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। নিশ্চয় ইবরাহীম কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও সহনশীল। (সূরা তাওবা- ১১৪)

মাতা-পিতার বিপক্ষে হলেও ন্যায়ের সাক্ষ্য দিতে হবে :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُوْنُوْا قَوَّامِيْنَ بِالْقِسْطِ شُهَدَآءَ لِلّٰهِ وَلَوْ عَلٰۤى اَنْفُسِكُمْ اَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْاَقْرَبِيْنَ

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ ইনসাফের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতামাতা এবং আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে হয়। (সূরা নিসা- ১৩৫)

মাতা-পিতা ভুল পথে চললে তাদেরকে ভদ্র ভাষায় দাওয়াত দিতে হবে :

وَاذْكُرْ فِى الْكِتَابِ اِبْرَاهِيْمَؕ اِنَّهٗ كَانَ صِدِّيْقًا نَّبِيًّا ‐ اِذْ قَالَ لِاَبِيْهِ يَاۤ اَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِيْ عَنْكَ شَيْئًا ‐ يَاۤ اَبَتِ اِنِّيْ قَدْ جَآءَنِيْ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِيْۤ اَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا ‐ يَاۤ اَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَؕ اِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمٰنِ عَصِيًّا ‐ يَاۤ اَبَتِ اِنِّۤيْ اَخَافُ اَنْ يَّمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمٰنِ فَتَكُوْنَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا

স্মরণ করো, এ কিতাবে উল্লেখিত ইবরাহীমের কথা, সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী। সে তার পিতাকে বলল, হে আমার পিতা! আপনি কেন তার ইবাদাত করেন যে শুনতে পায় না, দেখতে পায় না এবং আপনার কোন উপকার করতে পারে না? (যখন সে তার পিতাকে বলল) হে আমার পিতা! আমার নিকট তো এমন জ্ঞান এসেছে, যা আপনার নিকট আসেনি। সুতরাং আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব। হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদাত করবেন না; নিশ্চয় শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি আশঙ্কা করি যে, আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে, তখন তো আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন। (সূরা মারইয়াম, ৪১-৪৫)

পিতৃপুরুষ ভুল পথে থাকলে তাদের অনুসরণ করা জায়েয নয় :

وَاِذَا قِيْلَ لَهُمُ اتَّبِعُوْا مَاۤ اَنْزَلَ اللهُ قَالُوْا بَلْ نَتَّبِعُ مَاۤ اَلْفَيْنَا عَلَيْهِ اٰبَآءَنَاۤ اَوَلَوْ كَانَ اٰبَآؤُهُمْ لَا يَعْقِلُوْنَ شَيْئًا وَّلَا يَهْتَدُوْنَ

আর যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার অনুসরণ করো। তখন তারা বলে, বরং আমরা তাঁরই অনুসরণ করব যার উপর আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি। যদিও তাদের পিতৃপুরুষদের কোন জ্ঞানই ছিল না এবং তারা হেদায়াতপ্রাপ্তও ছিল না, তবুও কি (তারা তাদের অনুসরণ করবে?) (সূরা বাক্বারা- ১৭০)

মানুষ বাপ-দাদার ধর্মকে আঁকড়ে ধরে পথভ্রষ্ট হয় :

وَكَذٰلِكَ مَاۤ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِيْ قَرْيَةٍ مِّنْ نَّذِيْرٍ اِلَّا قَالَ مُتْرَفُوْهَاۤ اِنَّا وَجَدْنَا اٰبَآءَنَا عَلٰۤى اُمَّةٍ وَّاِنَّا عَلٰۤى اٰثَارِهِمْ مُّقْتَدُوْنَ

অনুরূপভাবে তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখনই তাদের সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিরা বলত, আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের উপর এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। (সূরা যুখরুফ- ২৩)

তারা হেদায়াতের সঠিক পথকেও অস্বীকার করে :

قَالَ اَوَلَوْ جِئْتُكُمْ بِاَهْدٰى مِمَّا وَجَدْتُّمْ عَلَيْهِ اٰبَآءَكُمْ قَالُوْاۤ اِنَّا بِمَاۤ اُرْسِلْتُمْ بِهٖ كَافِرُوْنَ

তিনি (নবী) বলতেন, তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে পথে পেয়েছ, আমি যদি তোমাদের জন্য তার চেয়ে উত্তম পথনির্দেশ আনয়ন করি তবুও কি (তোমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে)? তখন তারা বলত, তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। (সূরা যুখরুফ- ২৪)

وَاِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا اِلٰى مَاۤ اَنْزَلَ اللهُ وَاِلَى الرَّسُوْلِ قَالُوْا حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ اٰبَآءَنَاۤ اَوَلَوْ كَانَ اٰبَآؤُهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ شَيْئًا وَّلَا يَهْتَدُوْنَ

যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে ও রাসূলের দিকে আসো। তখন তারা বলে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই জানত না এবং সৎপথপ্রাপ্তও ছিল না, তবুও কি (তারা তাদের অনুসরণ করবে?) (সূরা মায়েদা- ১০৪)

পিতৃপুরুষরা সৎপথে থাকলে তাদের অনুসরণ করা যাবে :

اَمْ كُنْتُمْ شُهَدَآءَ اِذْ حَضَرَ يَعْقُوْبَ الْمَوْتُ اِذْ قَالَ لِبَنِيْهِ مَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ ۢبَعْدِيْؕ قَالُوْا نَعْبُدُ اِلٰهَكَ وَاِلٰهَ اٰبَآئِكَ اِبْرَاهِيْمَ وَاِسْمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ اِلٰهًا وَّاحِدًاۚ وَنَحْنُ لَهٗ مُسْلِمُوْنَ

তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকূবের মৃত্যু উপস্থিত হলো তখন তিনি নিজ পুত্রদেরকে বলেছিলেন, আমার পরে তোমরা কোন জিনিসের ইবাদাত করবে? তারা বলেছিল, আমরা আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহের ইবাদাত করব, তিনি একক উপাস্য এবং আমরা তাঁরই অনুগত থাকব। (সূরা বাক্বারা- ১৩৩)

وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ اٰبَآئِيْۤ اِبْرَاهِيْمَ وَاِسْحَاقَ وَيَعْقُوْبَؕ مَا كَانَ لَنَاۤ اَنْ نُّشْرِكَ بِاللهِ مِنْ شَيْءٍؕ ذٰلِكَ مِنْ فَضْلِ اللهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُوْنَ

আমি তো আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক এবং ইয়াকূবের মতবাদের অনুসরণ করি। আল্লাহর সাথে কোন বস্তুকে শরীক করা আমাদের কাজ নয়। এটা (তাওহীদের অনুসারী হওয়া) আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সূরা ইউসুফ- ৩৮)