hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪৩

অধ্যায়- ৬ : প্রচারকদের জন্য সান্ত্বনা

উপদেশ সবার ক্ষেত্রে উপকারী হয় না :

وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِيْۤ اِنْ اَرَدْتُّ اَنْ اَنْصَحَ لَكُمْ اِنْ كَانَ اللهُ يُرِيْدُ اَنْ يُّغْوِيَكُمْ ؕ هُوَ رَبُّكُمْ وَاِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ

আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের কোন উপকারে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা হুদ- ৩৪)

ব্যাখ্যা : যারা ভুল করার পরও নিজেদের একগুঁয়েমী ও হঠকারিতার কারণে ভুলের উপর অবিচল থাকে এবং যে কথা মেনে নিতে একবার অস্বীকার করেছে তাকে আর কোন উপদেশ, অনুরোধ এবং যুক্তি প্রদর্শনের পরও মেনে নিতে চায় না, এ ধরনের লোকদের উপর আল্লাহর এমন লানত পড়ে যে, তাদের আর কোন দিন সঠিক পথে চলার সুযোগ হয় না।

একজন না মানলে অন্যজন মানবে :

فَاِنْ يَّكْفُرْ بِهَا هٰۤؤُلَآءِ فَقَدْ وَكَّلْنَا بِهَا قَوْمًا لَّيْسُوْا بِهَا بِكَافِرِيْنَ

আজ যদি তারা তা অস্বীকার করে, তবে (তাতে আমার কোন ক্ষতি নেই) আমি তো অতীতে এমন এক সম্প্রদায়ের উপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলাম, যারা কখনো এগুলো প্রত্যাখ্যান করেনি। (সূরা আন‘আম- ৯০)

আল্লাহর বিধান জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না :

لَاۤ اِكْرَاهَ فِى الدِّيْنِۚ قَدْ تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّۚ فَمَنْ يَّكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنْ ۢبِاللهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰىۚ لَا انْفِصَامَ لَهَاؕ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ

দ্বীনের ব্যাপারে কোন বাড়াবাড়ি নেই। ভ্রষ্টতা হতে সুপথ প্রকাশিত হয়ে গেছে, সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করবে, সে এমন এক মজবুত রশিকে ধারণ করল, যা কখনো ছিঁড়বে না। আর আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী। (সূরা বাক্বারা- ২৫৬)

ব্যাখ্যা : কোন ঈমানদারকে পুরস্কার এবং কোন অস্বীকারকারীকে শাস্তি দেয়া দাওয়াত দানকারীর কাজ নয়। কাউকে জোর করে ঈমানের দিকে টেনে আনা এবং কাউকে জোরপূর্বক অস্বীকার করা থেকে দূরে রাখার কাজও তাঁর নয়। বরং তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে, যে ব্যক্তি সত্য ও সঠিক পথ গ্রহণ করবে, তাকে শুভ পরিণামের সুসংবাদ দেবে এবং যে ব্যক্তি নিজের কুপথে অবিচল থাকবে, তাকে আল্লাহর পাকড়াও ও শাস্তির ভয় দেখাবে। কুরআন মাজীদের যেখানেই এ ধরনের উক্তি এসেছে সেখানেই এসব বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কাফিরসমাজ। মুসলিমদের ব্যাপারে কুরআন বিভিন্ন স্থানে বার বার সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, নবী ﷺ মুসলিমদের জন্য কেবল সুসংবাদদাতাই নন, বরং তিনি একাধারে শিক্ষক, পরিশুদ্ধকারী এবং কর্মের আদর্শ। তাছাড়া তিনি মুসলিমদের জন্য শাসক ও বিচারক- যার আনুগত্য করা প্রত্যেকের জন্য অত্যাবশ্যক।

قَالَ يَا قَوْمِ اَرَاَيْتُمْ اِنْ كُنْتُ عَلٰى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّيْ وَاٰتَانِيْ رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهٖ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْؕ اَنُلْزِمُكُمُوْهَا وَاَنْتُمْ لَهَا كَارِهُوْنَ

সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বলো, আমি যদি আমার প্রতিপালকের প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ হতে কোনকিছু দান করে থাকেন, আর তোমাদের নিকট তা গোপন থাকে, তাহলে আমি কি এ বিষয়ে তোমাদেরকে বাধ্য করতে পারি? অথচ তোমরা এটা অপছন্দ কর? (সূরা হুদ- ২৮)

ব্যাখ্যা : নবী ﷺ যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে হেদায়াত ও গোমরাহীর পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলে ধরার এবং সঠিক পথ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছেন। এখন যদি কেউ নিজেই সঠিক পথে চলতে না চায়, তাহলে তার জেনে রাখা উচিত যে, নবী ﷺ কে বল প্রয়োগ করে কাউকে সঠিক পথে চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এভাবে জবরদস্তি করে ঈমান আনা যদি আল্লাহর ইচ্ছা হতো তাহলে নবী পাঠানোর কী প্রয়োজন ছিল? এ কাজ তো তিনি নিজেই যখন ইচ্ছা করতে পারতেন।

