hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬২০

অধ্যায়- ৪৮ : বিদায় হজ্জ

মুহাম্মাদ ﷺ হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে ১০ম হিজরীর ২৫শে জিলকাদ, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারী লক্ষাধিক সাহাবী সহকারে মক্কার পথে রওয়ানা হলেন। এটি ছিল মহানবী ﷺ এর জীবনের শেষ হজ্জ পালন। এজন্য এ হজ্জকে ‘হিজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ্জ’ বলা হয়। এ সফরে নবীর সকল সহধর্মিণী তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কুরবানী দেয়ার জন্য তিনি ১০০টি উট সঙ্গে নেন। সফরের দশ দিন পর মুহাম্মাদ ﷺ ছয় মাইল অদূরে যুল হুলাইফা নামক স্থানে পৌঁছেন এবং সেখান হতে সাহাবীদের নিয়ে হজ্জের পোশাক পরিধান করে (ইহরাম বেধে) একাদশ দিনে মক্কায় প্রবেশ করেন। জিলহাজ্জ মাসের অষ্টম দিনে তিনি মীনায় এবং নবম দিনে আরাফার ময়দানে পৌঁছান। হজ্জ সম্পন্ন করে তিনি আরাফাতের পর্বত শিখরে দাঁড়িয়ে উপস্থিত মুসলিমদের উদ্দেশ্যে এক অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন, যা আমাদের কাছে বিদায় হজ্জের ভাষণ নামে পরিচিত। সে ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন, তা হলো :

১. হে লোক সকল! তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য হারাম যেমন তা হারাম তোমাদের এ দিনে, তোমাদের এ মাসে এবং তোমাদের এ শহরে।

২. সাবধান! জাহেলী যুগের সকল ব্যাপার (অপসংস্কৃতি) আমার উভয় পায়ের নিচে (পদদলিত করা হলো)। জাহেলী যুগের রক্তের দাবিও বাতিল ঘোষণা করা হলো। আমি সর্বপ্রথম যে রক্তপণ বাতিল করছি, তা হলো আমাদের বংশের রবী‘আ ইবনে হারিসের পুত্রের রক্তপণ। সে শিশু অবস্থায় বনু সা‘দ এর দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিল, তখন হুযায়ল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে।

৩. জাহিলী যুগের সুদ প্রথাও বাতিল করা হলো। আমি প্রথম যে সুদ বাতিল করছি তা হলো আমাদের বংশের আববাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ। তার সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো।

৪. তোমরা স্ত্রীলোকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানাত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালিমার মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান নিজেদের জন্য হালাল করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা যেন তোমাদের শয্যায় এমন কোন লোককে আশ্রয় না দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা এরূপ করে, তবে হালকাভাবে প্রহার করো। আর তোমাদের উপর তাদের ন্যায়সঙ্গত ভরণ-পোষণের ও পোশাক-পরিচ্ছদের হক রয়েছে।

৫. আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি- যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।

৬. (হে লোক সকল! কিয়ামতের দিন) তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেসিত হলে কী বলবে? তখন তারা বলল, আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি (আল্লাহর বাণী) পৌঁছে দিয়েছেন, আপনার হক আদায় করেছেন এবং সদুপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তাঁর তর্জনী আঙ্গুল আকাশের দিকে তুলে ইশারা করে বললেন, ‘‘হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো’’- তিনবার এরূপ বললেন। (সহীহ মুসলিম, হা/৩০০৯)

বিদায় হজ্জের পর ইসলাম পরিপূর্ণ দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় :

اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। (সূরা মায়েদা- ৩)

ব্যাখ্যা : বিদায় হজ্জের সময় আরাফার দিন শুক্রবারে এ আয়াতটি নাযিল হয়ছিল। দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, তাকে একটি স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থায় পরিণত করা। তার মধ্যে জীবনের সকল প্রশ্নের নীতিগত বা বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়। হেদায়াত ও পথনির্দেশ লাভ করার জন্য এর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আর নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, হেদায়াতের নিয়ামত পূর্ণ করা। আর ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়ার অর্থ হচ্ছে, এখন মানুষের গলায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো আনুগত্যের শৃঙ্খল নেই। আল্লাহ যখন মানুষের উপর এ অনুগ্রহগুলো করেছেন তখন এর দাবী হচ্ছে, এখন মানুষ আল্লাহর আইনের সীমার মধ্যে অবস্থান করবে এবং তাঁর বিধিবিধান মেনে চলবে।

سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُوْنَ ‐ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ ‐ وَالْحَمْدُ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