সবার ক্ষেত্রে নসীহত ফলপ্রসূ হয় না :

وَاَنْذِرْ بِهِ الَّذِيْنَ يَخَافُوْنَ اَنْ يُّحْشَرُوْاۤ اِلٰى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهٖ وَلِيٌّ وَّلَا شَفِيْعٌ لَّعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ

যারা ভয় করে এ দ্বারা তুমি তাদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করো যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট সমবেত করা হবে। এমতাবস্থায় তিনি ব্যতীত তাদের জন্য অন্য কোন অভিভাবক বা সুপারিশকারী থাকবে না। (এ উপদেশের মাধ্যমে) হয়তো তারা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারবে। (সূরা আন‘আম- ৫১)

ব্যাখ্যা : যারা দুনিয়ার জীবনে এমনভাবে নিমগ্ন হয়েছে যে, তারা মৃত্যুর কথা এবং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার কথা চিন্তাও করে না, তাদের জন্য নসীহত কখনো ফলপ্রসূ হবে না। কাজেই এ ধরনের লোকদেরকে বাদ দিয়ে এমন লোকদেরকে খোঁজতে হবে, যাদের মনে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় আছে। কেবলমাত্র এ ধরনের লোকদের উপরই নসীহতের প্রভাব পড়তে পারে এবং তাদের সংশোধন হওয়ার আশা করা যেতে পারে।

নবী ﷺ যখন দেখতেন, এ জাতিকে বুঝাতে দীর্ঘকাল চলে গেল অথচ এরা কোনক্রমেই হেদায়াতের পথে আসছে না, তখন অনেক সময় তাঁর মনে এ ধরনের বাসনা জন্ম নিত যে, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কোন নিদর্শন প্রকাশিত হতো, যার ফলে এরা কুফরী ত্যাগ করে আমার দাওয়াতকে গ্রহণ করে নিত! তাঁর এ বাসনার জবাব এ আয়াতে দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, অধৈর্য হয়ো না। যে বিন্যাস ও ধারাবাহিকতা সহকারে আমি এ কাজটি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি তার উপর ধৈর্যধারণ করে এগিয়ে চলো। অলৌকিকতার আশ্রয় নিতে হলে তা কি আমি নিজেই নিতে পারতাম না? কিন্তু আমি জানি, তোমাকে যে সংস্কার সাধনের কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে তাকে সফলতার মনযিলে পৌঁছানোর সঠিক পথ এটা নয়। যদি কেবলমাত্র সমস্ত মানুষকে কোন না কোনভাবে সত্যপন্থী বানানো উদ্দেশ্য হতো, তাহলে কিতাব নাযিল করা, মুমিনদেরকে কাফিরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত করা এবং সত্যের দাওয়াতকে পর্যায়ক্রমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এগিয়ে নেয়ার কী প্রয়োজন ছিল? আল্লাহর একটিমাত্র ইঙ্গিতেই এ কাজ সম্পন্ন হতে পারত। কিন্তু আল্লাহ এ কাজটি এ পদ্ধতিতে করতে চান না। তিনি চান সত্যকে যুক্তি-প্রমাণ সহকারে লোকদের সামনে পেশ করতে। তারপর মানুষ সঠিক ও নির্ভুল চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করে সত্যকে চিনে নেবে এবং যথাযথভাবে মেনে নেবে। নিজেদের চরিত্রকে সত্যের আলোকে গড়ে তুলবে এবং বাতিল পূজারীদের মুকাবিলায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে।

নিজের দায়িত্ব পালন করার পর কেউ বক্রপথে চললে সে-ই দায়ী থাকবে :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا عَلَيْكُمْ اَنْفُسَكُمْۚ لَا يَضُرُّكُمْ مَّنْ ضَلَّ اِذَا اهْتَدَيْتُمْؕ اِلَى اللهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيْعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ

হে মুমিনগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের উপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন; অতঃপর তোমরা যা করতে তিনি সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে অবহিত করবেন। (সূরা মায়েদা- ১০৫)

ব্যাখ্যা : অমুক কী করেছে? অমুকের আকীদার মধ্যে কী কী ভ্রান্তি আছে এবং অমুকের কাজে কোন কোন দোষ-ত্রুটি আছে- এসব দেখার পরিবর্তে মানুষের উচিত তার নিজের চরিত্র ও কার্যাবলির কথা চিন্তা করা। কোন ব্যক্তি নিজে যদি আল্লাহর আনুগত্য করতে থাকে, আল্লাহ ও বান্দার অধিকার আদায় করতে থাকে, সততা ও সঠিক পথ অবলম্বন করে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বও পালন করতে থাকে, তাহলে অন্য কারো বক্র পথে চলার জন্য সে দায়ী থাকবে না। মানুষ কেবলমাত্র নিজের মুক্তির কথা ভাববে, আর অন্যের সংশোধন করার কথা ভাববে না- এটা এ আয়াতের উদ্দেশ্য নয়।